কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্ব অর্থনীতিকে শিল্পবিপ্লব, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের আবিষ্কারের চেয়েও গভীরভাবে বদলে দিতে পারে—এমন বড় প্রত্যাশা নিয়েই শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যয়, লোকসান এবং এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে।
রয়টার্সের দেখা অ্যানথ্রপিকের প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির নথি বা আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, কোম্পানিটির সম্ভাব্য মূল্যায়ন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। মাত্র পাঁচ বছর আগে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এটি হবে অসাধারণ দ্রুত উত্থান এবং একই সঙ্গে পুরো এআই শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারমূল্য নির্ধারণের পরীক্ষা।
এক বছরে রাজস্ব ১২ গুণ, কিন্তু লোকসানও বিশাল
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অ্যানথ্রপিকের আয় প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি। কিন্তু দ্রুত আয় বাড়লেও কোম্পানিটির পরিচালন লোকসানও বড় হয়েছে।
২০২৫ সালে পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে এই লোকসান ছিল ২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে অ্যানথ্রপিক প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিট লোকসান দেখিয়েছে। তবে এই অঙ্কের বড় একটি অংশ প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যয় নয়। প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাবগত ব্যয় এসেছে এমন কিছু অর্থায়নের মূল্য পুনর্মূল্যায়ন থেকে, যা ভবিষ্যতে অ্যানথ্রপিকের শেয়ারে রূপান্তরিত হতে পারে।
অর্থাৎ, ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিট লোকসানের পুরোটা কোম্পানি পরিচালনায় নগদ অর্থ হিসেবে ব্যয় হয়নি। তবু ব্যবসা চালানো এবং এআই অবকাঠামো তৈরির প্রকৃত খরচও দ্রুত বাড়ছে।
কম্পিউটিং অবকাঠামোতেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার
অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের জায়গাগুলোর একটি হলো কম্পিউটিং ও অবকাঠামো। ২০২৫ সালে এ খাতে প্রতিষ্ঠানটি ৭ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
এই ব্যয় ছিল কোম্পানিটির মোট ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার পরিচালন ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি।
ভবিষ্যতের জন্যও অ্যানথ্রপিকের ব্যয়ের পরিকল্পনা অত্যন্ত বড়। আইপিও নথি অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে ক্লাউড, কম্পিউটিং ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন বাধ্যবাধকতার জন্য প্রায় ৫১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য যে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন, সেটি এআই কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেলের ওপর কতটা বড় চাপ তৈরি করছে।
হাতে রয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি
বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও অ্যানথ্রপিকের আর্থিক অবস্থানে উল্লেখযোগ্য নগদ মজুত রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির নগদ, নগদ সমতুল্য সম্পদ এবং স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২০ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার।
তবে কোম্পানিটি নিজেই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে যে তাদের বড় গ্রাহকদের অনেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ নয়। ফলে বড় কোনো গ্রাহক এআই সেবায় ব্যয় কমিয়ে দিলে বা পুরোপুরি বন্ধ করলে অ্যানথ্রপিকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৫ সালে কোম্পানিটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ আয় এসেছিল মাত্র দুই গ্রাহকের কাছ থেকে। ফলে গ্রাহকনির্ভরতার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে থাকছে।
২ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য মূল্যায়ন মে মাসে কোম্পানিটির নিজস্ব আনুমানিক ৯৬৫ বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নের দ্বিগুণেরও বেশি। এত অল্প সময়ে মূল্যায়নের এই উত্থান এআই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহেরই প্রতিফলন।
অ্যানথ্রপিকের শেয়ারবাজারে প্রবেশ সফল হলে এটি শুধু একটি কোম্পানির আইপিও হবে না। বরং এআই শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।
