সুন্দর কোনো জায়গায় গেলে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে মোবাইল ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়া মানুষের ভিড়। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার, কেউ সাধারণ ব্যবহারকারী। ছবি ও ভিডিও ধারণের এই প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্র এখন ক্যামেরা ব্যবহারে বিধিনিষেধ দিচ্ছে। জায়গার পরিবেশ ও অন্যদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাই এর মূল যুক্তি।
বিলাসবহুল হোটেলেও কড়াকড়ি
ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের বিলাসবহুল হোটেল দু ক্যাপ-এডেন-রক তার অভিজাত অতিথি, ফরাসি রিভিয়েরার দৃশ্য এবং ইনফিনিটি পুলের জন্য পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ছবি ও ভিডিও ধারণ বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ নিয়ম করেছে, আগে অনুমতি না নিয়ে সেখানে ফটোশুট করা যাবে না।
কিছু মানুষ হোটেলটির রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবারের বুকিং দিয়ে সঙ্গে আনতেন পোশাক ও গয়নার ব্যাগ। খাওয়ার বদলে তাঁরা হোটেলের পরিবেশকে ছবি তোলার মঞ্চ বানাতেন, এতে অন্য অতিথিদের ব্যক্তিগত পরিসর ব্যাহত হচ্ছিল। হোটেলটির ব্যবস্থাপক সোফি ভোলাঁ বলেন, অতিথিরা চান গ্রীষ্মের এই অবকাশকেন্দ্র ব্যক্তিগত পরিসর হিসেবেই থাকুক।
সাধারণ দোকানেও চাপ
যুক্তরাজ্যের চেশায়ারের খামারজাত খাবারের দোকান দ্য হলিস রিয়েলিটি শো ‘লাভ আইল্যান্ড’-এর তারকা মলি-মে হেগের ছবি প্রকাশের পর কনটেন্ট নির্মাতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। চাপ সামলাতে দোকানটি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ছবি ও ভিডিও ধারণ নিষিদ্ধ করেছে।
লন্ডনের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ সিম্পসনস ইন দ্য স্ট্র্যান্ডের উদ্যোক্তা জেরেমি কিং ফেব্রুয়ারিতে এক নিবন্ধে রেস্তোরাঁয় ইনফ্লুয়েন্সারদের অতিরিক্ত উপস্থিতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যানটাকেটে একটি দোকানের ‘ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রবেশ নিষেধ’ সাইনবোর্ড ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভারমন্টের পমফ্রেট শহরে শরতের রঙিন পাতার সামনে ইনফ্লুয়েন্সারদের ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জাপানের ফুজিকাওয়াগুচিকোতে মাউন্ট ফুজির সামনে ছবি তোলার জনপ্রিয় একটি লসন কনভিনিয়েন্স স্টোরের কাছে পর্দা টানানো হয়েছিল, যাতে ভিড় কমে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমে।
গোপনীয়তাই বড় যুক্তি
হোটেল ও রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ছবি তোলার ভিড় অতিথিদের গোপনীয়তা বিঘ্নিত করে। বিলাসবহুল হোটেলে মানুষ নিরিবিলি পরিবেশ ও একান্ত সময়ও চান। মার্সেইয়ের কাছে লে রোশ রুজ হোটেলের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বিউমিয়েরের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আনা ফেদু বলেন, তাঁদের হোটেলে ছবি তোলায় নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই, প্রচারের জন্য কখনো কখনো ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে কাজও করেন। তবে তাঁদের ব্যবসা আতিথেয়তা, ফটো স্টুডিও চালানো নয়।
মুহূর্ত উপভোগ, নাকি দেখানো
এই বিতর্কের পেছনে বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ অভিজ্ঞতা উপভোগের বদলে তা অন্যকে দেখানোয় বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছে কি না। তরুণদের নিয়ে কাজ করা বিপণন সংস্থা লিভিটির অ্যালেক্স গোট এর সঙ্গে সেসব সংগীত ক্লাবের তুলনা করেছেন, যেখানে দর্শনার্থীদের ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রাখতে বলা হয়। উদ্দেশ্য, মানুষ যেন ছবি না তুলে সরাসরি পরিবেশ উপভোগ করেন।
ইনফ্লুয়েন্সারদের বিরুদ্ধে ধারণা কতটা ঠিক
প্রচলিত ধারণা, ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রচারের বিনিময়ে বিপুল অর্থ আয় করেন। বাস্তবে সবার ক্ষেত্রে তা নয়। ইনফ্লুয়েন্সারদের সংগঠন ক্রিয়েটর ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা নিকোল ওক্রান বলেন, অধিকাংশ কনটেন্ট নির্মাতা বিনা পারিশ্রমিকে বেশির ভাগ কনটেন্ট বানান, ব্র্যান্ডের নজর কাড়ার আশায়। তবে কেউ কেউ সীমা ছাড়িয়ে অন্যদের বিরক্তির কারণ হতে পারেন, সেটিও তিনি মানেন।
‘ইনফ্লুয়েন্সার ক্রিপ’ বইয়ের লেখক সোফি বিশপ মনে করেন, এসব নিষেধাজ্ঞার পেছনে শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতও কাজ করতে পারে। কারণ ইনফ্লুয়েন্সার জগৎ মূলত নারীদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা, আর অভিজাত হোটেলের গোপনীয়তার যুক্তির সঙ্গে উচ্চবিত্তের নিজস্ব রুচির ধারণাও জড়িয়ে থাকে।
নিষেধাজ্ঞা নয়, ভারসাম্য
আনা ফেদুর মতে, সমাধান ভারসাম্যে। ইনফ্লুয়েন্সাররা নিরিবিলি সময়ে ছবি তুলতে পারেন, যাতে অন্য অতিথিরা বিরক্ত না হন। তবে অতিথিদের অভিজ্ঞতাই সবার আগে।
বিশ্বে পাঁচ দশমিক চার বিলিয়নের বেশি মানুষ প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। তাই ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক কেবল জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়ে নয়, সাধারণ মানুষের অভ্যাসের সঙ্গেও জড়িত। নিকোল ওক্রানের আশা, এসব নিয়ম মানুষকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে সাহায্য করবে। তাঁর মতে, প্রতিটি জায়গা সবার সামনে তুলে ধরার জন্য নয়, আর প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে কনটেন্ট বানানোও জরুরি নয়।












