ব্রিটিশ রক সংগীতের কিংবদন্তি ডেভিড বোয়ির সংগীতজীবন, শিল্পীসত্তার পরিবর্তন এবং বিচিত্র মঞ্চ-অবয়ব নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন আন্তর্জাতিক নৃত্যপ্রযোজনা। ‘সাবজেক্ট টু চেঞ্জ: আ ড্যান্স ফর ডেভিড বোয়ি’ নামের এই প্রযোজনায় তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের গান পরিবেশিত হবে নতুন কোরাস সংগীতের আয়োজনে। স্পেনের খ্যাতনামা নৃত্যপরিচালক মার্কোস মোরাউয়ের পরিকল্পনায় নির্মিত এই প্রযোজনার বিশ্বমঞ্চে প্রথম প্রদর্শনী হবে লুক্সেমবার্গে। এরপর ২০২৮ সালের শরতে লন্ডনের স্যাডলার্স ওয়েলস মঞ্চে এটি পরিবেশিত হবে।
১৯৮৩ সালে ডেভিড বোয়ি গেয়েছিলেন, ‘লেটস ড্যান্স’। গানের কথায় ছিল লাল জুতা পরে নাচের আহ্বান। কয়েক দশক পর তাঁর সেই আহ্বান যেন নতুনভাবে ফিরে আসছে এই নৃত্যপ্রযোজনায়। তবে এটি কেবল তাঁর জনপ্রিয় গান কিংবা মঞ্চের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নয়। বরং একজন শিল্পী কীভাবে নিজেকে বারবার বদলে নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছেন, সেই সৃজনশীল যাত্রাই হয়ে উঠবে প্রযোজনাটির মূল বিষয়।
নিজেকে বদলে নেওয়ার মধ্যেই ছিল বোয়ির স্বাতন্ত্র্য
ডেভিড বোয়ির শিল্পীজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নিজের পরিচয়কে কখনোই একটি নির্দিষ্ট অবয়বে আটকে না রাখা। সংগীত, পোশাক, মঞ্চসজ্জা, শারীরিক অভিব্যক্তি এবং ব্যক্তিত্ব—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁর এই রূপান্তর কখনো নতুন সংগীতধারার জন্ম দিয়েছে, কখনো বদলে দিয়েছে দর্শকের কাছে তাঁর পরিচিতি।
নৃত্যপরিচালক মার্কোস মোরাউ মনে করেন, একজন শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো নিজের পরিচিত রূপের মধ্যেই আটকে পড়া। বোয়ি সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছিলেন।
মোরাউয়ের ভাষায়, পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বোয়ি নিজের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার পথ খুঁজে নিয়েছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
মোরাউয়ের মতে, প্রতিটি নতুন শিল্পকর্মেরই উচিত শিল্পীকে পরিচিত ধারণার কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা। শিল্পের কাজ শুধু আমরা কে, তা নিশ্চিত করা নয়; বরং সময়ের সঙ্গে জীবন কীভাবে আমাদের বদলে দেয়, সেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করতেও শেখানো। মানুষের ভেতরের স্ববিরোধিতাও বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই ভাবনা থেকেই নৃত্যপ্রযোজনাটিতে বোয়ির পরিচিত অবয়বগুলোকে হুবহু পুনর্নির্মাণের পরিবর্তে তাঁর সৃজনশীল স্বাধীনতা ও পরিবর্তনশীল সত্তাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হবে।
জিগি স্টারডাস্ট থেকে থিন হোয়াইট ডিউক
ডেভিড বোয়ির সংগীতজীবনে একাধিক কাল্পনিক চরিত্র বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব চরিত্রের প্রতিটির সঙ্গে যুক্ত ছিল আলাদা পোশাক, শারীরিক অভিব্যক্তি, মঞ্চব্যক্তিত্ব এবং সংগীতের ধরন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত জিগি স্টারডাস্ট। মহাকাশ থেকে আসা এক কাল্পনিক রক তারকা হিসেবে এই চরিত্র বোয়িকে আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। জিগি স্টারডাস্টের মাধ্যমে তিনি সংগীত ও মঞ্চে প্রচলিত তারকা-পরিচয়ের ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।
