বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে আসে। দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়া—সব ক্ষেত্রেই অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে একা থাকা প্রবীণদের জন্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা দুর্ঘটনার মুখে পড়া বড় ঝুঁকির কারণ। এই পরিস্থিতিতে সহজে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে চীনের ‘স্মার্ট বাটন’ প্রযুক্তি। ঘরে বসে একটি বোতাম চাপলেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে স্থানীয় সহায়তা পরিষেবার সঙ্গে, প্রয়োজনে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছেন কমিউনিটি কর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
চীনের বেইজিংয়ের ইউচং টংলি আবাসিক এলাকার ৮২ বছর বয়সী নি গত চার দশক ধরে সেখানে বসবাস করছেন। বয়সের কারণে এখন তাঁর চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে ঘরের ছোটখাটো কাজ নিজেই করতে পারলেও বর্তমানে অনেক কিছুতেই অন্যের সাহায্য নিতে হয়।
সম্প্রতি হঠাৎ তাঁর বাঁ পা অবশ হয়ে আসে। এমন পরিস্থিতিতে সাহায্য পেতে তাঁকে কাউকে খুঁজতে হয়নি কিংবা ফোনে দীর্ঘ নম্বর ডায়াল করতে হয়নি। ঘরে থাকা বিশেষ যন্ত্রটির বোতাম চাপতেই যোগাযোগ হয়ে যায় স্থানীয় কমিউনিটি সহায়তা পরিষেবার সঙ্গে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর দরজায় পৌঁছে যান কমিউনিটি কর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
এক বোতামেই জরুরি সহায়তা
‘স্মার্ট বাটন’ মূলত এমন একটি সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, যার সাহায্যে প্রবীণ ব্যক্তিরা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা চাইতে পারেন। বিশেষ করে যাঁরা একা থাকেন, চলাফেরায় সমস্যায় ভোগেন কিংবা স্মার্টফোন ব্যবহারে অসুবিধা অনুভব করেন, তাঁদের জন্য এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নি জানান, আগে বাড়ির বাতি নষ্ট হলে নিজেই মেরামত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন পায়ে আগের মতো শক্তি না থাকায় ছোটখাটো কাজেও অন্যের সাহায্য নিতে হয়। তাঁর মতে, প্রয়োজনের সময় ফোনে নম্বর খুঁজে ডায়াল করার বদলে একটি বোতাম চাপলেই সাহায্য চাওয়া যায়। এই সরল ব্যবস্থাই তাঁর দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
দুই হাজারের বেশি প্রবীণের জন্য উদ্যোগ
বেইজিংয়ের ইউচং টংলি আবাসিক এলাকায় দুই হাজার ১০০ জনের বেশি প্রবীণ বসবাস করেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ৭০ বছরের বেশি। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে একা থাকা এবং শারীরিকভাবে অসহায় ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ‘স্মার্ট টেশং’ প্রকল্পের আওতায় বাড়িতে বাড়িতে বিশেষ যোগাযোগযন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় প্রবীণরা সরাসরি কমিউনিটি পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কমিউনিটি কর্মীরাও নিয়মিত তাঁদের খোঁজখবর নেন। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাঁকে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এর ফলে প্রবীণদের জরুরি প্রয়োজন শনাক্ত করা এবং দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা কাছে না থাকলেও সাহায্য চাওয়ার একটি বিকল্প পথ তৈরি হচ্ছে।
দেড় বছরে ১৭ বার অ্যাম্বুলেন্স ডাকার অভিজ্ঞতা
নি ও তাঁর স্ত্রীর অভিজ্ঞতা এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। চীনা নববর্ষের আগের এক রাতে তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন শোবার ঘরে বসেই স্মার্ট বাটনের সাহায্যে জরুরি সহায়তা চান নি। দ্রুত সাড়া দেয় জরুরি চিকিৎসাসেবা।
নি জানান, গত দেড় বছরে তাঁকে অন্তত ১৭ বার অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়েছে। প্রতিবারই বিছানায় বসে একটি বোতাম চাপার মাধ্যমে সাহায্য চেয়েছেন তিনি।
তাঁর অভিজ্ঞতায়, স্ত্রীর অসুস্থতার সময় এই ব্যবস্থা তাঁদের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমিয়েছে। জরুরি মুহূর্তে ফোন নম্বর খোঁজা কিংবা নিজে বাইরে গিয়ে সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন না হওয়ায় দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।
চিকিৎসাসেবার বাইরেও সহায়তা
স্মার্ট বাটনের ব্যবহার শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এ ধরনের ব্যবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রবীণদের জন্য নিরাপদ ও স্বনির্ভর জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা এখন অনেক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। পরিবারের সদস্যরা কর্মস্থলে থাকলে কিংবা দূরে বসবাস করলে একা থাকা বয়স্ক ব্যক্তিদের হঠাৎ অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার সময় দ্রুত সহায়তা পাওয়া কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সহজে ব্যবহারযোগ্য যোগাযোগপ্রযুক্তি তাঁদের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এমন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে জরুরি বার্তা পাওয়ার পর কত দ্রুত সাড়া দেওয়া হচ্ছে, স্বাস্থ্যকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে যোগাযোগ কতটা কার্যকর এবং পরিষেবাটি সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপরও।
প্রযুক্তিতে নিরাপদ বার্ধক্যের সম্ভাবনা
চীনের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, প্রবীণদের সহায়তায় প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সব সময় জটিল যন্ত্র বা কঠিন ব্যবহারবিধির প্রয়োজন হয় না। সহজ একটি বোতামও জরুরি মুহূর্তে সাহায্য চাওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
বিশেষ করে একা থাকা প্রবীণদের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে এবং দৈনন্দিন জীবনে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি নিয়মিত খোঁজখবর, সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা এবং কার্যকর কমিউনিটি সহায়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স্ক মানুষের মর্যাদা ও স্বনির্ভরতা বজায় রেখে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্মার্ট বাটনের মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