এই দিক থেকে অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআইয়ের দিকেও বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে। ওপেনএআইও জুনে গোপনীয়ভাবে আইপিওর জন্য আবেদন করেছে এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে তালিকাভুক্তির সম্ভাবনার কথা এসেছে।
যে প্রতিষ্ঠানটি আগে শেয়ারবাজারে আসবে, সেটিই সম্ভবত এআই কোম্পানিগুলোর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রথম বড় বাজার-মানদণ্ড তৈরি করবে।
ওপেনএআই, গুগল, মেটা ও এক্সএআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা
অ্যানথ্রপিকের ব্যবসা এখন শুধু ওপেনএআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই। গুগল, মেটা এবং স্পেসএক্সের এক্সএআইও এআই অবকাঠামো, মডেল এবং ব্যবসায়িক গ্রাহকদের বাজারে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।
অ্যানথ্রপিকের শুরুটাও হয়েছিল এআই নিরাপত্তা ও পরিচালন কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকে ওপেনএআই থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কোম্পানি গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের মার্চে অ্যানথ্রপিক তাদের প্রথম বড় ভাষাভিত্তিক এআই মডেল প্রকাশ করে।
অ্যামাজন ও গুগল অ্যানথ্রপিকের প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানই অ্যানথ্রপিকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং একই সঙ্গে ক্লাউড অবকাঠামো সরবরাহ করছে, যা অ্যানথ্রপিকের ক্লড মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়।
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক অ্যানথ্রপিক
অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই—একদিকে প্রতিষ্ঠানটি এআইয়ের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর বড় বাজি ধরছে, অন্যদিকে তাদের নিজেদের গবেষণাতেই উন্নত ও অধিক স্বায়ত্তশাসিত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ক্ষতিকর আচরণ ধরা পড়েছে।
কোম্পানির গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় কিছু এআই মডেলের কোড নষ্ট করার চেষ্টা, প্রতারণায় সহায়তা এবং তথ্যকে প্রভাবিত করার মতো আচরণের নজির পাওয়া গেছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআইয়ের নতুন সক্ষমতা দ্রুত বাজারে ছাড়ার গতি কমানোর আহ্বানও জানিয়েছেন। তার মতে, ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
তবে একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে অ্যানথ্রপিকও নতুন মডেল বাজারে আনছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ওপাস ৫.৫ মডেল চালু করেছে, যা ওপেনএআইয়ের নতুন মডেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অ্যানথ্রপিকের অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি ব্যবহারের প্রশ্নেও চাপ
অ্যানথ্রপিক ও আমোদেইয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধও হয়েছে। এ বিরোধের এক পর্যায়ে পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। তবে আগস্টে মার্কিন এক বিচারক সেই পদক্ষেপ আটকে দেন।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, অ্যানথ্রপিকের মতো এআই কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা বাজারমূল্যই নয়, সরকারি নীতি ও নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আইপিওর সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
অ্যানথ্রপিকের আইপিও নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে বলে এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল। আইপিওটি সফল হলে এটি এমন এক সময়ে আসবে, যখন এআই ও চিপ খাতের কিছু শেয়ারে সাম্প্রতিক সময়ে চাপ তৈরি হয়েছে এবং উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে স্পেসএক্সের ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। জুনের ১২ তারিখে বাজারে তালিকাভুক্তির প্রথম দিন স্পেসএক্সের শেয়ার ১৯ শতাংশ বেড়ে ১৬০ ডলারে উঠেছিল। পরে তা প্রায় ১৪৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে, যা ১৩৫ ডলারের আইপিও মূল্যের চেয়ে এখনও বেশি।
অ্যানথ্রপিকের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীরা একই সঙ্গে কোম্পানিটির দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনা যেমন দেখবেন, তেমনি বিপুল ব্যয়, বড় লোকসান, গ্রাহকনির্ভরতা এবং এআই প্রযুক্তির ঝুঁকিও হিসাব করবেন।
সব মিলিয়ে অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়ন শুধু একটি এআই কোম্পানির সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক প্রযুক্তি দৌড়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভবিষ্যতের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয়, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।











