কম্বোডিয়ায় ধান চাষের মাধ্যমে বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ধানখেতকে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে তাঁরা রক্ষা করছেন বিরল প্রজাতির সারস পাখি। একই সঙ্গে এ উদ্যোগ কৃষকদের জন্য তৈরি করছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
এ উদ্যোগের নাম ‘ক্রেন রাইস’। কম্বোডিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা নেচারলাইফ কম্বোডিয়া ২০২১ সালে কর্মসূচিটি চালু করে। এর লক্ষ্য, কৃষিকাজের সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমন্বয় ঘটানো এবং ধানখেতের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
কর্মসূচির আওতায় কৃষকেরা সারস পাখির পছন্দের দুটি স্থানীয় জাতের ধান চাষ করেন। জাত দুটি হলো সামবোরক কান্তেউম ও পং লরলর্ক। এসব ধান চাষের পাশাপাশি কৃষকদের মোট উৎপাদনের অন্তত ৫ শতাংশ ধান পাখির জন্য খেতে রেখে দিতে হয়, যাতে পাখিরা খাবার পায়।

কম্বোডিয়ায় সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে সারস পাখিরা অবস্থান করে। এ সময় তাদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে ক্রেন রাইস কর্মসূচি সহায়তা করে। কৃষকেরা যাতে পাখিদের খাবারের জন্য ধান খেতে রেখে দিতে উৎসাহিত হন, সে জন্য তাঁদের আর্থিক ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়।
পরিবেশবান্ধব কৃষিতে বাড়তি প্রণোদনা
ক্রেন রাইস কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কৃষকদের শুধু নির্দিষ্ট জাতের ধান চাষ করলেই হয় না। তাঁদের আরও ১০টি সংরক্ষণবিষয়ক শর্ত মেনে চলতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত রাখা, ফসল কাটার পরপরই জমির অবশিষ্টাংশ পোড়ানো থেকে বিরত থাকা এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনযাত্রায় বিঘ্ন না ঘটানো।
ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়াতে দেরি করার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃষকদের পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ সম্পর্কে নিয়মিত বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁদের বিনা মূল্যে বা ভর্তুকিতে বীজ ও জৈব সার সরবরাহ করা হয়।

আর্থিক সুবিধার অংশ হিসেবে কৃষকেরা পাখির জন্য খেতে রেখে দেওয়া ধানের ক্ষতিপূরণ পান। এ ছাড়া উৎপাদিত ধানের প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য বাজারদরের চেয়ে ৫ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ বেশি দাম দেওয়া হয়। সংস্থাটি এই ধান সংরক্ষণ করে রাখে, যাতে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে গেলে তা কাজে লাগানো যায়।
এ ব্যবস্থায় কৃষকেরা একদিকে যেমন ফসলের ন্যায্য দাম ও বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও সরাসরি অংশ নিতে পারছেন।
ধানখেতও হতে পারে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল
ধানখেতকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের জমি হিসেবে দেখলে এর পরিবেশগত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এসব খেত জলাভূমির মতো কাজ করতে পারে এবং নানা প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক পাখি সংরক্ষণ সংস্থা বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া অঞ্চলের পরিযায়ী পাখির চলাচলের পথ ও প্রজাতি সংরক্ষণবিষয়ক প্রধান ডিং লি ইয়ংয়ের মতে, যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ধানখেত পুরো অঞ্চলের জলাভূমিনির্ভর জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হয়ে উঠতে পারে।
নেচারলাইফ কম্বোডিয়া বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের দেশটিতে জাতীয় অংশীদার সংস্থা। তাদের এ কর্মসূচি কৃষি উৎপাদন ও প্রকৃতি সংরক্ষণের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।

পূর্বাঞ্চলীয় সারস কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামে পাওয়া যায়। এটি সারস পাখির একটি উপপ্রজাতি। সারস পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Grus antigone। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় সারসকে ‘অরক্ষিত’ বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যার মধ্যে কৃষিজমিকে সংরক্ষণকাজে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কম্বোডিয়ার ক্রেন রাইস কর্মসূচি দেখাচ্ছে, কৃষকদের যথাযথ প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তাঁরা জীববৈচিত্র্য রক্ষার অংশীদার হতে পারেন।
এই উদ্যোগের মূল শিক্ষা হলো, কৃষি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। এতে কৃষকের জীবিকা সুরক্ষার পাশাপাশি পাখিদের খাদ্য ও আবাসস্থল রক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।













