রাত ২টা। এক ঘণ্টা ধরে বিছানায় শুয়ে আছেন, কিন্তু ঘুমের কোনো লক্ষণ নেই। একই জায়গার ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকা, মনে মনে ভেড়া গোনা কিংবা পরদিন কতটা ক্লান্ত লাগবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা—সবই যেন ঘুমকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক প্রবণতা হলো বিছানায় পড়ে থেকে আরও বেশি করে ঘুমানোর চেষ্টা করা। কিন্তু ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই অনেক সময় সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বরং ঘুম না এলে বিছানা ছেড়ে উঠে অন্য কিছু করা বেশি কার্যকর হতে পারে। ঘুমের চিকিৎসায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘স্টিমুলাস কন্ট্রোল’ বা উদ্দীপনা নিয়ন্ত্রণ। ১৯৭২ সালে মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড বুটজিন এই পদ্ধতি চালু করেন। পরে এটি অনিদ্রার জন্য জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ঘুমকে জোর করে আনার চেষ্টা কেন উল্টো ফল দেয়
ঘুমকে যখন একটি কাজ হিসেবে নেওয়া হয়, তখন সমস্যা শুরু হয়। নিউইয়র্কের আচরণগত ঘুম চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ শেলবি হ্যারিসের মতে, ঘুমের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চেষ্টা অনেক সময় ঘুমেরই শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
যত বেশি কেউ ঘুমানোর চেষ্টা করেন, তত বেশি হতাশা ও সতর্কতা তৈরি হতে পারে। ‘আমাকে এখনই ঘুমাতে হবে’—এমন চিন্তা মস্তিষ্ককে বরং জেগে থাকার অবস্থায় রাখতে পারে।
তাই ঘুম না এলে বিছানায় পড়ে থেকে নিজেকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা না করে কিছু সময়ের জন্য পরিবেশ বদলানো বেশি উপকারী হতে পারে।

কতক্ষণ জেগে থাকার পর বিছানা ছাড়বেন?
অনেক সময় বলা হয়, প্রায় ২০ মিনিট ধরে ঘুম না এলে বিছানা থেকে উঠে যেতে। কিন্তু ঘড়ি দেখে ঠিক ২০ মিনিট পার হয়েছে কি না হিসাব করাও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সময়ের চেয়ে নিজের মানসিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া।
যদি আপনি শান্ত থাকেন এবং মনে হয় আরও কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুম চলে আসতে পারে, তাহলে বিছানায় থাকাই যেতে পারে। কিন্তু যদি মাথায় নানা চিন্তা ঘুরতে থাকে, বিরক্তি বাড়তে থাকে কিংবা মনে হয় জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন, তখন বিছানা ছেড়ে ওঠা ভালো।
এরপর এমন কোনো কাজ করতে পারেন, যা আপনাকে শান্ত রাখবে এবং আবার ঘুম ঘুম ভাব ফিরে আসা পর্যন্ত সময় কাটাতে সাহায্য করবে।
বিছানা ছেড়ে ওঠা কীভাবে কাজে দেয়?
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেরেলম্যান স্কুল অব মেডিসিনের আচরণগত ঘুম চিকিৎসা কর্মসূচির পরিচালক মাইকেল পার্লিস বিষয়টিকে সহজ একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করেন—‘হাল ছেড়ে দিন, উঠে পড়ুন, ঘর থেকে বেরিয়ে যান।’
এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ঘুমের চাপ। দিনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ঘুমের যে স্বাভাবিক তাগিদ তৈরি হয়, তাকে ঘুমের চাপ বলা হয়। বিছানায় জেগে পড়ে থাকার বদলে কিছু সময় উঠে থাকলে সেই স্বাভাবিক ঘুমের তাগিদ আরও বাড়তে পারে।
এক রাতেই এতে ঘুমের সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে নিয়মিতভাবে এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে বিছানার সঙ্গে ঘুমের ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
অর্থাৎ বিছানা যেন ‘জেগে থেকে দুশ্চিন্তা করার জায়গা’ হয়ে না যায়, বরং ঘুমের সঙ্গেই যুক্ত থাকে—এটাই মূল লক্ষ্য।

