বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য নতুন এক মাইলফলক তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো দেশের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে স্থান করে নিয়েছে। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ উৎসবের ‘হরাইজনস’ বিভাগে মনোনীত হয়েছে।
বাংলাদেশের সিনেমার জন্য ঐতিহাসিক অর্জন
বিশ্বের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর একটি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে হাজারো জমা পড়া ছবির মধ্য থেকে একাধিক ধাপের বাছাই শেষে মাত্র ১৯টি চলচ্চিত্র ‘হরাইজনস’ বিভাগে জায়গা পেয়েছে। সেই তালিকায় স্থান পাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে দেশের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হলেও প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলাদেশি সিনেমার এটি প্রথম মনোনয়ন। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের চলচ্চিত্রের অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ভেনিসে
রুবাইয়াত হোসেনের এটি চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি একাধিক আলোচিত সিনেমা নির্মাণ করলেও এবারই প্রথম ভেনিসের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে সুযোগ পেলেন।
পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিটি নির্মাণ ছিল তাঁর জন্য গভীর ব্যক্তিগত এক যাত্রা। পারিবারিক শোক, শারীরিক অসুস্থতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের মতো করে ছবিটি নির্মাণ করেন। শুরুতে কোনো নির্দিষ্ট উৎসবকে লক্ষ্য না রেখে গল্প ও নির্মাণের স্বাধীনতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
নারীর অভিজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের গল্প
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ একটি মনস্তাত্ত্বিক ভৌতিকধর্মী সামাজিক চলচ্চিত্র। বিয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকা এক তরুণীকে ঘিরে সৌন্দর্য, শরীর, বিশ্বাস, স্মৃতি এবং ভয়ের জটিল অভিজ্ঞতা এই ছবির মূল বিষয়।
রুবাইয়াত হোসেন বরাবরের মতো এবারও নারীর জীবন ও অভিজ্ঞতাকেই গল্পের কেন্দ্রে এনেছেন। তাঁর মতে, চারপাশের বাস্তবতা থেকেই তিনি গল্প খুঁজে নেন এবং সেই অভিজ্ঞতাই চলচ্চিত্রে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নির্মিত চলচ্চিত্র
চলচ্চিত্রটি নির্মাণে ইউরোপের একাধিক আন্তর্জাতিক তহবিল ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তা রয়েছে। এটি বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশনার দায়িত্বও একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবেশনা সংস্থা নিয়েছে, যা ছবিটির বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আরও বাড়িয়েছে।
নতুন মুখের বড় মঞ্চে অভিষেক
এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়নীন করিম। এটি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র, আর প্রথম কাজ দিয়েই বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম এবং মোহাম্মদ বারী।
পরিচালক পুরো অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁদের সমর্থন ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না।
সামনে বৈশ্বিক যাত্রা
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হবে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। সেখানে ছবিটির বিশ্বপ্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই মনোনয়ন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিক পরিসরে আরও পরিচিত করে তুলবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সিনেমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ভেনিসের এই স্বীকৃতি সেই যাত্রায় নতুন এক আত্মবিশ্বাস যোগ করল।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্বাচিত হওয়ায় দেশের চলচ্চিত্রে যুক্ত হলো নতুন ইতিহাস। রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এখন আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নিজেদের গল্প তুলে ধরার অপেক্ষায়।












