বাংলাদেশকে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি শিল্পের সম্ভাবনাময় বাজারগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত কমছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির অবকাঠামোও তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক উদাহরণ হিসেবেই দেখেছিলেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
কিন্তু সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিত্র সেই ধারণায় বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। এম্বারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গ্রীষ্মকালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে কয়লাভিত্তিক উৎপাদন। জুলাইয়ে কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ছিল ৩ দশমিক ৯২ টেরাওয়াট ঘণ্টা, যেখানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদন করেছে ৩ দশমিক ৬৬ টেরাওয়াট ঘণ্টা।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই পরিবর্তন শুধু একটি দেশের জ্বালানি ব্যবহারের পরিসংখ্যান নয়। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো এলএনজির ভবিষ্যৎ চাহিদা কতটা বাড়াবে—সে প্রশ্নের সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এলএনজির বাজারে কয়লার চাপ
এলএনজি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির বড় প্রত্যাশা এখন এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে ঘিরে। ইউরোপে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের কারণে গ্যাসের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বা কমতে পারে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ছে। চীনও নিজস্ব পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা সীমিত করার চেষ্টা করছে।

তাই বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে এলএনজি বাজারের পরবর্তী বড় ক্রেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কাতারসহ বিভিন্ন দেশ যে বিপুল নতুন এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করছে, তার বড় অংশের চাহিদা এই দেশগুলো থেকেই আসবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
সমস্যা হলো, এসব দেশের ভোক্তারা জ্বালানির দামের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস থেকে কয়লার দিকে সাম্প্রতিক সরে যাওয়া তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
দামের হিসাব বদলে দিচ্ছে জ্বালানি নির্বাচন
উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য বিদ্যুৎ শুধু নির্ভরযোগ্য হলেই হয় না; তা সাশ্রয়ীও হতে হয়। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিদ্যুতের দাম যদি বেশি হয়, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
এখানেই এলএনজির বড় একটি দুর্বলতা। স্থানীয় জ্বালানির তুলনায় আমদানিনির্ভর এলএনজি আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা আমদানিকারকদের ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন করে সতর্ক করেছে। ২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের পর এশিয়ার এলএনজির দামও তীব্রভাবে বেড়েছে।
রয়টার্সের উল্লেখ করা এলএসইজি তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফার হামলার পর এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ১১ ডলার থেকে বেড়ে ২৫ ডলারের ওপরে উঠেছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার কয়লার সমপরিমাণ জ্বালানির মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ৫০ ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ার কয়লার ক্ষেত্রে প্রায় ৫ ডলার। বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এশিয়ায় গ্যাসের অবস্থান কি বদলাচ্ছে?

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পাকিস্তান ও ভারতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের অংশ কমেছে। এমনকি বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি আমদানিকারক দেশ জাপানেও গ্যাসের অংশ ২০২০ সালের ৪০ শতাংশের বেশি থেকে চলতি বছরে প্রায় ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
চীনও একই ধরনের প্রবণতা দেখাচ্ছে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি আমদানিকারক হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা খুবই সীমিত। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত চীনের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ এসেছে গ্যাস থেকে।
এই চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে—বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেই গ্যাসের ব্যবহারও একই সঙ্গে বাড়বে। বাস্তবে এশিয়ার অনেক দেশে গ্যাসকে একদিকে দ্রুত সম্প্রসারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যদিকে তুলনামূলক সস্তা কয়লার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
কয়লা সরানো কি এত সহজ?
জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি ধারণা ছিল যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রথমে কয়লা থেকে গ্যাসে যাবে এবং পরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে গ্যাসের ব্যবহারও কমবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
অনেক এশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকার বহু দশক ধরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সরবরাহ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এসব ব্যবস্থা এখনো তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। ফলে শুধু পরিবেশগত কারণ দেখিয়ে এগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলা অর্থনৈতিকভাবে সহজ নয়।
তাই প্রতিটি নতুন এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—এর খরচ কি কয়লার তুলনায় গ্রহণযোগ্য?
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গ্যাসের তুলনামূলক কম নির্গমন, নমনীয়তা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভারসাম্য তৈরির সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে পারে। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে বিদ্যুতের দাম ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এলএনজি সরবরাহকারীদের জন্য এখানেই তৈরি হচ্ছে একটি বড় বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের বার্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ
এর অর্থ এই নয় যে, বিশ্বে এলএনজির চাহিদা হঠাৎ কমে যাবে। বহু বাজারে গ্যাসের ব্যবহার এখনো বাড়ছে এবং নতুন এলএনজি আমদানি অবকাঠামোও তৈরি হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাম্প্রতিক পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে বলেই সেখানে গ্যাসের ব্যবহারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে—এমন অনুমান এখন আর নিরাপদ নয়।
বিশ্বের এলএনজি শিল্প বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে নতুন রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করছে। এই বিনিয়োগের বড় ভিত্তি হলো এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো ভবিষ্যতে আরও বেশি গ্যাস আমদানি করবে—এমন প্রত্যাশা। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সেই প্রত্যাশাকে আরও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের প্রয়োজন তুলে ধরছে।
বাংলাদেশে গ্যাসের পরিবর্তে কয়লার বাড়তি ব্যবহার তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যানের একটি পরিবর্তন নয়। এটি এশিয়ার জ্বালানি বাজারে মূল্য, নির্ভরযোগ্যতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তব সমীকরণকে সামনে নিয়ে আসছে। এলএনজির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত কতটা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নির্ধারিত হবে শুধু বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা দিয়ে নয়, বরং সেই বিদ্যুৎ কোন জ্বালানি দিয়ে সবচেয়ে কম খরচে উৎপাদন করা যায়—তার ওপর।












