ওজন কমানো ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ মানুষের শরীরের বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করতে পারে—এমন সম্ভাবনা সামনে এনেছে সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা। এসব ওষুধ হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের সুস্থতা রক্ষার পাশাপাশি প্রদাহ কমানো এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যার ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখে। এখন বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন, এসব উপকার কি শুধু নির্দিষ্ট কিছু রোগের ঝুঁকি কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি শরীরের জৈবিক বয়স কমিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
তবে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও এসব ওষুধকে এখনই বার্ধক্য প্রতিরোধের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের আয়ু বাড়াতে এগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
জৈবিক বয়স কমানোর ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির অধ্যাপক ড্যানিকা চেনের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই শুধু আলাদা আলাদা রোগের চিকিৎসা না করে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করা গেলে বয়সজনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমানোর নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
এই সম্ভাবনা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা এখন শরীরের জৈবিক বয়স নির্ণয়ের বিভিন্ন সূচক পরীক্ষা করছেন। মানুষের জন্মগত বা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বয়সের সঙ্গে জৈবিক বয়সের পার্থক্য রয়েছে। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বয়স বাড়লেও শরীরের কোষ, টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা সবার ক্ষেত্রে একই গতিতে কমে না।
জিন কীভাবে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হয়, সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয় এপিজেনেটিক ঘড়ি। আবার শরীরে উৎপন্ন বিভিন্ন প্রোটিনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জৈবিক বয়স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এসব সূচক ব্যবহার করেই জিএলপি-১ ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
৭২ সপ্তাহের গবেষণায় যা দেখা গেল
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলি লিলির গবেষকেরা টিরজেপাটাইড নামের ওষুধ নিয়ে একটি পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ করেছেন। ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত এই ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে জেপবাউন্ড এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মাউঞ্জারো নামে পরিচিত।
গবেষণায় ৭০০ জনের বেশি অতিরিক্ত ওজনের, তবে ডায়াবেটিস নেই—এমন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে ৭২ সপ্তাহ ধরে টিরজেপাটাইড অথবা সেমাগ্লুটাইড দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী বয়স-সম্পর্কিত বিশ্লেষণে টিরজেপাটাইড গ্রহণকারী ৫০ বছরের বেশি বয়সী ৭১ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ৭২ সপ্তাহে একজন মানুষের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বয়স প্রায় ১ দশমিক ৩৮ বছর বাড়ার কথা। কিন্তু টিরজেপাটাইড গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এপিজেনেটিক ঘড়িতে জৈবিক বয়স বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল গড়ে প্রায় ০ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ১ বছর।
কিছু সূচকে জৈবিক বয়স কমার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। অর্থাৎ, শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ ও টিস্যুর কার্যক্রম গবেষণা শুরুর সময়ের তুলনায় তুলনামূলক তরুণ অবস্থার দিকে ফিরেছে বলে মনে হয়েছে।
তবে এই ফলাফল ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষণায় এমন কোনো পৃথক দল ছিল না, যারা ওজন কমানোর ওষুধ ছাড়াই একই সময় ধরে পর্যবেক্ষণে ছিল। ফলে পরিবর্তনগুলো ওষুধের কারণে হয়েছে, নাকি ওজন কমার প্রভাব—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। গবেষণার সময়কালও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়।
সেমাগ্লুটাইডেও মিলেছে সম্ভাবনার ইঙ্গিত
সেমাগ্লুটাইড ওষুধ নিয়েও নতুন গবেষণায় একই ধরনের সম্ভাবনা দেখা গেছে। ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত ওয়েগোভি এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওজেমপিক এই ওষুধের পরিচিত বাণিজ্যিক নাম।
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নোভো নরডিস্কের গবেষকেরা শরীরের বিভিন্ন প্রোটিনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে দাবি করেছেন, সেমাগ্লুটাইড গ্রহণকারীদের হৃদ্যন্ত্রের জৈবিক বয়স প্লাসিবো বা কার্যকর ওষুধবিহীন তুলনামূলক চিকিৎসা গ্রহণকারীদের তুলনায় প্রায় দুই থেকে চার বছর কম ছিল। ফুসফুস, কিডনি, মস্তিষ্ক ও অগ্ন্যাশয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছিল প্রায় এক থেকে চার বছর।
গবেষণাটি এখনো সমকক্ষ বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার আগের পর্যায়ে রয়েছে। তাই এর ফলাফলকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষকদের দাবি, ওজন কমা, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রদাহ হ্রাস দিয়ে পাওয়া সব পরিবর্তনের ব্যাখ্যা করা যায়নি। ওষুধের অন্য কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তা আরও যাচাই করতে হবে।
ইঁদুরের আয়ু বাড়লেও মানুষের ক্ষেত্রে কী হবে?
