শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি, নিজের চেহারা নিয়ে হতাশা কিংবা ওজন নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা অনেকের আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সমাজ, বিজ্ঞাপন ও গণমাধ্যম প্রায়ই এমন একটি ‘আদর্শ শরীরের’ ধারণা তৈরি করে, যা অধিকাংশ মানুষের জন্য বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে নিজের শরীরকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে করতে অনেকেই নিজের প্রতিই কঠোর হয়ে ওঠেন।
শরীরের আকৃতি বদলে ফেললেই জীবন সম্পূর্ণ বদলে যাবে—এমন ধারণাও অনেকের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু এই মানসিকতা বরং আত্মসম্মান কমাতে পারে, ব্যর্থতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে এবং নিজের শরীরের সঙ্গে এক ধরনের বিরোধ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের শরীর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা শুধু চেহারা বা ওজনের বিষয় নয়। মানুষ নিজেকে কীভাবে দেখে, অন্যরা তাকে কীভাবে দেখে বলে মনে করে এবং নিজের শরীরের ভেতরে বসবাস করার অনুভূতি—এসবই তার আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
গণমাধ্যমের তৈরি ‘আদর্শ শরীর’
পাতলা হওয়া, সুন্দর দেখা, জনপ্রিয় হওয়া কিংবা নিখুঁত শরীর পাওয়ার নানা প্রতিশ্রুতি বিজ্ঞাপন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রতিনিয়ত সামনে আসে। কিশোর-কিশোরীরা ছোট বয়স থেকেই অসংখ্য বিজ্ঞাপন ও নিখুঁতভাবে সাজানো শরীরের ছবি দেখতে থাকে।
ফলে অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, নির্দিষ্ট একটি শারীরিক গড়ন অর্জন করতে পারলেই জীবনে সাফল্য, সুখ বা গ্রহণযোগ্যতা আসবে। কিন্তু বাস্তবে এসব ছবি অধিকাংশ মানুষের স্বাভাবিক শরীরের প্রতিনিধিত্ব করে না।
নিজের শরীরকে ঘৃণা করে একই সঙ্গে নিজের সম্পর্কে ভালো অনুভব করাও কঠিন। বরং স্বাস্থ্যকর শরীর-ভাবনার সঙ্গে উচ্চ আত্মসম্মানের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ নিজের শরীরের প্রতি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/SHP-Love-My-Shape-Mental-Health-Tips-2f329b642a844e18a56c01638ccb41a0.jpg)
নিজের শরীরের যত্নকে অগ্রাধিকার দিন
ওজনকে সব সমস্যার কেন্দ্র হিসেবে দেখার পরিবর্তে শরীরের প্রতি অবহেলা, অতিরিক্ত চাপ বা নিজের প্রতি কঠোর আচরণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। শরীরের সংকেত ও অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং নিজের যত্ন নেওয়াকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা যেতে পারে।
নিজেকে এমনভাবে দেখুন, যেভাবে আপনি আপনার প্রিয় একজন বন্ধুকে দেখেন। নিজের ভুল বা শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে কঠোর সমালোচনা না করে পুরো মানুষটিকে একটি সামগ্রিক সত্তা হিসেবে দেখার অভ্যাস তৈরি করা দরকার।
শরীর নিয়ে ইতিবাচক থাকার ১০ উপায়
১. নিজেকে নেতিবাচক নামে ডাকা বন্ধ করুন
নিজের শরীর বা চেহারা নিয়ে কঠোর ও অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করার অভ্যাস থাকলে সেটি ধরার চেষ্টা করুন। পুরোনো নেতিবাচক পরিচয়ের বদলে এমন একটি ইতিবাচক শব্দ বেছে নিন, যা নিজের সম্পর্কে ভালো অনুভূতি তৈরি করে।
২. ওজনের বাইরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ঠিক করুন
আপনার ওজন যতই হোক, জীবনের অর্থপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর দিকে মনোযোগ দিন। শিক্ষা, কাজ, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা কিংবা ব্যক্তিগত আগ্রহ—এসবকে নিজের জীবনের কেন্দ্রে রাখুন।
৩. নিজের সবচেয়ে ভালো বন্ধুর মতো নিজের সঙ্গে আচরণ করুন
আপনি একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, নিজের সঙ্গেও সেভাবেই কথা বলুন। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল ও যত্নশীল হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৪. গণমাধ্যমের ছবিকে বাস্তবতার মাপকাঠি বানাবেন না
বিজ্ঞাপন, পত্রিকা, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা নিখুঁত শরীরের ছবিগুলো অধিকাংশ মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। এসব ছবির পেছনে পেশাদার প্রশিক্ষণ, সাজসজ্জা ও বড় ধরনের সহায়তা থাকতে পারে। তাই নিজের শরীরকে সেসব ছবির সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়।
