একসময় নারীদের শরীরচর্চা বলতে বোঝানো হতো ওজন কমানো, শরীরের মেদ ঝরানো আর ছিপছিপে গড়ন ধরে রাখা। জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়ানো কিংবা বিভিন্ন ধরনের কার্ডিও ব্যায়াম ছিল সেই চর্চার বড় অংশ। ভারী ওজন তোলার ক্ষেত্রে নারীদের নিরুৎসাহিতও করা হতো। ধারণা ছিল, এতে শরীর অতিরিক্ত পেশিবহুল হয়ে উঠবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলেছে। এখন নারীদের মধ্যে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম বা ওয়েট ট্রেনিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যবয়সী ও বয়স্ক নারীদের জন্য পেশির শক্তি বাড়ানোর গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে।
শরীরের শক্তি বাড়ানো শুধু বাহ্যিক গড়ন পরিবর্তনের বিষয় নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির শক্তি ও হাড়ের ঘনত্ব ধরে রাখা দৈনন্দিন কাজকর্ম, চলাফেরা এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশি শক্তিশালী করতে, হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং বয়সজনিত শারীরিক দুর্বলতা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। এ কারণে অনেক নারী এখন শুধু ওজন কমানোর পরিবর্তে কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠছেন, সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।
তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও নতুন একটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শক্তিশালী হওয়ার জন্য ভারী ওজন তোলা, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ আমিষ খাওয়া এবং ব্যায়ামের অগ্রগতি নিয়মিত হিসাব করার প্রবণতা কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। আগে যেখানে রোগা হওয়াকে সৌন্দর্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হতো, এখন সেখানে পেশিবহুল ও একই সঙ্গে ছিপছিপে শরীরের প্রতি আকর্ষণ নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে সুস্থ থাকার উদ্দেশ্যে শুরু করা শরীরচর্চাই কারও জন্য মানসিক অস্বস্তি ও খাবার নিয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
রোগা হওয়ার চাপ থেকে শক্তিশালী হওয়ার দিকে
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মবিষয়ক অধ্যাপক লিজ বুকার দীর্ঘদিন শরীরচর্চাকে মূলত কার্ডিও ব্যায়ামের দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শরীরকে আরও ছোট ও ছিপছিপে রাখা। কিন্তু মধ্যবয়সে এসে তিনি বুঝতে পেরেছেন, নারীদের শরীরচর্চা নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণাই অসম্পূর্ণ ছিল।
বুকারের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে কেবল ক্যালরি খরচ করার দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে পেশি শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া দরকার। অতিরিক্ত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্যের অবনতির সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি না পেলে হাড়সহ বিভিন্ন শারীরিক ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এখন প্রশিক্ষকের সহায়তায় শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করেন বুকার। তাঁর কাছে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব শুধু শারীরিক শক্তি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি সৌন্দর্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করারও একটি উপায়। তাঁর মতে, নারীরা যখন নিজেদের শরীরকে ছোট করার বদলে আরও সক্ষম করে তোলার দিকে মনোযোগ দেন, তখন শরীরচর্চার উদ্দেশ্যও বদলে যায়।
এই পরিবর্তনের একটি বাস্তব দিক হলো, বয়স বাড়লেও দৈনন্দিন জীবনের কাজ নিজের শক্তিতে করতে পারা। ভারী জিনিস তোলা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা কিংবা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার সক্ষমতা ধরে রাখা অনেক নারীর কাছে শরীরচর্চার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
‘শক্তিই নতুন সৌন্দর্য’—তবু কি পুরোনো চাপের নতুন রূপ?
