লাতিন আমেরিকার মাদকচক্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে আফ্রিকায় মোতায়েন থাকা কয়েকটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ ‘রিপার’ ড্রোন কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে সক্ষম এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন নজরদারির পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। একটি ড্রোনের দাম প্রায় ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অভিযানে এ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে বর্তমানে রিপার ড্রোনের সরবরাহও সীমিত। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪৫টি রিপার ধ্বংস হয়েছে, যা দেশটির মোট বহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এমন পরিস্থিতিতে আফ্রিকা থেকে ড্রোন সরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় পাঠানোর সিদ্ধান্তকে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরে পাঠানো ড্রোনের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ঠিক কতটি ড্রোন কোন দেশে গেছে বা এর সবগুলো ইতোমধ্যে সেখানে পৌঁছেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ অঞ্চলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ফ্রান্সিস এল. ডোনোভান এর আগে জানিয়েছিলেন, মাদকপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু সমুদ্রে নৌযান লক্ষ্য করে হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজনে স্থলভাগেও অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র ও মাদকবিরোধী নীতির সঙ্গে যুক্ত সাবেক কূটনীতিক ফ্রান্সিসকো পালমিয়েরি বলেন, আফ্রিকা থেকে রিপার ড্রোন সরিয়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তাঁর মতে, এটি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার পরিধি ও ধরন বাড়ানোর রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে জোট গড়ে তোলা হয়েছে। এসব দেশ মাদকচক্র ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কলম্বিয়া ও ইকুয়েডর এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা নিজেদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনায় সম্মতি দিয়েছে। ওয়াশিংটন দুই দেশের কয়েকটি মাদকপাচারকারী গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কলম্বিয়ার কর্মকর্তারা গ্রীষ্মেই জানিয়েছিলেন, দেশটি তিনটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন গ্রহণে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি আরও একটি ড্রোন কেনার বিষয়ও বিবেচনা করছে দেশটি।
অন্যদিকে ইকুয়েডরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিয়ান কার্লো লোফ্রেদো জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দুটি রিপার ড্রোন ইকুয়েডরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সেগুলো দেশটির আকাশসীমায় ইতোমধ্যে কাজ করছে।
ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া এ বছর নিজের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া প্রথম আঞ্চলিক নেতাদের একজন। তবে দেশটিতে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইকুয়েডরের সংবিধানে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গত বছর এক গণভোটেও দেশটির ভোটাররা এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন।
কলম্বিয়াতেও মাদকবিরোধী সামরিক অভিযান জোরদার হয়েছে। দেশটির নতুন ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা কোকেন পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত কয়েকটি গোষ্ঠীর নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান বাড়িয়েছেন। পাহাড় ও দুর্গম জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এসব নেতাকে শনাক্ত করতে রিপার ড্রোন কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মাদকচক্রের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় বেসামরিক মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীর সদস্য বা শীর্ষ নেতাকে হত্যা করলেই মাদকপাচার বন্ধ হয়ে যায় না। একজন নেতা নিহত হলে তাঁর জায়গায় অন্য কেউ উঠে আসার সম্ভাবনাও থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে মাদকবাহী নৌযানে প্রাণঘাতী হামলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, এসব নৌযানের সদস্যরা শত্রুপক্ষের যোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। কিন্তু বেশ কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞের মতে, শুধু মাদকপাচারে জড়িত থাকার কারণে কাউকে প্রাণঘাতী হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, বিশেষ করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি না হলে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠছে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সক্ষমতা নিয়ে। আফ্রিকা থেকে রিপার ড্রোন সরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় পাঠালে সোমালিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযান বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন।
বিশেষ করে সোমালিয়ায় আল-শাবাবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ড এ বছর বহু বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব অভিযানে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে মাদকচক্র দমনে লাতিন আমেরিকায় সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে আফ্রিকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে হতে পারে।












