যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের ব্যস্ত, ছুটন্ত জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে ইতালির সার্ডিনিয়ার ছোট্ট দ্বীপ সান পিয়েত্রোতে নতুন জীবন শুরু করেছেন ডেবরা কোলটুনে। ২০২৩ সালে একটি স্থানীয় টুনা উৎসবে বিচারক হিসেবে অংশ নিতে গিয়ে দ্বীপটির প্রেমে পড়েন তিনি। তখনও তিনি ভাবেননি, কয়েক মাসের মধ্যেই এই শান্ত দ্বীপই তাঁর পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠবে।
দক্ষিণ-পশ্চিম সার্ডিনিয়ার উপকূলের কাছে অবস্থিত সান পিয়েত্রো দ্বীপে মানুষের সংখ্যা ৬ হাজারেরও কম। লাস ভেগাসের কোলাহল, ব্যস্ততা আর প্রতিনিয়ত ছুটে চলার জীবন থেকে একেবারে ভিন্ন এই দ্বীপের ধীর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনই কোলটুনেকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে।
খাদ্যবিষয়ক সমালোচক হিসেবে টুনা উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুধু খাবার নয়, দ্বীপের মানুষের জীবনধারা, প্রকৃতি এবং পারস্পরিক সম্পর্কও তাঁকে মুগ্ধ করে। কোলটুনের ভাষায়, দ্বীপটি তাঁকে এক ধরনের গভীর আনন্দের অনুভূতি দেয়।
এক বছরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। সন্তান এইডেন ও কাইয়াকে এবং পরিবারের দুই কুকুরকে সঙ্গে নিয়ে সান পিয়েত্রোতে চলে যান। নতুন পরিবেশে শুরু হয় তাঁদের জীবনের নতুন অধ্যায়।
দীর্ঘ জীবনের জন্য পরিচিত সার্ডিনিয়া
সার্ডিনিয়া বিশ্বের পরিচিত পাঁচটি ‘ব্লু জোন’-এর একটি। ‘ব্লু জোন’ বলতে এমন কিছু অঞ্চলকে বোঝানো হয়, যেখানে মানুষের গড় আয়ু তুলনামূলকভাবে বেশি এবং শত বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
সার্ডিনিয়ার দীর্ঘায়ুর সঙ্গে শুধু জেনেটিক কারণ নয়, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণায় আলোচনা হয়ে আসছে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারে শাকসবজি, ডাল, শস্য, ফলমূল ও অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের গুরুত্ব বেশি। মাছও খাদ্যতালিকার অংশ হলেও স্থানীয় খাবারের বৈশিষ্ট্য মূলত উদ্ভিদনির্ভর।
দ্বীপের জীবনযাত্রায় শারীরিক সক্রিয়তাও স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত। হাঁটা, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ, স্থানীয় খাবার এবং তুলনামূলক ধীর জীবনযাপন—সব মিলিয়ে সার্ডিনিয়ার জীবনধারা বিশ্বের মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহের বিষয়।
তবে কোনো একটি জায়গায় বসবাস করলেই কেউ শত বছর বাঁচবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘায়ুর পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্য, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক পরিবেশসহ একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখে।
লাস ভেগাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন
কোলটুনের জন্য পরিবর্তনটি শুধু ঠিকানা বদল ছিল না; এটি ছিল জীবনযাত্রারও বড় পরিবর্তন। এক দশকেরও বেশি সময় লাস ভেগাসে কাটানোর পর তাঁর মনে হয়েছিল, জীবন যেন সবসময় একটি দৌড়ের মধ্যে আটকে আছে। টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতে তাঁকে ক্রমাগত ব্যস্ত থাকতে হতো।
সান পিয়েত্রোতে গিয়ে সেই চিত্র বদলে যায়। ছোট দ্বীপের শান্ত পরিবেশ, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা এবং মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাঁকে নতুনভাবে জীবনকে দেখতে সাহায্য করে।
যে জায়গায় প্রথমে তিনি গিয়েছিলেন মাত্র একটি খাবার উৎসবে অংশ নিতে, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারের নতুন বাড়ি।
কোলটুনের গল্প তাই শুধু একজন নারীর শহর ছেড়ে দ্বীপে চলে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি আধুনিক নগরজীবনের নিরন্তর ব্যস্ততার বিপরীতে ধীর, প্রকৃতিনির্ভর ও সামাজিকভাবে ঘনিষ্ঠ জীবনযাপনের আকর্ষণেরও একটি উদাহরণ।
পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ সার্ডিনিয়া
সার্ডিনিয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এখন এমন জায়গাগুলোর প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে, যেখানে প্রকৃতি ও স্থানীয় জীবনযাপন পর্যটনের বড় অংশ।
এদিকে মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্তানে ‘মাউন্টেনস অব হেভেন’ নামে পরিচিত পার্বত্য এলাকায় নতুনভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে আক-সু ট্রান্সভার্স পথ। প্রায় ৭০ মাইল দীর্ঘ এই দুর্গম পথ আগে মূলত অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরাই পাড়ি দিতেন। এখন পথে পথে যাযাবরদের তাঁবু বা ইউর্টে থাকার ব্যবস্থা থাকায় পর্যটকদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে।
ইউরোপের বলকান অঞ্চলেও রয়েছে প্রায় ১২০ মাইল দীর্ঘ ‘পিকস অব দ্য বলকানস’ ট্রেকিং পথ। মন্টেনেগ্রো, আলবেনিয়া ও কসোভোর মধ্য দিয়ে যাওয়া এই পথে রয়েছে চুনাপাথরের উঁচু পাহাড়, হিমবাহের হ্রদ, বুনো ফুলে ভরা তৃণভূমি ও মেঘে ঢাকা বনাঞ্চল।
জলবায়ু বদলাচ্ছে ফ্রান্সের খাবার ও পানীয়ও
এদিকে চলতি বছরের তীব্র তাপপ্রবাহ ফ্রান্সের বিখ্যাত ওয়াইন ও পনির শিল্পেও প্রভাব ফেলেছে। শ্যাম্পেন অঞ্চলে অতিরিক্ত গরমের কারণে আঙুর দ্রুত পেকে যাওয়ায় এ বছর ইতিহাসের সবচেয়ে আগাম মৌসুমে আঙুর সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
তাপমাত্রা বেশি থাকায় আঙুরে চিনির পরিমাণও বেড়েছে। এর ফলে তৈরি শ্যাম্পেনে অ্যালকোহলের মাত্রা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ফ্রান্সের ওয়াইন নিয়ন্ত্রকদেরও কিছু নিয়ম শিথিল করতে হয়েছে।
শুধু ওয়াইন নয়, পনির তৈরিতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘ খরার কারণে গবাদিপশুর চারণভূমি শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষককে গরুর স্বাভাবিক ঘাসভিত্তিক খাবারের পরিবর্তে অতিরিক্ত খাদ্য দিতে হচ্ছে।
ঘাস খাওয়া গরুর দুধ থেকে তৈরি পনির সাধারণত বেশি নরম, হলদেটে ও সুগন্ধি হয়। কিন্তু গরুর খাদ্যে ঘাসের পরিমাণ কমে গেলে পনিরের রং ও স্বাদেও পরিবর্তন আসে।
ডেবরা কোলটুনের সান পিয়েত্রোতে চলে যাওয়ার গল্প তাই একদিকে যেমন দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের আকাঙ্ক্ষার কথা বলে, অন্যদিকে এটি মনে করিয়ে দেয়—মানুষের জীবনযাত্রা, খাবার, প্রকৃতি ও জলবায়ু পরস্পরের সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত।