শরীরচর্চা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক ও লেখক মিকালা জেমিসন মনে করেন, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম অনেক নারীর শরীরের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। অতীতে যাঁরা শরীরচর্চাকে কেবল ওজন কমানো কিংবা খাবার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন, তাঁদের কাছে পেশি গঠন নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
তবে ‘রোগা হওয়াই সৌন্দর্য’ ধারণার পরিবর্তে ‘শক্তিশালী হওয়াই সৌন্দর্য’ প্রতিষ্ঠা করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা নয়। জেমিসনের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তিশালী নারীর যে ছবি বেশি দেখা যায়, সেখানে প্রায়ই পেশিবহুল হওয়ার পাশাপাশি ছিপছিপে শরীরকেও আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে শক্তি অর্জনের নতুন লক্ষ্যটিও শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ধরনের শরীর পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হতে পারে।
জেমিসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে আগের তুলনায় বেশি নারী শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করছেন—এটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু এই প্রবণতার প্রচারে যেসব ছবি সামনে আসে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই দেখা যায় ছোট গড়নের নারী, যাঁদের শরীরে পেশির গঠন স্পষ্ট। ফলে বড় গড়নের কিংবা শরীরে স্বাভাবিক চর্বি থাকা নারীদের শক্তি ও সক্ষমতা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
এখানেই নতুন সৌন্দর্যচাপের ঝুঁকি। একজন নারী শক্তিশালী হতে পারেন, কিন্তু তাঁর শরীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আদর্শ শরীরের মতো না-ও হতে পারে। তাতে তাঁর সক্ষমতা বা সুস্থতার মূল্য কমে যায় না।
পেশি বাড়লে শরীরের গড়নও বদলাতে পারে
নিউইয়র্কের ফর্ম ফিটনেস ব্রুকলিনের সহমালিক ও প্রশিক্ষক কেরি হার্ভে মনে করেন, শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে শরীরের আকার নিয়ে প্রচলিত প্রত্যাশা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। বড় গড়নের নারীরাও শক্তিশালী হতে পারেন। তাঁদের শরীরে মেদ বা সেলুলাইট থাকতে পারে, তবু তাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করে শক্তি অর্জন করতে পারেন।
হার্ভে মনে করিয়ে দেন, পেশি বাড়ানোর সঙ্গে শরীরের গড়নের পরিবর্তনও স্বাভাবিক। পিঠের পেশি বড় হলে অন্তর্বাসের মাপ বদলাতে পারে। বাহুর পেশি শক্তিশালী হলে আগে ঢিলেঢালা থাকা জামা কিছুটা আঁটসাঁট লাগতে পারে। এসব পরিবর্তনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
দীর্ঘদিন ধরে অনেক নারীকে শেখানো হয়েছে, শরীর যত ছোট হবে, ততই ভালো। ফলে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের কারণে শরীরের কোনো অংশ বড় হলে কেউ কেউ হতাশ হতে পারেন। অথচ পেশি গঠনের লক্ষ্যই হলো শরীরকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলা; শরীরকে সব সময় ছোট রাখা নয়।
হার্ভের মতে, শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে শরীরের পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখা গুরুত্বপূর্ণ। সবার শরীর একইভাবে বদলাবে না। তাই অন্য কারও শরীরের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে নিজের শক্তি, সক্ষমতা ও সুস্থতার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা উচিত।
শুধু ওজন তোলার হিসাবেও তৈরি হতে পারে আসক্তি
শরীরচর্চার লক্ষ্য যখন কেবল ওজন কমানো থাকে, তখন কেউ কেউ প্রতিদিনের ওজন কিংবা ক্যালরির হিসাব নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে, যদিও সেখানে হিসাবের বিষয়টি ভিন্ন।
ব্যায়ামের একটি পদ্ধতি হলো ধীরে ধীরে পেশির ওপর চাপ বাড়ানো। একে বলা হয় ‘প্রগ্রেসিভ ওভারলোড’। এর মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে বেশি ওজন তোলা, বেশি বার ব্যায়াম করা কিংবা ব্যায়ামের কঠিনত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পেশির শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু সব সময় আগের চেয়ে বেশি ওজন তুলতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে ব্যায়াম আনন্দের বদলে মানসিক চাপের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ক্রীড়াবিদদের পুষ্টি ও চিকিৎসা নিয়ে কাজ করা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ মেগান হেলনারের মতে, শরীরের নির্দিষ্ট চেহারা অর্জনের জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করলে শারীরিক ও মানসিক—দুই ধরনের ঝুঁকিই তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খেয়ে কঠোর ব্যায়াম চালিয়ে গেলে পর্যাপ্ত শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এই ঘাটতি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম, হরমোনের ভারসাম্য, হাড়ের স্বাস্থ্য ও ব্যায়াম থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
হেলনার এমন এক অবস্থার চিকিৎসা ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে খেলাধুলা বা ব্যায়ামের তুলনায় শরীর পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। এই সমস্যাকে বলা হয় খেলাধুলায় আপেক্ষিক শক্তির ঘাটতি বা ‘রিলেটিভ এনার্জি ডেফিসিয়েন্সি ইন স্পোর্ট’—সংক্ষেপে আরইডি-এস। এটি শুধু পেশাদার ক্রীড়াবিদদের সমস্যা নয়; শরীরের চাহিদার তুলনায় কম খাবার গ্রহণ করে অতিরিক্ত ব্যায়াম করা ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
পেশি গঠনে খাবার কমানো নয়, প্রয়োজনীয় পুষ্টি জরুরি
শরীরচর্চা নিয়ে নতুন প্রবণতার একটি ইতিবাচক দিক হলো, পেশি গঠনের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে ওজন কমানোর প্রচারে বিভিন্ন খাবারকে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু পেশি গঠন ও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শক্তি, আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের ভূমিকা রয়েছে।
