ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনপ্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যুব বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভ শুরুর আগেই আন্দোলনের নেতাসহ বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন ও কয়েকটি বাজার বন্ধ এবং কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) নির্বাচনে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই তরুণদের আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
বিক্ষোভের আগেই আটক আন্দোলনের নেতারা

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের যুব আন্দোলনটির উদ্যোগে শনিবারের কর্মসূচিতে হাজারো মানুষের অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। তাঁদের ভাষ্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং এর ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অভিযান চালায়। এ সময় কয়েকজনকে বাসে তুলে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পুলিশের তৎপরতার মধ্যেও নতুন বিক্ষোভকারী সেখানে জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের কেউ কেউ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দেন।
আটক বিক্ষোভকারীদের একজন যোগেন্দ্র সোলাঙ্কি বলেন, মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং দেশ এ পরিস্থিতি আর মেনে নেবে না।
এদিকে মুম্বাই থেকে দিল্লিগামী একটি উড়োজাহাজ দিল্লিতে পৌঁছানোর পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
দিল্লিতে পৌঁছানোর আগে দীপকে পুলিশের উদ্দেশে বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করতে চাইলে যেন গ্রেপ্তার করা হয়; তিনি ভয় পান না। টেলিভিশনের দৃশ্যে তাঁকে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে সহযোগিতা করতে বলেন।
আন্দোলনকারীদের নেতাদের আটকের ঘটনাকে ‘কর্তৃত্ববাদী আটক’ বলে অভিহিত করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। দলটির অভিযোগ, শনিবারের সমাবেশের নেতৃত্ব দুর্বল করে দিতে পরিকল্পিতভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আটক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিও জানিয়েছে তারা।
রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা

বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ বাস থামিয়ে যাত্রীদের পরিচয় ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করে। ব্যক্তিগত গাড়িসহ অন্যান্য যানবাহনেও তল্লাশি চালানো হয়। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বসানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ার সরঞ্জামযুক্ত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানও মোতায়েন করা হয়।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি ৪৫টি মেট্রো স্টেশন ও বিভিন্ন বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের যাতায়াত সীমিত করতে পরিবহনব্যবস্থায় নেওয়া এসব পদক্ষেপের কারণে কর্মসূচির সময়সূচিও পিছিয়ে যায়।
বিক্ষোভকারীদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সকাল ১০টায় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সমবেত হওয়ার কথা ছিল। কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত এই স্থানটি সাধারণত বিভিন্ন প্রতিবাদের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে নিরাপত্তা বিধিনিষেধের কারণে সেখানে পৌঁছাতে আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়।
দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে শুক্রবার জানানো হয়েছিল, এই বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ করে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় চার সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে বলে দুটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বাইরে প্রতিবাদ জানাতে আসা কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে বলে আদালতের আইনজীবী সমিতির সভাপতি এক পোস্টে দাবি করেন। এসব আটকের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মোদির সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ
‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগান সামনে রেখে আন্দোলনটি শুরু করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিক্ষোভের অংশ হিসেবে শনিবারের কর্মসূচিকে বড় সমাবেশে পরিণত করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছিলেন।
প্রায় ১৩ কোটি মানুষের এই সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, সরকার নিজেদের নির্বাচনী সুবিধার জন্য ভোটার তালিকায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তারা আবারও সেই অভিযোগ সামনে এনেছে। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা বিজেপির জেতা কয়েকটি সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনের ফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নিজে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজেপির বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা এবং ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নির্বাচনে দলটির সাফল্যের প্রধান কারণ। বিরোধীরা নির্বাচনে জয়ী হতে না পেরে ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর অভিযোগ তুলছে বলেও দলটির দাবি।
তবে বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক বিক্ষোভ মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে মোদির সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক আন্দোলনেও তরুণদের অংশগ্রহণ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
২০২৭ সালের শুরুতে ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ১৩ কোটি নাম
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ভোটার অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি ভোটারের খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার মারা গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব সংখ্যা ভোটার তালিকার খসড়া সংশোধনের পর্যায়ে চিহ্নিত এন্ট্রির হিসাব। ভুলবশত যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা আবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।

তবে বিরোধী দলগুলোর প্রশ্ন, এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা নির্ভুল এবং এতে প্রকৃত ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কি না। তাদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যাচাইয়ের মাধ্যমে মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন ভোটারদের তথ্য চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফলে সংশোধনের চূড়ান্ত তালিকায় কারা থাকবেন এবং বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে নজর রয়েছে রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষকদের।
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটির নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এমন বিতর্ক শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা এবং বাদ পড়া ভোটারদের অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকতে পারে।












