ইতালিকে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে দেখা হয়েছে শিল্প-ঐতিহ্য, কারুশিল্প, ফ্যাশন, নকশা ও মধ্য-শতকের নান্দনিকতার দেশ হিসেবে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক পরিচয়ের আড়ালে দেশটির শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। লম্বার্দি ও এমিলিয়া-রোমানিয়ার শিল্পাঞ্চলগুলোতে দেখা যাচ্ছে এমন এক রূপান্তর, যেখানে প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেকসই ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ।
ইতালির নতুন শিল্পকৌশলের লক্ষ্য শুধু পুরোনো উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা নয়; বরং নিজেদের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা। একই সঙ্গে দেশটি এমন প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সিলিকন ভ্যালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমে এবং ইতালির নিজস্ব প্রযুক্তি বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান Almaviva Group। ইতালির এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
আলমাভিভা গ্রুপের চিফ গ্লোবাল এআই কর্মকর্তা এবং আলমাওয়েভ ল্যাবসের প্রধান নির্বাহী ভ্যালেরিয়া সান্দেইয়ের ভাষায়, ইউরোপ ও ইতালি বৈশ্বিক এআই নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে। নতুন গ্লোবাল এআই বিভাগ এবং আলমাওয়েভ ল্যাবস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে নিজেদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চায়।
প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় প্রায় ১৮০ কোটি ইউরো। সান্দেইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আলমাভিভা বিদেশি প্রযুক্তিকে শুধু নতুন মোড়কে বাজারজাত করার পরিবর্তে নিজেদের প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি শুরু থেকেই নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এখানেই ইতালির শিল্প পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। দেশটি শুধু ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন খাতকে আধুনিক করছে না, বরং নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতাকেও শিল্প অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
ইউরোপ থেকে আমেরিকা, প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বিস্তার
ইতালির এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব এখন ইউরোপের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পৌর ও পরিবহন অবকাঠামোতেও ইতালীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
২০২৪ সালে আলমাভিভা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্মার্ট মোবিলিটি বা বুদ্ধিমান পরিবহন সমাধান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইটারিস অধিগ্রহণ করে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্ট পরিবহন প্রযুক্তির উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়।
সান্দেই জানান, আলমাভিভার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
লাতিন আমেরিকাতেও একই ধরনের সম্প্রসারণ ঘটছে। ব্রাজিল ও বৃহত্তর অঞ্চলের অন্যতম বড় ডিজিটাল অপারেটর টিআইভিআইটি অধিগ্রহণের মাধ্যমে আলমাভিভা ওই অঞ্চলের ডিজিটাল রূপান্তরে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।
এর ফলে ইতালির প্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিকীকরণ শুধু সফটওয়্যার বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পরিবহন, ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, সরকারি সেবা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক ব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিকে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এআই হবে কার্যকর, টেকসই ও পক্ষপাতমুক্ত
ইতালির নতুন প্রযুক্তি কৌশলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতার পাশাপাশি এর ব্যবহার কতটা দায়িত্বশীল ও টেকসই হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সান্দেইয়ের মতে, তাদের এআই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে এটি হালকা, নৈতিক এবং টেকসই হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তি ও সম্পদের ব্যবহার কমানোও এর অন্যতম লক্ষ্য।
এআই ব্যবহারে সাংস্কৃতিক পক্ষপাত এড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ এক দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় তৈরি প্রযুক্তি অন্য দেশের মানুষের ওপর একইভাবে প্রয়োগ করলে ভুল সিদ্ধান্ত বা বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিভিন্ন বাজারের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা
তবে শিল্পের এই রূপান্তর শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। নতুন যন্ত্রপাতি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আধুনিক ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় বিনিয়োগের জন্য বড় অঙ্কের মূলধন প্রয়োজন। ফলে ইতালির ব্যাংকিং খাতও এই শিল্প পুনর্জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
ইতালির বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি BPER Banca। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জিয়ান্নি ফ্রাঙ্কো পাপা মনে করেন, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানো এবং যেসব অঞ্চলে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে সেসব এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিশেষ করে ইতালির ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়নের জন্য ব্যাংকিং খাতের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অর্থনীতির বড় অংশ এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাদের ডিজিটাল রূপান্তর, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং টেকসই জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য সহজলভ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন।
পাপার মতে, প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে যেতে হলে সেবার মান, পরিচালন দক্ষতা ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিও শক্ত রাখতে হবে।
পুরোনো শিল্পশক্তির সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়
ইতালির বর্তমান শিল্প কৌশলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—দেশটি তার ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ না করেই প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন দক্ষতা, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং শিল্পভিত্তিক আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে যুক্ত করা হচ্ছে।
এর ফলে ইতালি এমন একটি মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, যেখানে শিল্পোন্নত দেশগুলো শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ভোক্তা হয়ে থাকবে না। বরং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি করবে, সেটিকে নিজেদের শিল্পে ব্যবহার করবে এবং পরে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করবে।
এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন, কৌশলগত অধিগ্রহণ এবং শক্তিশালী আর্থিক সহায়তা। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বাজারে প্রবেশের জন্য অধিগ্রহণকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর শিল্পের আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
ফলে ইতালির শিল্প অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের গল্প নয়। এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। ঐতিহ্যবাহী শিল্পের অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে ইতালি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ভূমিকা তৈরির চেষ্টা করছে।
একসময় যে ইতালিকে মূলত অতীতের শিল্প-ঐতিহ্য, ফ্যাশন ও নকশার জন্য মনে করা হতো, সেই দেশ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট পরিবহন, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তন সফল হলে ইতালির পরবর্তী শিল্পযুগের পরিচয় শুধু তার অতীতের গৌরবে নয়, বরং নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি ও বিশ্ববাজারে তা ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতায়ও নির্ধারিত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















