মোহামেদ ফায়েজ ফারাহাত
গত কয়েক বছরে একের পর এক যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্বব্যবস্থাকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের গতিপথ নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ। উদীয়মান প্রযুক্তি, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতের প্রযুক্তি, দুর্লভ খনিজ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সামরিক জোট, প্রভাববলয়ের পুনর্বিন্যাস এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র নিয়ে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিরোধ, বিশেষ করে শুল্কযুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি প্রধান সম্ভাবনা সামনে রয়েছে। একটি ধারণা অনুযায়ী, দুই দেশের সামরিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত অনিবার্য এবং সেই সংঘাতই নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ করবে। সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে কেন্দ্র করে দ্বিমেরু ব্যবস্থা হতে পারে, আবার রাশিয়া ও ইউরোপের কিছু শক্তিকে নিয়ে বহুমেরু ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে। এমনকি বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাও থাকতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দুই দেশের উত্তেজনা কমানোর প্রতিটি উদ্যোগ মূলত সম্ভাব্য সংঘাতকে পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল। শীর্ষ বৈঠকগুলো ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাব থেকে অনিচ্ছাকৃত সংঘাত ঠেকাতে সহায়ক হলেও প্রযুক্তি, অস্ত্র, দুর্লভ খনিজ, জোট গঠন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকে।
অন্যদিকে, আরেকটি সম্ভাবনা হলো—সামরিক সংঘাত অনিবার্য নয় এবং দুই দেশের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। চীনের দীর্ঘমেয়াদি ও ধীরগতির পরিবর্তনের কৌশল, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অ-সামরিক উপায়ে আন্তর্জাতিক কাঠামোয় প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয় না। একই সঙ্গে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন দীর্ঘদিন ধরে যে সুবিধা পেয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ব্যয় বহনের তুলনামূলক কম দায় চীনের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার একটি সুবিধা।
ট্রাম্প-শি বৈঠক কতটা তাৎপর্যপূর্ণ
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক ইতিবাচক পরিবেশ ও সমঝোতামূলক বক্তব্যের কারণে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার সূচনা করতে পারে?
তবে বৈঠকটি থেকে এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো শক্ত ভিত্তি নেই। বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণে কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুবিধা অর্জন কিংবা আঞ্চলিক কিছু ইস্যুতে চীনের সহযোগিতা পাওয়ার মতো রাজনৈতিক বিবেচনাও বৈঠকের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা চীনের জন্য ভিন্ন ধরনের কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত জ্বালানি বাজারে চীনের জন্য ক্ষতিকর হলেও, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সম্পৃক্ততা ওয়াশিংটনের মনোযোগকে চীনের নিকটবর্তী ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে দূরে রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদ সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পুনর্বিন্যাস করা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

তাইওয়ান প্রশ্নই বড় বাধা
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাইওয়ান। বেইজিংয়ের প্রত্যাশিত পরিবর্তন শুধু তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক পর্যালোচনা বা দুই দেশের কর্মকর্তাদের সফর সীমিত করার মধ্যে আটকে নেই।
চীন চায়, ওয়াশিংটন তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নিক। এমনকি তাইওয়ানকে চীনের সার্বভৌমত্বের অধীনে ফিরিয়ে আনার জন্য চীন কোনো পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র যেন তার বিরোধিতা না করে—বেইজিংয়ের প্রত্যাশা সেই পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।
ফলে ২৪ সেপ্টেম্বরের ট্রাম্প-শি বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটিকে এখনই যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত সমঝোতার ভিত্তি বলা যায় না। বরং এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপান্তরের এই পর্যায়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণের একটি উদ্যোগ হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের প্রভাব কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আঞ্চলিক সংকট এবং অন্যান্য শক্তির কূটনৈতিক অবস্থানের ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাই বৈঠকের ইতিবাচক আবহের পাশাপাশি দুই দেশের মৌলিক বিরোধগুলোও সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।