৫. আয়নায় নিজেকে শাস্তি নয়, গ্রহণ করুন
আয়নায় তাকানোর সময় শরীরের কোনো একটি অংশের ত্রুটি খোঁজার বদলে পুরো মানুষটিকে দেখার চেষ্টা করুন। প্রথমে নিজের চোখের দিকে তাকান এবং নিজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলুন। এরপর ধীরে ধীরে পুরো শরীরের দিকে দৃষ্টি দিন। শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়ে নিজেকে সামগ্রিকভাবে দেখার অভ্যাস করুন।
৬. যারা আপনাকে গ্রহণ করেন, তাদের কাছাকাছি থাকুন
যারা আপনার শরীর, চেহারা বা ওজনের কোনো নির্দিষ্ট শর্তের কারণে নয়, আপনাকে মানুষ হিসেবে মূল্য দেন—এমন মানুষের সঙ্গে বেশি সময় কাটান। একই সঙ্গে যারা নিয়মিত সমালোচনা করেন বা আপনাকে ছোট করেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাত্রা কমানো যেতে পারে।
৭. শরীর ও ওজন নিয়ে মন্তব্যের ক্ষেত্রে সীমারেখা ঠিক করুন
অন্য কেউ আপনার ওজন বা শরীর নিয়ে মন্তব্য করলে তা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে—এ কথা জানানো আপনার অধিকার। ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ করা দুর্বলতা নয়। নিজের মানসিক শান্তি রক্ষার জন্য কোন ধরনের মন্তব্য গ্রহণ করবেন আর কোনটি করবেন না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
৮. সবাইকে খুশি করার চেষ্টা বন্ধ করুন
সব মানুষকে সব সময় সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। তাই অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন ও ইচ্ছাকে সব সময় পিছিয়ে রাখবেন না। নিজের কাছেও সন্তুষ্ট থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
৯. ‘ওজন কমলেই জীবন শুরু হবে’—এই ধারণা ছাড়ুন
‘আর একটু ওজন কমলে’, ‘পুরোনো পোশাকে ঢুকতে পারলে’ কিংবা ‘মডেলদের মতো দেখতে হলে’ জীবন ভালো হবে—এমন কল্পনার মধ্যে আটকে থাকবেন না। নিজের জীবনকে ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক পরিবর্তনের জন্য স্থগিত না রেখে এখনই উপভোগ করার চেষ্টা করুন।
১০. শ্বাস-প্রশ্বাস ও শরীরচর্চাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করুন
প্রতিদিন কিছু সময় ধীর ও স্বস্তিদায়ক শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শারীরিক নড়াচড়া রাখুন। শ্বাসের অনুশীলন মনকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে শারীরিক নড়াচড়া নিজের শরীরের সঙ্গে সংযোগ এবং প্রাণবন্ততার অনুভূতি বাড়াতে পারে।
ওজন নিয়ে কয়েকটি প্রচলিত ধারণা আসলে কতটা ঠিক?
শরীরের ওজন কমানোকে সব সময় সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বেশি ওজন কমানো মানেই বেশি প্রশংসার যোগ্যতা—এমন ধারণা ভুল হতে পারে। উৎসে বলা হয়েছে, ওজন কমানোর পর কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা, আবার ওজন বেড়ে যাওয়া, অ্যানোরেক্সিয়া, মেজাজের ওঠানামা ও মানসিক চাপের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আবার শুধু ইচ্ছাশক্তি থাকলেই যে প্রত্যেক মানুষ ওজন কমাতে পারবেন—এমন ধারণাও শরীরের বৈচিত্র্য ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে। প্রত্যেকের শরীর এক রকম নয়।
একটি নির্দিষ্ট ‘আদর্শ ওজন’ অর্জন করাই স্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। উৎসের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অনেক ধরনের বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়—সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি, আনন্দ, খেলাধুলা ও জীবনের উদ্দেশ্যও এর সঙ্গে যুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের প্রতি অপমান, লজ্জা বা কঠোরতা দিয়ে পরিবর্তন আনার চেষ্টা না করে গ্রহণযোগ্যতা ও আত্মযত্নের চর্চা করা। নিজের প্রতি যত্নশীল ও ইতিবাচক মনোভাব স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।
শরীর আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সেটিকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বোঝা, যত্ন নেওয়া এবং গ্রহণ করার অভ্যাসই হতে পারে নিজের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির একটি পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















