আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায় শেষের পথে। তবে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও ফুটবল থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই তাঁর। বরং অবসরের পর ক্লাবের মালিকানা, তরুণ ফুটবলার গড়ে তোলা এবং নিজের বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য আরও বড় করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।
২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর মেসির ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। এবার সেই অধ্যায়ের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কোচিংয়ের চেয়ে ক্লাবের মালিকানা এবং ফুটবল পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত থাকার আগ্রহই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাতীয় দলের হয়ে ২০৮তম ম্যাচের মধ্য দিয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মেসি। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আবেগঘন সমাপ্তি হতে পারে। আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও তাঁর দখলে।
কোচ নয়, ক্লাবের মালিক হতে চান মেসি
মেসির ঘনিষ্ঠজনদের ধারণা, ভবিষ্যতে তিনি ফুটবল ক্লাবের মালিক হিসেবেই বেশি সক্রিয় থাকবেন। কোচিংয়ের চাপ, নিয়মিত ম্যাচের ফল নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রতিদিনের নানা সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নির্ধারণ করতেই তাঁর আগ্রহ বেশি।
তবে তিনি কেবল নামসর্বস্ব মালিক হয়ে থাকতে চান না। ক্লাবের উন্নয়ন, খেলোয়াড় গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
স্পেনে ইতিমধ্যে সেই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে। বার্সেলোনার উপকণ্ঠে অবস্থিত ইউই কর্নেলা ক্লাবটি তিনি কিনেছেন। তরুণ ফুটবলার তৈরির এই প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যৎ ফুটবল কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব সিডি এলডেন্সের নতুন মালিক হয়েছেন মেসি। অক্টোবরের শুরুতে স্প্যানিশ ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদনসাপেক্ষে মালিকানা ঘোষণার বিষয়টি সামনে আসে। ক্লাবটির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অবনমন এড়ানো। সে জন্য ভিয়ারিয়ালের সাবেক কোচ হাভি কালেয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আপাতত বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে ক্লাবগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মেসি। তবে নিজের কম্পিউটারে এলডেন্সের ম্যাচগুলো নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছেন তিনি। মালিক হওয়ার পর দলটির জয়ের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থনও জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও উরুগুয়েতেও ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামির সঙ্গে মেসির চুক্তি ২০২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর ক্লাবটিতে তাঁর মালিকানার অংশ থাকার কথা। ফলে অবসরের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় থাকবে।
উরুগুয়েতেও ফুটবল নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন মেসি। বন্ধু ও সাবেক সতীর্থ লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠা করেন দেপোর্তিভো এলএসএম। প্রথম মৌসুমেই দলটি দেশের তৃতীয় স্তরে উন্নীত হয়েছে।
একাধিক ক্লাব নিয়ে বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চিন্তা একসময় থাকলেও সেই পরিকল্পনা আপাতত অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। বরং এলডেন্সকে ধাপে ধাপে স্পেনের শীর্ষ লিগে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব কি না, সেদিকেই নজর দিতে চান তিনি।
তরুণ ফুটবলার গড়ায় বিশেষ আগ্রহ
ক্লাবের মালিকানার পাশাপাশি বয়সভিত্তিক ফুটবল উন্নয়নেও মেসির আগ্রহ রয়েছে। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত মেসি কাপের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন নামী ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৬ দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাচ্ছে।
২০২৫ সালে আটটি দল নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে ১৬ হয়েছে। ২৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইন্টার মায়ামির প্রশিক্ষণকেন্দ্রে টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বার্সেলোনা, চেলসি, আর্সেনাল, আতলেতিকো মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলানের মতো ক্লাব।
ছেলের খেলা দেখতে নিয়মিত উপস্থিত থাকা এবং তরুণদের প্রতিযোগিতায় সময় দেওয়ার মধ্য দিয়ে ফুটবলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি মেসির আগ্রহও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ফুটবলের বাইরেও বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
মেসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আরেকটি বড় অংশ তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি, হোটেল, আবাসন প্রকল্প, রেস্তোরাঁ এবং বিপণন কার্যক্রমে বিনিয়োগের মাধ্যমে খেলোয়াড়ি আয়ের বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি।
ফোর্বসের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুনে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। আগের এক বছরে ফুটবল ও ব্যবসা থেকে তাঁর আয় ছিল প্রায় ১৪ কোটি ডলার। অ্যাডিডাসের সঙ্গে আজীবন চুক্তিও তাঁর বাণিজ্যিক পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হোটেল ব্যবসায় তাঁর বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে মিম হোটেলস। ইবিজা থেকে আন্দোরা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ছয়টি বুটিক হোটেল নিয়ে গড়ে উঠেছে এই উদ্যোগ। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে মেলিয়া হোটেলস গ্রুপ ভাড়া চুক্তির আওতায় এগুলো পরিচালনা করছে।
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরেও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ ব্যবসা এবং পানীয়পাত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্ট্যানলির সঙ্গে বিশেষ সংগ্রহ তৈরির উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছেন তিনি।
ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন
মেসির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল তাঁর বাবা হোর্হে মেসির তত্ত্বাবধানে। পরে টেলিভিশন প্রযোজনা, বিপণন, গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বসহ বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বস্ত পরিচালকদের মাধ্যমে এসব উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।
মেসি নিজেও ব্যবসা সম্পর্কে আরও শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যবসা তাঁকে আকর্ষণ করে এবং তিনি এখনো শেখার পর্যায়ে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে মেসির অবসর মানে ফুটবল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং মাঠের খেলোয়াড় থেকে ক্লাবের মালিক, তরুণ প্রতিভা বিকাশের পৃষ্ঠপোষক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী হিসেবে নতুন পরিচয় গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাঁর পরবর্তী অধ্যায়ে ফুটবলই থাকবে কেন্দ্রে, তবে সেই পরিসর আর শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।












