দাঁড়াশ সাপ বিষধর নয়। এটি বাংলাদেশের অতি পরিচিত একটি নির্বিষ সাপ, ইংরেজিতে যার নাম ইন্ডিয়ান র্যাট স্নেক (Ptyas mucosa)। লম্বা, চটপটে আর দিনের বেলায় চলাফেরা করে বলে একে মানুষ প্রায়ই দেখে।
ইঁদুর এর প্রিয় খাবার। তাই খেত আর গোলার ফসল বাঁচাতে দাঁড়াশ বড় ভূমিকা রাখে। অথচ গোখরা ভেবে গ্রামে-শহরে এই উপকারী সাপটি প্রায়ই মারা পড়ে।
এক নজরে
- বৈজ্ঞানিক নাম: Ptyas mucosa; ইংরেজি নাম: ইন্ডিয়ান র্যাট স্নেক বা ধামন
- বিষ নেই, এটি নির্বিষ সাপ
- সাধারণত ২ মিটারের কম লম্বা, বড়গুলো ৩ মিটার পর্যন্ত হয়
- দিনে সক্রিয়, দ্রুত চলে, গাছে চড়ে ও সাঁতার কাটে
- প্রিয় খাবার ইঁদুর, ব্যাঙ ও কুনোব্যাঙ
- ফণা নেই, তবু গোখরা ভেবে প্রায়ই মারা পড়ে
- আইইউসিএনের লাল তালিকায় “ন্যূনতম উদ্বেগ” শ্রেণির প্রাণী
দাঁড়াশ সাপ দেখতে কেমন
দাঁড়াশের শরীর লম্বা কিন্তু সরু ও মসৃণ। গায়ের রং সাধারণত হালকা হলুদাভ বাদামি বা জলপাই-বাদামি। কোনো কোনো এলাকায় প্রায় কালচে দাঁড়াশও দেখা যায়।
দেহের পেছনের দিকে আর লেজে কালো দাগ বা ডোরা বেশি স্পষ্ট। চোখ বেশ বড়, চোখের মণি গোল। মাথা গোখরার চেয়ে সরু এবং এর কোনো ফণা নেই।
দাঁড়াশ কলুব্রিড পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের বেশির ভাগ সাপের মতো এটিও নির্বিষ। বাংলাদেশের গ্রাম, মফস্বল এমনকি শহরের প্রান্তেও এটি খুব সাধারণ একটি সাপ।
পূর্ণবয়স্ক দাঁড়াশ সাধারণত ২ মিটারের কম লম্বা হয়। তবে বড় দাঁড়াশ ৩ মিটার পর্যন্তও হতে পারে। গ্রামে কেউ কেউ নামটি দাড়াশ বা দারাশ লিখেও খোঁজেন।
দাঁড়াশ সাপ কি বিষধর?
না, দাঁড়াশ সাপ নির্বিষ। এর কামড়ে মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া হয় না। তবে ধরা পড়লে বা কোণঠাসা হলে শুরুতে এটি আক্রমণাত্মক হতে পারে এবং কামড় দিতে পারে।
কামড়ের জায়গা পরিষ্কার রাখুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর কোন সাপ কামড়েছে তা নিশ্চিত না হলে দেরি না করে হাসপাতালে যান। কারণ দূর থেকে দেখে সাপ চেনায় ভুল হতে পারে।
দাঁড়াশ সাপের স্বভাব: কী খায়, কোথায় থাকে
দাঁড়াশ সামলাতে পারে এমন প্রায় যেকোনো ছোট প্রাণী খায়। তবে এর পছন্দের খাবার ইঁদুর, ব্যাঙ আর কুনোব্যাঙ। পাখি আর টিকটিকিও এর খাদ্যতালিকায় আছে। অজগরের মতো শিকারকে পেঁচিয়ে দম বন্ধ করে না, বরং ধরে ফেলে দ্রুত গিলে ফেলে। দাঁড়াশ দিনের আলোতেই শিকার করে। তাই অনেকে খেতের আলে বা গোলাঘরের পাশে দাঁড়াশকে ইঁদুর ধরতে দেখেছেন।
এটি খেতখামার, বন আর শহরের আশপাশে সব জায়গায় থাকতে পারে। যেখানে ইঁদুর বেশি, সেখানে দাঁড়াশও বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে এবং চীনে এই সাপ পাওয়া যায়।
দাঁড়াশ দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। খুব দ্রুত চলতে পারে, সহজে গাছে চড়ে এবং দক্ষ সাঁতারু, পানিতে ডুবও দিতে পারে। তাই পুকুরপাড়ে, খালের ধারে বা গাছের ডালেও একে দেখা যায়। দিনে সক্রিয় বলেই রাতের সাপগুলোর তুলনায় দাঁড়াশ মানুষের চোখে বেশি পড়ে।
দাঁড়াশ সাপের নাচ কি আসলে মিলন?