হার্ভের মতে, পেশি গঠন করতে হলে শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে হবে। শুধু খাবার কমিয়ে কিংবা ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ করে শক্তিশালী পেশি তৈরি করা যায় না। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ না করলে ব্যায়ামের ফলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক নারীকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ আমিষ খেতে হবে কিংবা পেশি গঠনের জন্য খাবারের প্রতিটি গ্রাম হিসাব করতে হবে। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, দৈনন্দিন কাজকর্ম, ব্যায়ামের ধরন ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবারের প্রয়োজন ভিন্ন হয়।
হেলনারের পরামর্শ, খাবারকে শুধু ব্যায়ামের জ্বালানি হিসেবে দেখা উচিত নয়। শ্বাস-প্রশ্বাস, হরমোন তৈরি, বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শরীরের শক্তি প্রয়োজন। খাবার শরীরের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জীবনের আনন্দ ও সামাজিক সম্পর্কেরও অংশ।
তাই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরের সামগ্রিক প্রয়োজন পূরণ করা, কোনো নির্দিষ্ট শরীরের গড়ন অর্জনের জন্য খাবারকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
বিশ্রামও ব্যায়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ
শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রামও জরুরি। প্রতিদিন একই পেশিতে অতিরিক্ত চাপ দিলে শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যায়ামের চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পেশির শক্তি বাড়ানোর জন্য শরীরকে সময় দিতে হয়।
হার্ভের মতে, যাঁরা আগে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কার্ডিও ব্যায়াম করতেন, তাঁদের জন্য শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে পেশিকে প্রতিনিয়ত ক্লান্ত করে রাখা উচিত নয়। বরং সঠিক পদ্ধতিতে ব্যায়াম করা, ধীরে ধীরে চাপ বাড়ানো এবং প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
হেলনারের মতে, শরীরের ছোট ছোট সতর্কসংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ব্যায়ামের সময় ব্যথা বা আঘাত লাগার পরও বিশ্রাম না নেওয়া কিংবা কোনো দিন ব্যায়াম করতে না পারলে অতিরিক্ত মানসিক অস্বস্তিতে ভোগা উদ্বেগের লক্ষণ হতে পারে।
শরীরের সংকেত উপেক্ষা করে ব্যায়াম চালিয়ে গেলে সাময়িক অগ্রগতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই ব্যায়ামকে শাস্তি, বাধ্যবাধকতা কিংবা প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করার উপায় হিসেবে না দেখে সুস্থ থাকার একটি অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
সবার ব্যায়ামের লক্ষ্য এক হতে হবে না
একজন নারী হয়তো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে চান। আরেকজন হয়তো পেশির শক্তি বাড়াতে বা খেলাধুলার সক্ষমতা উন্নত করতে চান। কারও লক্ষ্য ভারী ওজন তোলা, আবার কারও লক্ষ্য হতে পারে ব্যথামুক্তভাবে চলাফেরা করা কিংবা দীর্ঘদিন স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করা।
এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবার একই ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন নেই। যিনি শুধু দৈনন্দিন জীবনে আরও স্বচ্ছন্দ থাকতে চান, তাঁকে ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো কঠোর রুটিন অনুসরণ করতে হবে না। নিজের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন বেছে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
জেমিসন ও হার্ভে—দুজনেই মনে করেন, শরীরচর্চাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার জন্য ব্যক্তির প্রয়োজন ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কোনো প্রবণতা অনুসরণ করে ব্যায়াম শুরু করলে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
হার্ভে আশা করেন, জিমে নারীদের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করার যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা সাময়িক প্রবণতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর মতে, জিমের ভারোত্তোলন অংশে এখন আগের চেয়ে বেশি নারীকে দেখা যাওয়াটা উৎসাহজনক। তবে এই আগ্রহ ধরে রাখতে হলে শরীরচর্চাকে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত করা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সুস্থতার মাপকাঠি শুধু পেশিবহুল শরীর নয়
শক্তিবর্ধক ব্যায়াম নারীদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বয়সজনিত দুর্বলতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এর সুফল পেতে গিয়ে নতুন কোনো সৌন্দর্যচাপের শিকার হওয়া উচিত নয়।
শরীরের আকার, ওজন কিংবা পেশির দৃশ্যমান গঠন দিয়ে একজন মানুষের সুস্থতা বা সক্ষমতার সম্পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না। কেউ দেখতে পেশিবহুল না হলেও শক্তিশালী হতে পারেন। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আদর্শ শরীরের সঙ্গে মিল না থাকলেও তাঁর ব্যায়াম কার্যকর ও স্বাস্থ্যকর হতে পারে।
জেমিসনের মতে, শরীরচর্চার প্রশংসা পাওয়ার একমাত্র শর্ত হওয়া উচিত নয় ছিপছিপে ও স্পষ্ট পেশিবহুল শরীর অর্জন করা। সুস্থতা, শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতার নানা রূপ রয়েছে। সেই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়াই শরীরচর্চাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শরীরকে আরও সক্ষম করা, নিজের জীবনকে সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সুযোগ বাড়ানো। শরীরকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার প্রতিযোগিতায় পরিণত হলে এই উদ্দেশ্য হারিয়ে যেতে পারে। তাই ব্যায়ামের অগ্রগতি শুধু কতটা ওজন তোলা গেল বা শরীর দেখতে কেমন হলো, তা দিয়ে নয়; বরং শরীর কতটা ভালো আছে, দৈনন্দিন জীবন কতটা সহজ হচ্ছে এবং ব্যায়াম মানসিকভাবে কতটা স্বস্তি দিচ্ছে, তা দিয়েও বিচার করা জরুরি।












