ভারতের ঘরে ‘দুধ ফেটে যাওয়া’ একসময় ছিল প্রায় বিপদের খবর। দুধ নষ্ট হয়ে গেছে, কারও ভুল হয়েছে—এমন ধারণা থেকেই শুরু হতো দুশ্চিন্তা। অথচ সেই ফেটে যাওয়া দুধই একসময় ভারতীয় খাবার ও মিষ্টির জগৎ বদলে দিয়েছে। আর এখন সেই দুধ থেকে তৈরি বিশেষ চিজ পৌঁছে গেছে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের উপহারের তালিকায়।
৫ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সুইস প্রেসিডেন্ট গি পারমেলিনকে মুম্বাইয়ের একটি চিজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের তৈরি তিন ধরনের ভারতীয় চিজ উপহার দেন। উপহার হিসেবে দেওয়া চিজগুলোর নাম ‘গুলমার্গ’, ‘কোনার্ক’ ও ‘ইউর’।
‘গুলমার্গ’ হৃদয় আকৃতির ব্রি ধরনের চিজ। চলতি বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এটি সুপার গোল্ড পুরস্কার পেয়েছে। ‘কোনার্ক’ একটি দেশি ধাঁচের টম ধরনের চিজ, যার নকশায় ওডিশার সূর্য মন্দিরের রথের চাকার অনুপ্রেরণা রয়েছে। ২০২৩ সালের বিশ্ব চিজ পুরস্কারে এটি স্বর্ণপদক পেয়েছিল। অন্যদিকে ‘ইউর’ আট থেকে নয় মাস ধরে পরিপক্ব করা হয়। এটি গ্রুইয়ের ধরনের চিজ, যার খোসায় গোলাপের পাপড়ি ও মৌরি ব্যবহার করা হয়।

এই তিন ধরনের চিজই তৈরি করেন মুম্বাইয়ের উদ্যোক্তা মৌসুম নারাংয়ের প্রতিষ্ঠান এলেফথেরিয়া। ২০১৫ সালে ছোট একটি জায়গা ও মাত্র একজন সহকারী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির এখন প্রায় ৬৫ জনের দল রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অভিজাত হোটেলেও তাদের চিজ সরবরাহ করা হয়।
সুইজারল্যান্ডে ৪৫০টিরও বেশি ধরনের চিজ রয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিজেও পেশায় কৃষক। ফলে চিজের জন্য বিখ্যাত একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে ভারতীয় চিজ উপহার দেওয়া নিঃসন্দেহে সাহসী ও প্রতীকী কূটনৈতিক বার্তা।
তবে ভারতের চিজের গল্প নতুন নয়। ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুধ উৎপাদনকারী দেশ এবং বিশ্বের মোট দুধ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই দেশটিতে হয়। সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধশিল্প, মহিষ পালন এবং ‘অপারেশন ফ্লাড’ ভারতের দুধ অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে।
দুধের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অবশ্য আরও বহু পুরোনো। গুজরাটের কোটাদা ভাদলি এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের মাটির পাত্রে দুগ্ধজাত চর্বির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কয়েক হাজার বছর আগেও ভারতীয় উপমহাদেশে দুধ প্রক্রিয়াজাত করার প্রচলন ছিল।
বৈদিক সাহিত্যেও দুধ, ঘি ও দইয়ের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে দুধকে শুধু খাবার হিসেবে নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা হতো। তাই দুধকে ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যাসিড দিয়ে জমাট বাঁধানো অনেকের কাছে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল না।
দই তৈরির ক্ষেত্রে দুধ স্বাভাবিকভাবে জমে যায় এবং আগের দিনের দইয়ের সামান্য অংশ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ছানা তৈরিতে দুধকে অ্যাসিড বা টক উপাদান দিয়ে দ্রুত জমাট বাঁধানো হয়। বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পদ্ধতিই পরে মিষ্টি তৈরির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটায়।

ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলেও দুধ থেকে চিজ তৈরির নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল। জম্মুর গুজ্জর ও বাকারওয়াল সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘কালারি’ নামে এক ধরনের তাজা চিজের প্রচলন রয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে ইয়াক বা গরুর দুধ থেকে ‘ছুরপি’ তৈরি করা হয়। শক্ত ধরনের ছুরপি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং তা এতটাই শক্ত হয় যে খাওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে চিবিয়ে নরম করাই যেন বড় কাজ।
ভারতের সমতল অঞ্চলেও দুধের জমাট অংশ দিয়ে খাবার তৈরির ইতিহাস দীর্ঘ। দ্বাদশ শতকের রাজা সোমেশ্বরের সংকলিত ‘মানসোল্লাসা’ গ্রন্থে দুধের কঠিন অংশ আলাদা করে তৈরি করা এক ধরনের মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে ভারতের আধুনিক চিজ তৈরির ইতিহাসে পর্তুগিজদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ষোড়শ শতকে হুগলির কাছে ব্যান্ডেলে পর্তুগিজ বসতি গড়ে ওঠার পর তারা নিজেদের পরিচিত চিজের স্বাদ ধরে রাখতে দুধে অ্যাসিড দিয়ে জমাট বাঁধানোর পদ্ধতি ব্যবহার করে। স্থানীয় রাঁধুনিরাও ধীরে ধীরে এই পদ্ধতি গ্রহণ করেন।
এর ফল হিসেবে তৈরি হয় ‘ব্যান্ডেল চিজ’। ছোট আকারের এই চিজ সাধারণত নোনতা ও ধোঁয়ায় শুকানো হয়। কলকাতার নিউ মার্কেটসহ কিছু জায়গায় এখনো এর দেখা মেলে।
এরপর দুধের এই জমাট অংশ বা ছানা বাংলার মিষ্টি তৈরির জগতে প্রবেশ করে। সেখান থেকেই ছানার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে তৈরি হয় সন্দেশ, রসগোল্লাসহ অসংখ্য মিষ্টি।
রসগোল্লার উৎপত্তি নিয়েও বাংলা ও ওডিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বাংলায় নবীনচন্দ্র দাসকে ১৮৬৮ সালে কলকাতায় রসগোল্লা তৈরির কৃতিত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে ওডিশার দাবি, ছানাভিত্তিক এই মিষ্টির ঐতিহ্য আরও পুরোনো। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও দুই পক্ষই আলাদা স্বীকৃতি পেয়েছে।
ভারতের আধুনিক চিজশিল্পে মৌসুম নারাংয়ের গল্পও আলাদা। মুম্বাইয়ের মুলুন্ডে বেড়ে ওঠা নারাং ফ্রান্স ও জার্মানিতে প্রায় আট বছর মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করেন। সেই সময় ইউরোপের চিজ সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। দেশে ফিরে ২০১৫ সালে তিনি মুম্বাইয়ে এলেফথেরিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।

‘এলেফথেরিয়া’ গ্রিক শব্দ, যার অর্থ স্বাধীনতা। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ এখন বড় একটি চিজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় স্বাদ, স্থানীয় উপকরণ ও ইউরোপীয় চিজ তৈরির কৌশলকে মিলিয়ে নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সুইস প্রেসিডেন্টকে ভারতীয় চিজ উপহার দেওয়ার ঘটনাটি তাই শুধু একটি কূটনৈতিক উপহারের গল্প নয়। এটি ভারতের দুধ, ছানা, মিষ্টি ও চিজ তৈরির কয়েক হাজার বছরের বিবর্তনেরও প্রতীক।
যে দুধ একসময় ঘরে ভুল করে ‘ফেটে গেলে’ হতাশা তৈরি করত, সেই দুধই আজ আন্তর্জাতিক পুরস্কার জেতা চিজে রূপ নিয়ে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে।
এই গল্পে আরও একটি মজার যোগসূত্র আছে। ১৯৫০-এর দশকে সুইস যাজক ফাদার আন্দ্রে বুটি তিব্বতের পথে ভারতে এসে কালিম্পংয়ে থেকে যান। সেখানে তিনি একটি দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে গৌদা ধরনের চিজও তৈরি হতো। স্থানীয়দের কাছে সেই চিজ পরে ‘কালিম্পং চিজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ একসময় সুইস প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের প্রভাব ভারতের চিজ তৈরিতে এসেছিল। আর আজ ভারতীয় চিজই সুইস প্রেসিডেন্টের জন্য উপহার হয়ে ফিরে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের দিকে। দুধ ফাটার সেই পুরোনো গল্প যেন এভাবেই নতুন অর্থ পেয়েছে।