বার্ধক্য ও দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণায় প্রাণীর ওপর পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হলেও ইঁদুরের তুলনামূলক ছোট জীবনচক্রের কারণে তাদের পুরো জীবনকাল অনুসরণ করা যায়।
বার্কলির গবেষকেরা ২০ মাস বয়সী ইঁদুরের ওপর সেমাগ্লুটাইড প্রয়োগ করে পরীক্ষা চালান। মানুষের বয়সের সঙ্গে আনুমানিক তুলনা করলে এই বয়সের ইঁদুরকে প্রায় ৬০ বছর বয়সী মানুষের সমতুল্য ধরা হয়।
গবেষণার শুরুতে ইঁদুরগুলোর ওজন প্রায় একই ছিল। এরপর একদলকে সেমাগ্লুটাইড এবং অন্য দলকে কার্যকর ওষুধবিহীন ইনজেকশন দেওয়া হয়। সেমাগ্লুটাইড গ্রহণকারী ইঁদুর কম খাবার খায়, ওজন হারায় এবং তুলনামূলক বেশি দিন বেঁচে থাকে।
সেমাগ্লুটাইড গ্রহণকারী ইঁদুরের গড় আয়ু ছিল ৮৩৪ দিন। অন্যদিকে তুলনামূলক দলের ইঁদুরের মোট আয়ু ছিল ৭৪২ দিন। গবেষকেরা মানুষের বয়সের সঙ্গে আনুমানিক তুলনা করে এই ব্যবধানকে প্রায় পাঁচ বছরের সমতুল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ওষুধের প্রভাব কেবল কম খাবার খাওয়ার কারণে কি না, তা বোঝার জন্য আরেকটি দলকে ২৫ শতাংশ কম ক্যালরি দেওয়া হয়। এই দলও তুলনামূলক বেশি দিন বেঁচেছিল। তবে দুই দলের মধ্যে কিছু কার্যকরী পার্থক্য দেখা যায়।
পেশির কার্যক্ষমতা ও চলাফেরার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দলের ফলাফল কাছাকাছি থাকলেও সেমাগ্লুটাইড গ্রহণকারী ইঁদুর গোলকধাঁধা থেকে পথ খুঁজে বের করার পরীক্ষায় তুলনামূলক ভালো করেছিল। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও তারা বেশি সক্ষম ছিল।
গবেষণাটির নেতৃত্বে থাকা ড্যানিকা চেনের মতে, এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে ক্যালরি কমানোর প্রভাবের বাইরেও ওষুধটির কিছু অতিরিক্ত সুবিধা থাকতে পারে। তবে প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ওজন কমানোই কি মূল কারণ?
জিএলপি-১ ওষুধ শরীরের বার্ধক্য প্রক্রিয়ায় কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অতিরিক্ত ওজন কমানো, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রদাহ হ্রাস—এসব পরিবর্তন শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমানোর অস্ত্রোপচারের পরও মানুষের জৈবিক বার্ধক্যের কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। একইভাবে প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে আয়ু বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে ওষুধ গ্রহণের ফলে ওজন কমার বাইরেও বার্ধক্য প্রক্রিয়ায় সরাসরি কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা নির্ধারণ করা এখনো বড় প্রশ্ন। এলি লিলির গবেষক কেভিন ডাফিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রভাবের বড় অংশই ওজন হ্রাস ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হচ্ছে।
সুস্থ মানুষের জন্য কি এই ওষুধ?
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো, অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিস নেই—এমন সুস্থ মানুষ শুধু দীর্ঘায়ু লাভের আশায় এসব ওষুধ গ্রহণ করলে কী ধরনের ফল হতে পারে, তা এখনো জানা যায়নি। দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাব্য উপকার ও ঝুঁকি সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
সিডারস-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের জেমস কার্কল্যান্ডের মতে, জৈবিক বয়স নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত সূচকগুলো এখনো উন্নয়নশীল। বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে গবেষণার কাজে এগুলো সহায়ক হলেও একজন ব্যক্তির শরীরের বয়স নির্ধারণে ফলাফল সব সময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এসব সূচকে দিনভেদে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
তাই প্রাথমিক গবেষণার ফলাফল দেখে জিএলপি-১ ওষুধকে বার্ধক্য প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় মনে করা ঠিক হবে না। মানুষের আয়ু বাড়ানো, দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা এবং ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
মূল কথা হলো, জিএলপি-১ ওষুধের সম্ভাবনা শুধু ওজন কমানো বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ কি না, তা নিয়ে গবেষণা এগোচ্ছে। কিন্তু মানুষের বার্ধক্য ধীর করা কিংবা আয়ু বাড়ানোর ওষুধ হিসেবে এগুলোর কার্যকারিতা এখনো প্রমাণিত নয়।