গ্রামে অনেকে দুটি সাপকে পেঁচিয়ে মাথা উঁচু করে দুলতে দেখে ভাবেন, এটি গোখরা আর দাঁড়াশের মিলন। এই ধারণা ঠিক নয়।
আসলে এটি দুটি পুরুষ দাঁড়াশের শক্তির লড়াই। একে বিজ্ঞানীরা কমব্যাট ডান্স বা লড়াইয়ের নাচ বলেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শরীর পেঁচিয়ে একে অপরকে মাটিতে চেপে ধরার চেষ্টা করে।
ধরা পড়লে দাঁড়াশ কেমন আচরণ করে
হঠাৎ ধরা পড়লে বা কোণঠাসা হলে দাঁড়াশ বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখন সে বারবার ছোবল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে কিছু সময় পর সাধারণত শান্ত হয়ে আসে।
এই আচরণ আত্মরক্ষার জন্য, মানুষকে আক্রমণ করার জন্য নয়। সুযোগ পেলে দাঁড়াশ সবসময় পালিয়ে যেতেই পছন্দ করে। তাই সাপটিকে বিরক্ত না করে সরে যাওয়ার পথ খোলা রাখাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
দাঁড়াশ ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করে।
দাঁড়াশ আর গোখরা সাপের পার্থক্য
দাঁড়াশকে সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে ফেলা হয় গোখরার সঙ্গে। দুটিই লম্বা, রং প্রায়ই বাদামি ধরনের, আর দুটিই মানুষের ঘরবাড়ির কাছে ইঁদুরের খোঁজে আসে। তাই ঝোপের ভেতর দিয়ে দ্রুত চলে যেতে দেখলে অনেকেই দাঁড়াশকে গোখরা ভেবে ভয় পান।
সহজ কয়েকটি পার্থক্য মনে রাখলে ভুল কম হয়:
- গোখরা ভয় পেলে ফণা তোলে; দাঁড়াশের কোনো ফণা নেই
- দাঁড়াশের মাথা গোখরার চেয়ে সরু
- দাঁড়াশ সাধারণত মানুষ দেখলে দ্রুত পালিয়ে যায়
- দাঁড়াশ নির্বিষ; গোখরা মারাত্মক বিষধর
তবে দূর থেকে বা আধো আলোয় চেনা কঠিন। তাই নিশ্চিত না হলে যেকোনো সাপকে বিষধর ধরে নিয়ে দূরে থাকাই নিরাপদ। গোখরা সম্পর্কে আরও পড়ুন: গোখরা সাপ: ভয় ও বিস্ময়ের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
দাঁড়াশ সাপ দেখলে বা কেউ সাপের কামড় খেলে কী করবেন
বাড়িতে বা উঠানে দাঁড়াশ ঢুকলে মারবেন না। দরজা খুলে বের হওয়ার পথ করে দিন এবং শিশু ও গবাদিপশু দূরে রাখুন। প্রয়োজনে স্থানীয় বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারীর সাহায্য নিন।
সাপটি দাঁড়াশ কি না, তা নিশ্চিত না হলে খালি হাতে ধরার চেষ্টা করবেন না। কেউ কামড় খেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো মনে রাখুন:
- রোগীকে শান্ত রাখুন এবং কামড়ানো হাত বা পা যতটা সম্ভব নড়াচড়া না করান
- শক্ত করে বাঁধন দেবেন না, ক্ষত কাটবেন না, মুখ দিয়ে চুষবেন না
- ক্ষতে গাছগাছড়া বা রাসায়নিক লাগাবেন না, ঝাড়ফুঁকে সময় নষ্ট করবেন না
- সাপ মারার চেষ্টা না করে দ্রুত রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিন
দাঁড়াশের কামড়ে বিষক্রিয়া হয় না ঠিকই। কিন্তু ভুল চেনার ঝুঁকি থাকে বলে যেকোনো সাপের কামড়েই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
বাংলাদেশে দাঁড়াশ সাপের গুরুত্ব
ইঁদুর প্রতি বছর খেতের ফসল আর গোলার শস্যের বড় ক্ষতি করে। দাঁড়াশ ইঁদুর খেয়ে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ কারণে অনেকে দাঁড়াশ সাপকে কৃষকের বন্ধু বলেন। দাঁড়াশ মারা পড়লে এলাকায় ইঁদুরের প্রাকৃতিক শত্রু কমে যায়, যার মাশুল শেষ পর্যন্ত কৃষককেই দিতে হতে পারে।
দাঁড়াশের চামড়ার বাণিজ্যিক চাহিদা আছে। চামড়া আর মাংসের জন্য বিভিন্ন দেশে এদের শিকার করা হয়। বিশ্বজুড়ে আইইউসিএনের লাল তালিকায় এটি এখনো “ন্যূনতম উদ্বেগ” শ্রেণিতে আছে। তবু গোখরা ভেবে অকারণে মেরে ফেলা আর চামড়ার জন্য শিকার স্থানীয়ভাবে এদের সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে। স্কুলে, পরিবারে দাঁড়াশ আর গোখরার পার্থক্য শেখানো গেলে অনেক সাপ বেঁচে যাবে।
বাংলাদেশের বিষধর সাপ চিনতে পড়ুন: বাংলাদেশের বিষধর সাপগুলো কেমন ও কোথায় থাকে। আর সাদা কালো ডোরার সাপ নিয়ে জানতে পড়ুন: সাদা কালো ডোরাকাটা সাপ: কোনটি বিষধর কাল কেউটে, কোনটি নিরীহ।
সাধারণ প্রশ্ন
দাঁড়াশ সাপ কি বিষাক্ত?
না, দাঁড়াশ সাপ নির্বিষ। তবে ভয় পেলে কামড় দিতে পারে, তাই একে ধরতে যাবেন না।
কালো দাঁড়াশ সাপ কি আলাদা কোনো সাপ?
দাঁড়াশের রং এলাকাভেদে হালকা বাদামি থেকে কালচে পর্যন্ত হয়, তাই কালচে দাঁড়াশ দেখা অস্বাভাবিক নয়। তবে কালো গায়ে সরু সাদা ডোরা থাকলে সেটি বিষধর কাল কেউটে হতে পারে।
দাঁড়াশ সাপ কত বড় হয়?
সাধারণত ২ মিটারের কম লম্বা হয়। বড় দাঁড়াশ ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
দাঁড়াশ সাপ কামড়ালে কী করবেন?
ক্ষত পরিষ্কার রাখুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কোন সাপ কামড়েছে নিশ্চিত না হলে দেরি না করে হাসপাতালে যান।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২১ অক্টোবর ২০২৬












