পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, কোনো দেওয়ানি মামলা আইনগতভাবে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে দায়ের করা হলে কিংবা মামলাটি স্পষ্টতই হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন হলে বিচারিক আদালত বিবাদীপক্ষের আনুষ্ঠানিক আবেদনের অপেক্ষা না করেই তা খারিজ করতে পারবেন। মামলার প্রাথমিক পর্যায়েই আদালত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন, যাতে অপ্রয়োজনীয় মামলা পরিচালনায় বিচারিক সময় ও সম্পদের অপচয় না হয়।
বিচারপতি মুহাম্মদ আলী মাজহারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ একটি আপিল শুনানির সময় এ পর্যবেক্ষণ দেন। মামলাটি পাকিস্তানের সিন্ধু হাইকোর্টের একটি আদেশকে কেন্দ্র করে করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আট পৃষ্ঠার লিখিত আদেশে বলা হয়েছে, ১৯০৮ সালের লিমিটেশন অ্যাক্টের ৩ ধারা এবং একই বছরের দেওয়ানি কার্যবিধির (সিপিসি) অর্ডার ৭, রুল ১১ অনুযায়ী, আইনগত বাধা থাকলে আদালত নিজ উদ্যোগেই মামলা খারিজ বা আরজি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
করাচির একটি বাড়ি নিয়ে বিরোধ
মামলার সূত্রপাত করাচির রশিদ মিনহাস রোডে অবস্থিত আর্মি অফিসার্স হাউজিং কলোনির আসকারি-৪ এলাকার একটি বাড়ি নিয়ে বিরোধ থেকে। আবদুল ওয়াহাব শাহসহ মূল বাদীরা বাড়িটির মালিকানা ঘোষণা, দখল ও অংশবণ্টনের দাবিতে দেওয়ানি মামলা করেছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিচারিক আদালত মামলাটি তামাদি আইনে নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে দায়ের করা হয়েছে বলে মনে করে বাদীদের আরজি খারিজ করেন। পরে বাদীরা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সিন্ধু হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের আদেশ বাতিল করে আরজি সংশোধনের আবেদনসহ বিচারাধীন অন্যান্য আবেদন একসঙ্গে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।
এরপর বিবাদী মুহাম্মদ ইসলাম বাদশাহ সুপ্রিম কোর্টে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেন। সুপ্রিম কোর্ট এখন হাইকোর্টের ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির আদেশের সেই অংশ বাতিল করেছেন, যেখানে মামলার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি আরজি সংশোধনের আবেদনের সঙ্গে একযোগে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বিবাদীপক্ষের আবেদনের অপেক্ষা করতে হবে না
বিচারপতি মুহাম্মদ আলী মাজহার তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, কোনো আরজি খারিজ করার ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা সব সময় বিবাদীপক্ষের আবেদনের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিশেষ করে, মামলা তামাদি হয়ে গেলে লিমিটেশন অ্যাক্টের ৩ ধারায় আদালতের নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো মামলার আরজি পড়েই যদি বোঝা যায় যে সেটি স্পষ্টতই হয়রানিমূলক, ভিত্তিহীন কিংবা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ৭, রুল ১১ প্রয়োগ করে প্রাথমিক পর্যায়েই কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন। এ জন্য বিবাদীপক্ষের লিখিত জবাবের অপেক্ষা করা কিংবা পুরো মামলার বিচার শুরু করার প্রয়োজন নেই।
এমনকি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিবাদীপক্ষকে সমন পাঠানোর আগেও আদালত এ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। এর ফলে অযৌক্তিক মামলা পরিচালনার খরচ কমবে এবং বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সময় প্রকৃত বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
আদালতের মতে, কোনো মামলায় বাদীর এমন কোনো আইনগত অধিকার বা ক্ষতির বিবরণ না থাকলে, যার ভিত্তিতে প্রতিকার চাওয়া যায়, অথবা প্রচলিত কোনো আইন সরাসরি মামলাটি নিষিদ্ধ করলে শুরুতেই সেটি খারিজ করার সুযোগ রয়েছে।
কোন পরিস্থিতিতে আরজি খারিজ করা যাবে
সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বলা হয়েছে, কোনো আরজি খারিজের আগে আদালতকে কয়েকটি বিষয় যাচাই করতে হবে। প্রথমত, আরজিতে মামলা করার মতো আইনগত কারণ বা প্রতিকারের ভিত্তি উল্লেখ রয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, দাবি করা প্রতিকারের মূল্য কম দেখানো হয়েছে কি না এবং তা সংশোধনের জন্য নির্ধারিত সময় দেওয়ার পরও বাদী সংশোধন করেছেন কি না।
এ ছাড়া, প্রতিকারের মূল্য যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হলেও আরজি দাখিলের জন্য প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি বা স্ট্যাম্পের ঘাটতি রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। আদালত ঘাটতি পূরণের সময় দেওয়ার পরও বাদী তা পূরণে ব্যর্থ হলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে, আরজিতে উল্লেখ করা বক্তব্য থেকেই মামলাটি কোনো আইন দ্বারা নিষিদ্ধ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
আদালত মনে করেন, যেসব মামলা শুরু থেকেই অকার্যকর বা ফলহীন, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা হলে বিচারিক সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রকৃত বিরোধের সমাধানে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে, মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত করতে কোনো পক্ষ যেন প্রক্রিয়াগত কৌশলের আশ্রয় নিতে না পারে, সেদিকেও আদালতকে সতর্ক থাকতে হবে।
সব ক্ষেত্রে খারিজ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি
তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে মামলা খারিজের ক্ষমতা প্রয়োগের অর্থ এই নয় যে প্রতিটি জটিল বা বিতর্কিত মামলা শুরুতেই বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো ত্রুটি যদি কেবল আনুষ্ঠানিক বা সংশোধনযোগ্য হয়, তাহলে সেটিকে চূড়ান্ত আইনগত বাধার সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
আদেশে বলা হয়েছে, কোনো মামলা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য হলে এবং সেই বাধা দূর করার সুযোগ না থাকলে বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আইনগত প্রশ্নের সঙ্গে বাস্তব ঘটনা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের প্রশ্ন জড়িত থাকলে মামলাটি এগিয়ে নেওয়া উচিত।
এ ধরনের ক্ষেত্রে আদালত প্রথমে লিখিত জবাব গ্রহণ, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচার্য বিষয় নির্ধারণ করতে পারেন। এরপর প্রাথমিক আইনগত প্রশ্নের নিষ্পত্তি অথবা পূর্ণাঙ্গ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা যেতে পারে। উভয় পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের সমান সুযোগ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আদালত।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, কোনো আরজির একটি অংশে ত্রুটি থাকলেই পুরো আরজি আংশিকভাবে খারিজ করা যায় না। যদি আরজিতে অন্তত একটি প্রতিকার চাওয়ার দাবি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে শুধু অন্য কোনো দাবি অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ আরজি খারিজ করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার লক্ষ্য শুধু মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং কোনো পক্ষকে আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করা।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্তের নির্দেশ
আদেশের শেষাংশে সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতকে দেওয়ানি মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বাদী ও বিবাদী—উভয় পক্ষকে যথেষ্ট শুনানির সুযোগ দিতে হবে। এরপর আদালতকে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
এই সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন তামাদি হয়ে যাওয়া বা স্পষ্টতই ভিত্তিহীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি জটিল বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করা হয়েছে।