এ ছাড়া ‘অ্যালাডিন সেইন’, ‘হ্যালোইন জ্যাক’ এবং ‘থিন হোয়াইট ডিউক’ তাঁর শিল্পীজীবনের উল্লেখযোগ্য অবয়ব। বিশেষ করে ‘ডায়মন্ড ডগস’ পর্বের হ্যালোইন জ্যাক এবং পরবর্তী সময়ের থিন হোয়াইট ডিউক চরিত্র তাঁর সৃজনশীল বিবর্তনের আলাদা আলাদা দিক তুলে ধরে।
মোরাউয়ের মতে, বোয়ির প্রতিটি নতুন চরিত্রের সঙ্গে সংগীতের পাশাপাশি বদলে যেত তাঁর শরীরী ভাষা। পোশাক কিংবা মেকআপের পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের শরীরকে নতুনভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা।
তিনি বলেন, বোয়ির কাছে শরীর ছিল সংগীত ও পোশাকের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের শরীরকে তিনি যেন কল্পনার এক বিস্তৃত ভূখণ্ডে পরিণত করেছিলেন। এই স্বাধীনতা তাঁকে শুধু নতুন শিল্পীসত্তা নির্মাণের সুযোগ দেয়নি, বরং জীবনকে দেখার নতুন পথও তৈরি করেছিল।
পোশাকেও ছিল শিল্পীসত্তার প্রকাশ
নতুন নৃত্যপ্রযোজনার প্রচারণামূলক ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে বোয়ির বিখ্যাত ‘টোকিও পপ’ পোশাকের নকশা। কালো ভিনাইলের তৈরি এই জাম্পস্যুটে ছিল বিশেষ রেখার নকশা। জাপানি পোশাক-নকশাকার কানসাই ইয়ামামোতো ১৯৭৩ সালে জিগি স্টারডাস্ট চরিত্রে মঞ্চে পরার জন্য এটি তৈরি করেছিলেন।
বোয়ির পোশাকগুলো তাঁর মঞ্চব্যক্তিত্ব নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে সেগুলো কেবল দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জা ছিল না। প্রতিটি পোশাকের মধ্য দিয়ে তিনি একটি নির্দিষ্ট চরিত্র, সংগীতের ধরন এবং নিজেকে প্রকাশের নতুন পদ্ধতি সামনে আনতেন।
মোরাউ এই শারীরিক ও দৃশ্যগত পরিবর্তনকে নৃত্যের ভাষায় রূপ দিতে চান। তাঁর লক্ষ্য বোয়ির পরিচিত ভঙ্গি অনুকরণ করা নয়; বরং তাঁর শরীরী প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা ও প্রতিবাদের মনোভাব ফুটে উঠেছিল, তা নতুনভাবে অনুসন্ধান করা।
স্মৃতিচারণ নয়, নতুন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা
‘সাবজেক্ট টু চেঞ্জ’ প্রযোজনায় বোয়ির গানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কোরাস সংগীতের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করা হবে। এতে কণ্ঠ দেবেন স্প্যানিশ সংগীতশিল্পী মারিয়া আরনাল।
মোরাউ স্পষ্ট করেছেন, তিনি বোয়িকে হুবহু অনুকরণ করতে চান না। একইভাবে প্রযোজনাটিকে অতীতের প্রতি আবেগনির্ভর শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবেও দেখতে চান না।
তাঁর আগ্রহ বরং অন্য জায়গায়। বোয়ির পরিচিত কণ্ঠ থেকে গানগুলো বেরিয়ে এসে যখন ভিন্ন কণ্ঠ, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তখন সেগুলোর অর্থ কীভাবে বদলে যায়—সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চান তিনি।
বিভিন্ন কোরাস সংগীতের ঐতিহ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত শিল্পসৃষ্টিকে সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। মোরাউ মনে করেন, একটি শিল্পকর্ম তত দিন জীবন্ত থাকে, যত দিন মানুষ সেটিকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করতে পারে। তাঁর মতে, বোয়ির শিল্পীসত্তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে তাঁকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার সাহস দেখানো।