ঘুম না এলে কী করবেন?
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্দেশ্য হলো নিজেকে ক্লান্ত করে ফেলা নয়। বরং এমন কিছু করা, যা উপভোগ্য ও শান্তিদায়ক এবং ঘুম ফিরে আসা পর্যন্ত মনকে ব্যস্ত রাখতে পারে।
শেলবি হ্যারিস নিজে পুরোনো রান্নার বই সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো উল্টেপাল্টে পরিবারের পছন্দের রেসিপি চিহ্নিত করেন। তাঁর দেখা রোগীদের কেউ ছবি আঁকেন, কেউ বুননের কাজ করেন।
এ ধরনের কাজকে তিনি মজা করে ‘অনিদ্রার স্কার্ফ’ও বলেন।
তবে কাজটি যেন শাস্তির মতো মনে না হয় এবং খুব বেশি উৎপাদনশীল হওয়ার প্রয়োজনও নেই। বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে রাতে কাজের হিসাব, করের কাগজপত্র বা বিল পরিশোধের মতো কাজ না করার পরামর্শ দেন।
কারণ প্রতিবার ঘুম ভেঙে উঠে কাজ শুরু করলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শিখে যেতে পারে যে রাতের জেগে ওঠার সময়টিই কাজ করার সময়।
মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করবেন?
সম্ভব হলে পর্দা এড়িয়ে চলাই ভালো। ফোন বা কম্পিউটার আপনাকে বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কাজের দিকে টেনে নিতে পারে। ফলে আবার সেটি বন্ধ করে ঘুমে ফেরাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তবে কারও কাছে যদি দ্রুত ঘুমানোর চেষ্টায় বিছানায় পড়ে থাকার চেয়ে পর্দায় কিছু দেখা বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়, তাহলে নিজের পছন্দের কোনো শান্ত ধরনের অনুষ্ঠান দেখা যেতে পারে। এটিকে অবশ্য মূল পদ্ধতি নয়, বরং বিকল্প হিসেবে দেখা ভালো।
ঘুম না আসার সময় পুরো অন্ধকারে বসে থাকাও জরুরি নয়। যে কাজটি করছেন, সেটি আরাম করে করার মতো পর্যাপ্ত আলো জ্বালানো যেতে পারে।
তবে সোফা বা অন্য কোথাও ঘুমিয়ে পড়া এড়িয়ে চলা উচিত। ঘুম ঘুম ভাব ফিরে এলে আবার শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় শোয়া ভালো। এতে শরীর ও মস্তিষ্কের কাছে বিছানা ও ঘুমের সম্পর্কটি বজায় থাকে।
দিনের বেলাতেই প্রস্তুতি নিন

রাতে ঘুম না এলে কী করবেন, সেটি আগে থেকেই ঠিক করে রাখা উপকারী হতে পারে। কোথায় বসবেন এবং কী করবেন—সেটি দিনের বেলায় ঠিক করে রাখা যায়।
শোবার ঘরের বাইরে একটি বই, পত্রিকা কিংবা ছবি আঁকার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা যেতে পারে। ফলে মাঝরাতে ঘুম না এলে কী করা উচিত, তা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে না।
ঘুম ফিরে এলে আবার বিছানায়
কিছুক্ষণ পর যখন চোখে ঘুম ঘুম ভাব আসবে, তখন আবার বিছানায় ফিরে যেতে হবে।
শেলবি হ্যারিসের পরামর্শ, ঘুম আসে কি না সেটি দেখুন। আবার যদি মাথায় চিন্তা ছুটতে শুরু করে বা বিরক্তি তৈরি হয়, তাহলে আবার উঠে পড়ুন। প্রয়োজন হলে একই প্রক্রিয়া বারবার করা যায়।
অর্থাৎ পদ্ধতিটি হলো—ঘুম না এলে বিছানা ছাড়ুন, কিছুক্ষণ শান্ত কোনো কাজ করুন, ঘুম ঘুম ভাব ফিরে এলে বিছানায় যান। আবার ঘুম না এলে একই কাজ পুনরাবৃত্তি করুন।
দুই-তিন সপ্তাহেও উন্নতি না হলে
স্টিমুলাস কন্ট্রোল নিয়মিতভাবে দুই থেকে তিন সপ্তাহ চর্চা করার পরও যদি ঘুমের সমস্যা না কমে, তাহলে ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা ঘুমের সময়সূচি নিয়মিত রাখার পাশাপাশি অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে পারেন। যেমন ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বারবার শ্বাসে বাধা তৈরি হওয়া—ঘুমের এমন সমস্যাও অনিদ্রার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রয়োজনে অনিদ্রার জন্য আরও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপিও নেওয়া যেতে পারে।
ঘুম না আসার রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমকে জোর করে আদায় করার চেষ্টা না করা। কারণ ঘুম এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে যত বেশি চাপ তৈরি করা হয়, অনেক সময় তা ততই কঠিন হয়ে ওঠে। তাই রাত ২টায় বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দুশ্চিন্তা করার বদলে উঠে পড়া, শান্ত কোনো কাজ করা এবং ঘুম ফিরে এলে আবার বিছানায় যাওয়া—এই সহজ পরিবর্তনই অনেকের জন্য ঘুমের অভ্যাসকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















