হলিউড অভিনেত্রী ডেমি মুরের বয়স এখন ৬৩। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবন কাটানোর জন্য তিনি নানা ধরনের অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। তবে তার দীর্ঘায়ু বা ভালোভাবে বয়স বাড়ানোর ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে খুব সাধারণ একটি বিষয়—কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং মানুষের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ।
সম্প্রতি ‘হারপার্স বাজার আরাবিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেমি মুর জানান, তিনি প্রতিদিন কৃতজ্ঞ থাকার বিষয়গুলো মনে করেন এবং এই অভ্যাসটি নিজের ঘনিষ্ঠ একদল নারী বন্ধুর সঙ্গেও ভাগ করে নেন। তাদের মধ্যে প্রতিদিনের একটি নিয়মিত চর্চা রয়েছে, যেখানে প্রত্যেকে নিজেদের অনুভূতি ও জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।
ডেমি মুরের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের এই দলে প্রতিদিন তিনটি বিষয় লিখতে হয়, যেগুলোর জন্য তারা কৃতজ্ঞ। এর সঙ্গে লিখতে হয় তিনটি চ্যালেঞ্জ বা ভয় এবং নিজের একটি ইতিবাচক গুণ কিংবা আত্মপ্রত্যয়ের কথা।
তার কাছে এই অভ্যাসের গুরুত্ব শুধু ইতিবাচক চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিজের অনুভূতি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং অন্যদের অনুভূতিও মন দিয়ে শোনার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

ডেমি মুর বলেন, নিজেকে অন্যের কাছে প্রকাশ করা এবং অন্যকেও নিজের কথা বলার সুযোগ দেওয়া মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, অন্যের কাছে নিজেকে দেখা ও বোঝা এবং একইভাবে অন্যকে বোঝার সুযোগ তৈরি হওয়াই সম্পর্ককে অর্থবহ করে তোলে।
ডেমি মুরের কাছে দীর্ঘায়ুর অর্থ কী
ডেমি মুর দীর্ঘায়ুকে শুধু বয়স বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন না। তার কাছে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন মানে আরও পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকা।
তিনি মনে করেন, নিজের জন্য যেমন বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, তেমনি পরিবার ও নিজের সামাজিক পরিমণ্ডলের জন্যও সময় ও মনোযোগ দেওয়া দরকার। অর্থাৎ ভালোভাবে বয়স বাড়ানোর বিষয়টি কেবল শরীরের যত্ন, খাবার বা ব্যায়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজের মানসিক অবস্থার যত্নও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডেমি মুরের মতে, দিনের শেষে ছোট ছোট মানবিক আচরণও মানুষকে ভেতর থেকে তৃপ্তি দিতে পারে। কারও প্রতি একটু সদয় হওয়া, উদারতা দেখানো কিংবা কাউকে মনোযোগ দিয়ে দেখার মতো সাধারণ ঘটনাও দিনের শেষে তার মনে পূর্ণতার অনুভূতি তৈরি করে।
তার ভাষায়, এমনকি একটি হাসি বা অন্য একজন মানুষকে একটু সময় দেওয়াও উদারতার প্রকাশ হতে পারে।
বন্ধুত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ
ডেমি মুরের এই অভ্যাসের সঙ্গে বয়স বাড়ার সময় সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণারও কিছু মিল রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে এবং দীর্ঘ জীবনযাপনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের একাকিত্বের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়া, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি এবং বয়সের সঙ্গে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার মতো নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটালেই দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হয়। বরং সুস্থ বার্ধক্যের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ, মানসিক সুস্থতা, শারীরিক সক্রিয়তা, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাস—সবগুলো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরের কথা শুনতেও শিখেছেন
ডেমি মুর এর আগেও তার সুস্থতার নানা অভ্যাস নিয়ে কথা বলেছেন। ২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি ধ্যান করেন, ডায়েরি লেখেন এবং মাংসবিহীন খাবার অনুসরণ করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে নিজের শরীর সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। তিনি জানান, এখন তিনি শরীরের প্রয়োজনের দিকে আগের চেয়ে বেশি মনোযোগ দেন।
ক্ষুধা লাগলে শরীর খাবার চাইছে, তৃষ্ণা পেলে পানি চাইছে—এই স্বাভাবিক সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেন তিনি। তরুণ বয়সে শরীরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণনির্ভর। তখন কখনো কখনো তার মনে হতো, শরীর যেন তার বিরুদ্ধে কাজ করছে। এখন সেই মানসিকতা থেকে তিনি অনেকটাই বেরিয়ে এসেছেন।
রাতের অভ্যাসেও গুরুত্ব দিচ্ছেন
চলতি বছরের শুরুতে ডেমি মুর তার রাতের রুটিন নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, দিনের ব্যস্ততা ও নানা চাপ থেকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের অবস্থায় যাওয়ার জন্য সন্ধ্যার সময়টিকে এখন তিনি আরও সচেতনভাবে ব্যবহার করেন।
দিনের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর সরাসরি ঘুমের প্রস্তুতিতে না গিয়ে নিজেকে শান্ত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করেন তিনি। এর মধ্যে ত্বকের যত্নও রয়েছে।

তার মতে, দিনের বিশৃঙ্খলা থেকে শরীর ও মনকে বিশ্রামের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এই পরিবর্তনের সময়টুকু গুরুত্বপূর্ণ।
বার্ধক্যকে প্রতিরোধ নয়, গ্রহণ করার ভাবনা
ডেমি মুরের কথাগুলো থেকে তার বয়স বাড়ার বিষয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি বার্ধক্যকে শুধু প্রতিরোধ করার বিষয় হিসেবে দেখছেন না। বরং নিজের শরীর, পরিবার, বন্ধু এবং বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত থেকে জীবনকে অর্থবহ করার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তার প্রতিদিনের কৃতজ্ঞতার তালিকায় যেমন আনন্দের বিষয় থাকে, তেমনি থাকে ভয় ও চ্যালেঞ্জের কথাও। অর্থাৎ ইতিবাচক থাকার পাশাপাশি জীবনের কঠিন দিকগুলোকেও স্বীকার করার জায়গা রয়েছে তার এই অভ্যাসে।
৬৩ বছর বয়সে ডেমি মুরের এই জীবনদর্শন তাই শুধু সৌন্দর্য বা বয়স ধরে রাখার কৌশল নয়। বরং নিজের প্রতি যত্ন, নিজের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কাছের মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ককে সময় দেওয়ার মাধ্যমে আরও পরিপূর্ণ জীবনযাপনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
শেষ পর্যন্ত তার অভ্যাসটি খুব সাধারণ—প্রতিদিন কৃতজ্ঞতার তিনটি কারণ খুঁজে নেওয়া, নিজের ভয় ও চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করা এবং নিজের একটি ইতিবাচক দিককে মনে করিয়ে দেওয়া। ব্যস্ত জীবনে এমন ছোট একটি চর্চাই হয়তো নিজের সঙ্গে এবং প্রিয় মানুষদের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















