৫৫ বছর বয়সে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের বাসিন্দা ক্রেইগ সেলেক। বহু বছরের চাকরি ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এবার একটু ভিন্ন কিছু করা যাক। সেই সিদ্ধান্তই তাকে নিয়ে যায় উড়োজাহাজের কেবিনে—ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রশিক্ষণ শেষ করে নতুন পেশায় যোগ দেন ৫৬ বছর বয়সী ক্রেইগ। তার ভাষায়, এটি তার কর্মজীবনের ‘তৃতীয় অধ্যায়’। আর নতুন এই কাজে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, বয়স এখানে বাধা নয়; বরং এত বছরের জীবন ও কাজের অভিজ্ঞতাই তার বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে।
কলেজ শেষ করার পর ক্রেইগ ১৫ বছর হংকংয়ের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এরপর তিনি নিউ ব্যালান্সের একটি দোকানের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে স্যাকস অফ ফিফথে নেতৃত্বস্থানীয় পদেও কাজ করেন। খুচরা বিক্রয় খাতে তার মোট ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল।
তবে দীর্ঘদিনের সেই পেশায় কাজ করতে করতে একসময় তার মনে হলো, এবার নতুন কিছু করা দরকার। নতুন সুযোগ খুঁজতে গিয়ে বিমান সংস্থায় কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
বয়সী বন্ধুদের দেখেই অনুপ্রেরণা
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হওয়ার সিদ্ধান্তে ক্রেইগকে উৎসাহ দিয়েছিলেন তার কয়েকজন বন্ধু। তাদের অনেকেই চল্লিশের শেষ ভাগ কিংবা পঞ্চাশের দশকে গিয়ে কর্মজীবনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অধ্যায় হিসেবে এই পেশা বেছে নিয়েছেন।
বন্ধুদের উৎসাহে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি আবেদন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিমান সংস্থাগুলো—আমেরিকান এয়ারলাইনস, ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ও ডেল্টা—বয়স্ক প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহী এবং গ্রাহকসেবা খাতের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেয় বলে তিনি জানতে পারেন।
তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকেই চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন ক্রেইগ। তবে ডেল্টার নিয়োগপ্রক্রিয়া তার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে সাক্ষাৎকারের সময় তিনি লক্ষ্য করেন, তার দলের প্রায় অর্ধেক প্রার্থীর বয়স ৪৫ বছরের বেশি। এমনকি একজন প্রার্থীর বয়স ছিল ৬২ বছর।
এতে ক্রেইগের কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়—ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের পেশায় বয়স সবসময় বাধা নয়।
ধৈর্য আর অভিজ্ঞতাই বড় শক্তি
ক্রেইগ মনে করেন, বহু বছরের কর্মজীবন তাকে নতুন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু দক্ষতা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকদের কথা মন দিয়ে শোনা, পরিস্থিতি বুঝে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং চাপের মুহূর্তে শান্ত থাকার অভ্যাস তার কাজে বড় ভূমিকা রাখছে।
তার মতে, বয়সের সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতা বাড়ে। আর সেই অভিজ্ঞতা মানুষের প্রয়োজন বুঝতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীলভাবে সাড়া দিতে সাহায্য করতে পারে।
খুচরা বিক্রয় খাতে কাজ করার সময় কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, সেটিও এখন বিমানে কাজে লাগছে। কোনো যাত্রী কোনো সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে তার প্রথম চিন্তা থাকে—কীভাবে পরিস্থিতি সামলে যাত্রীকে সন্তুষ্ট করা যায়।
ক্রেইগের কাছে নতুন কাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আগে শুনতে হবে, তারপর প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। বয়সের সঙ্গে পাওয়া ধৈর্য ও অভিজ্ঞতাকে তিনি তাই নিজের শক্তি হিসেবে দেখছেন।