এই দৃষ্টিভঙ্গি নৃত্যপ্রযোজনাটিকে সাধারণ সংগীতভিত্তিক পরিবেশনা থেকে আলাদা করেছে। এখানে বোয়ির গান হবে একটি সূচনা, যার মধ্য দিয়ে নৃত্যশিল্পীরা অনুসন্ধান করবেন পরিচয়, পরিবর্তন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের নানা দিক।
নৃত্যের সঙ্গে বোয়ির দীর্ঘ সম্পর্ক
ডেভিড বোয়ির সঙ্গে নৃত্যের সম্পর্ক তাঁর সংগীতজীবনের তুলনায় কম আলোচিত হলেও তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এডুয়ার লক ও অ্যানি বি পারসনের মতো উল্লেখযোগ্য নৃত্যপরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
তাঁর নৃত্যশিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত মূকাভিনয়শিল্পী লিন্ডসে কেম্প। কেম্পের কাছ থেকে বোয়ি শরীরী অভিব্যক্তি, মঞ্চে চলাফেরা এবং অভিনয়ের বিভিন্ন কৌশল শিখেছিলেন।
কেম্প স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, বোয়ি এমন সব তাৎক্ষণিক অভিনয় ও শারীরিক অভিব্যক্তির অনুশীলনে অংশ নিতেন, যার মধ্যে সমুদ্রে ডুবে যাওয়া নাবিকদের দৃশ্যও ছিল।
১৯৬৭ সালে কেম্প পরিচালিত ‘পিয়েরো ইন টারকোয়েজ’ নামের একটি মঞ্চপ্রযোজনায় বোয়ি অভিনয় করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী শিল্পীজীবনের কিছু চরিত্র নির্মাণেও প্রভাব ফেলেছিল। পিয়েরো চরিত্রটি পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পীসত্তার একটি বিকল্প পরিচয়ে পরিণত হয়।
মঞ্চে অভিনয়, নৃত্য এবং শরীরী ভাষার এই অভিজ্ঞতা বোয়ির সংগীত পরিবেশনাকে আরও বহুমাত্রিক করে তোলে। ফলে তাঁর গানকে নৃত্যের মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
মৃত্যুর দশ বছর পরও অমলিন বোয়ি
২০১৬ সালে মৃত্যুর পরও ডেভিড বোয়িকে ঘিরে আগ্রহ কমেনি। তাঁর সংগীত, পোশাক, মঞ্চপরিকল্পনা এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে নতুন নতুন শিল্পকর্ম তৈরি হচ্ছে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে নিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। লন্ডনের লাইটরুমে চলছে ‘ডেভিড বোয়ি: ইউ আর নট অ্যালোন’ শীর্ষক প্রদর্শনী। অন্যদিকে, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরে সংরক্ষিত বোয়ির সংগ্রহশালা, যেখানে ইয়ামামামোতোর তৈরি পোশাকও রয়েছে, আগামী মাসে ভ্রমণ প্রদর্শনীতে যাওয়ার কথা।
এই ধারাবাহিক আগ্রহের পেছনে রয়েছে বোয়ির বহুমাত্রিক শিল্পীসত্তা। তিনি শুধু জনপ্রিয় গান তৈরি করেননি; সংগীতের মাধ্যমে পরিচয়, লিঙ্গভিত্তিক প্রচলিত ধারণা, পোশাক এবং মঞ্চে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের প্রচলিত নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁর শিল্পীজীবন দেখিয়েছে, একজন শিল্পীকে নিজের পরিচিত রূপের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয় না। বরং পরিবর্তনকে গ্রহণ করেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যায়।
মার্কোস মোরাউয়ের নতুন নৃত্যপ্রযোজনার কেন্দ্রীয় ভাবনাও সেটিই। ডেভিড বোয়িকে অতীতের একটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন না করে তাঁর শিল্পীসত্তাকে বর্তমানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা। গানের সঙ্গে নৃত্য, বিভিন্ন সংস্কৃতির কোরাস এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বোয়ির সৃজনশীল উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে আবিষ্কার করাই এই প্রযোজনার লক্ষ্য।












