ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দর এলাকায়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি ও জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা কাব্য কর্ণাটককে আটক করার খবর পাওয়া গেছে।
ধ্রুব রাঠি ও কাব্য কর্ণাটক আটক
দিল্লিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার আগে ধ্রুব রাঠিকে তাঁর গুরুগ্রামের বাসভবন থেকে আটক করে পুলিশ। ১০ অক্টোবর সকালে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার আবাসিক এলাকায় তাঁর বাসায় পুলিশের একটি দল যায়। পরে পুলিশের নির্দেশ না মানার অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এর আগে পুলিশ রাঠিকে দিল্লিতে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। তিনি সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে আটক করা হতে পারে বলেও পুলিশ জানিয়েছিল। রাঠির আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। দলটি অভিযোগ করে, তরুণদের প্রশ্ন তোলা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই সরকার ভয় পাচ্ছে।
এদিকে, বিক্ষোভের আগে দিল্লির ধৌলা কুয়ান এলাকা থেকে কনটেন্ট নির্মাতা কাব্য কর্ণাটককেও আটক করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
‘কারাগারে যেতেও প্রস্তুত’, বললেন অভিজিৎ দীপকে
বিক্ষোভের আয়োজক অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার বা কারাবাসের ভয় দেখিয়ে তাঁদের আন্দোলন থামানো যাবে না। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
দীপকের ভাষ্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তিনি ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে তাঁরা গ্রেপ্তার হবেন, কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন প্রয়োগের হুমকিতেও তাঁরা পিছু হটবেন না বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করেও সমালোচনা করেছেন দীপকে। তাঁর অভিযোগ, বিক্ষোভের আগে রাজধানীতে যেভাবে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা সরকারের দুর্বলতা ও তরুণদের প্রতি ভয়ের বহিঃপ্রকাশ। তবে এগুলো বিক্ষোভের আয়োজকদের বক্তব্য।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত
ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের জেরেই এই আন্দোলন। সিজেপির দাবি, ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা এই অভিযোগের সঙ্গে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট ও বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ভোটের ব্যবধানের বিষয়টিও যুক্ত করেছেন।
নির্বাচন কমিশন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পূর্ণ কমিশনের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি এসআইআর-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। গত ১০ মাসের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের আপত্তির বিষয়টি বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সিজেপি। এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়েও এ বিষয়ে বিক্ষোভ করেছিল দলটি।
দিল্লিতে ৪০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন
বিক্ষোভের আগে দিল্লিকে কার্যত নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ঢেকে ফেলা হয়েছে। জানা গেছে, দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর মোট ৪০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দিল্লি পুলিশের সদস্যসংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য প্রায় ২৬ হাজার বলে জানানো হয়েছে।
যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় একাধিক স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় মাইকিং করে জমায়েত, মিছিল এবং সড়ক অবরোধের মতো কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভ ঘিরে গুরুতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জনসাধারণের চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের শরীরে বিশেষ ক্যামেরাও লাগানো হয়েছে, যাতে দায়িত্ব পালনের সময়ের ঘটনা ধারণ করা যায়।
রাতভর এক হাজারের বেশি মানুষ আটক
পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির শাহিনবাগ ও জামিয়া নগর এলাকা থেকে ২৫০ জনের বেশি এবং পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিল্লি থেকে ১০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও বিমানবন্দরের কাছ থেকেও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে দিল্লির তিনটি স্টেডিয়ামকে অস্থায়ী আটককেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এক সরকারি কর্মকর্তা। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম, উত্তর দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়াম এবং ইন্ডিয়া গেটের কাছে মেজর ধ্যানচাঁদ জাতীয় স্টেডিয়াম। প্রয়োজনে বুরারির নিরঙ্কারী সমাগম মাঠও ব্যবহার করা হতে পারে।
মেট্রো ও রেল চলাচলে বড় প্রভাব
বিক্ষোভের কারণে দিল্লির গণপরিবহনেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন প্রথমে ৫৭টি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিলেও পরে তালিকা সংশোধন করে ৪৫টি স্টেশনে বিধিনিষেধের কথা জানায়। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার কথা।
এ ছাড়া ১০ অক্টোবর সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন বহু মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলো থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকা কিছু ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেন পরিষেবাও বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাতিল ট্রেনের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
দিল্লির সরাই কালে খান ও নিউ অশোক নগর নমো ভারত স্টেশনও ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে।
বাজার ও দোকানপাটেও বিধিনিষেধ
বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যেও। কনট প্লেস, পালিকা বাজার, জনপথ ও খান মার্কেটের মতো কেন্দ্রীয় দিল্লির কয়েকটি বড় বাজার বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে। তবে লাজপত নগর, সরোজিনী নগর ও চাঁদনি চকের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাঁদের বাজার স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দোকান খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নিতে পারবেন।
এদিকে, দিল্লিতে ৯ ও ১০ অক্টোবর খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁ, বার ও ক্লাবে আগের নিয়মে মদ পরিবেশন চালু থাকার কথা।
যন্তর মন্তরে প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পুলিশ। এমনকি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদেরও বিক্ষোভস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
বিরোধীদের সমর্থন, রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। তিনি বলেছেন, বাধা দিয়ে তরুণদের প্রতিবাদী মনোভাব থামানো যাবে না। তাঁর মতে, ক্ষমতার জোরে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
অখিলেশের বক্তব্য, জনতার প্রতিবাদ শুধু একটি স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রয়োজন হলে তা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁর মন্তব্যে বিক্ষোভকে ঘিরে বিরোধী রাজনীতির সমর্থন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ হলে গুরুতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। এ কারণেই জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সিজেপির বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
দিল্লির এই পরিস্থিতিতে একদিকে ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে বিক্ষোভের অধিকার এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিক্ষোভ কতটা বিস্তৃত হয় এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়ায়, তা এখন দেখার বিষয়।