২৫০ যাত্রীকে ১১ ঘণ্টা সামলানো
নতুন পেশায় যোগ দেওয়ার পরপরই এমন একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ক্রেইগ, যা তার দক্ষতার বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
একটি ফ্লাইটের আটলান্টা থেকে নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছাতে সাধারণত দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু ভয়াবহ আবহাওয়ার কারণে সেই যাত্রা দীর্ঘ হয়ে মোট ১১ ঘণ্টায় পৌঁছে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে বিমানে থাকা প্রায় ২৫০ যাত্রীর ধৈর্য ধরে রাখা সহজ ছিল না। কিন্তু ক্রেইগ ও তার সহকর্মীরা পুরো সময় যাত্রীদের সামলে রাখেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
তার মতে, কঠিন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং তাদের স্বস্তিতে রাখার অন্যতম উপায় হলো সদয় ও ইতিবাচক থাকা।
কাজের সঙ্গে ঘুরে দেখা নতুন শহর
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হওয়ার আরেকটি দিক ক্রেইগের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়—নতুন নতুন জায়গা দেখা।
আগেও তিনি অনেক ভ্রমণ করেছেন। তবে কর্মী হিসেবে কোনো শহরে যাওয়া তার কাছে একেবারেই আলাদা অভিজ্ঞতা। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহর এখন তার পরিচিত হয়ে উঠছে।
ওয়াইওমিংয়ের জ্যাকসন হোল তার সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্যগুলোর একটি। কলোরাডো স্প্রিংস এবং মন্টানার বোজম্যানও তার ভালো লাগে। এসব জায়গার খাবার, শিল্প ও স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে তিনি আগ্রহী।
আন্তর্জাতিক গন্তব্যের মধ্যেও লিসবন, রোম, লন্ডন ও এথেন্সের মতো শহর তার ভ্রমণতালিকায় রয়েছে।
ক্রেইগের কাছে একই শহর পর্যটক হিসেবে দেখা আর বিমানকর্মী হিসেবে দেখা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা। কাজের সুবাদে তিনি শহরগুলোর দৈনন্দিন জীবন, খাবার ও সংস্কৃতিকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
৯২ বছরের বাবাও সঙ্গী হন ভ্রমণে
নতুন চাকরির আরেকটি সুবিধা ক্রেইগের জন্য বিশেষ আনন্দের। তার বাবা রিচার্ডের বয়স ৯২ বছর। তিনি এখনো সক্রিয় এবং ভ্রমণের জন্য সক্ষম। কর্মী হিসেবে পাওয়া সুবিধার কারণে বাবা তার সঙ্গে বিনা খরচে ভ্রমণ করতে পারেন।
সম্প্রতি বাবা-ছেলে একসঙ্গে ডাবলিন ও প্যারিস ঘুরে এসেছেন। এমনকি একটি ফ্লাইটে ক্রেইগের বাবা প্রথম শ্রেণির কেবিনে বসে আইসক্রিম সানডে উপভোগ করেছেন।
ক্রেইগের কাছে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এমন ভ্রমণ তার নতুন কর্মজীবনের অন্যতম আনন্দের বিষয়।
প্রথম বছরেই ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগ
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে ক্রেইগের আয় শুধু মূল বেতনের ওপর নির্ভর করে না। বিমানে ওঠার দায়িত্ব এবং রুট পরিবর্তনের মতো কাজের জন্য অতিরিক্ত অর্থও পাওয়া যায়।
নিয়োগের সময় তাকে জানানো হয়েছিল, কাজের সময়সূচি ও উড্ডয়ন ঘণ্টার ওপর নির্ভর করে প্রথম বছরেই তার মোট আয় ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে তিনি ২০৯টি ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ২৯টি ছিল দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।
এত কম সময়ে এতগুলো ফ্লাইটে কাজ করার পরও নতুন পেশা নিয়ে তার উচ্ছ্বাস কমেনি। বরং নিজের ভাষায়, জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি নতুন অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনকে উপভোগ করছেন।
পঞ্চাশের মাঝামাঝি বয়সে দাঁড়িয়েও ক্রেইগ মনে করেন, নতুন কিছু শুরু করার জন্য বয়সই শেষ কথা নয়। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকলে জীবনের পরের অধ্যায়ও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।












