জীবনের কিছু মুহূর্ত এতটাই ব্যক্তিগত ও মূল্যবান যে সেগুলো সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ না করে প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সরাসরি ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। বিয়ে, বাগদান, নতুন বাড়ি কেনা কিংবা সন্তানের আগমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করলে মুহূর্তেই অনেক অভিনন্দন, মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে সামনাসামনি পাওয়া আলিঙ্গন, চোখের জল কিংবা কাছের মানুষের আন্তরিক উচ্ছ্বাসের তুলনা হয় না—এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন লেখিকা রেনেট ফ্লানাগান।
কয়েক বছর আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন পেয়েছিলেন তিনি। বন্ধু উচ্ছ্বসিত হয়ে জানালেন, তার জীবনে অসাধারণ একটি ঘটনা ঘটেছে—তারা বাগদান করেছেন। প্রেমিক কীভাবে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, সে গল্পও তিনি ফোনেই শুনিয়েছিলেন। দুজনের সম্পর্কের আন্তরিকতা ও মিল দেখে লেখিকাও বন্ধুর জন্য আনন্দিত হয়েছিলেন।
কয়েক দিন পর সামাজিক মাধ্যমে সেই বাগদানের ছবি দেখতে পান তিনি। ছবিতে বন্ধুর আঙুলে ঝলমল করছিল একটি পুরোনো নকশার হীরার আংটি—যেটি তার হবু স্বামীর দাদির পারিবারিক স্মারক। ফোনে বন্ধুটি যে গল্প বলেছিলেন, ছবিটি যেন তারই প্রকাশ্য সংস্করণ হয়ে উঠেছিল।
তবে লেখিকার কাছে বিষয়টি শুধু একটি ছবি বা সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট ছিল না। সময়ের সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ খবর বন্ধুরা তাকে অনেক সময় সরাসরি জানাতেন। কখনও হঠাৎ ফোন করে বলতেন, ‘চলো দেখা করি।’ দূরে থাকলে ফোনে কথা বলতেন।
এসব কথার মধ্যে যেমন আনন্দের খবর থাকত, তেমনি থাকত কঠিন সময়ের কথাও। কারও গর্ভধারণ, সম্পর্কের বড় কোনো পরিবর্তন কিংবা জীবনের নতুন অধ্যায়ের খবর যেমন তিনি শুনেছেন, তেমনি শুনেছেন বিবাহবিচ্ছেদ, চাকরি হারানো বা গুরুতর অসুস্থতার খবরও।
অনেক সময় বন্ধুদের কাছ থেকে সরাসরি খবর শোনার পর তিনি দেখতেন, একই বিষয় পরে সামাজিক মাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তার মনে হয়েছে, বন্ধুটি আগে তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানানোয় তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত ও আপন বোধ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে সবার সামনে একটি পোস্ট দেখার চেয়ে কাছের মানুষ নিজে যোগাযোগ করে তার জীবনের খবর জানানোকে তিনি বেশি মূল্যবান মনে করেছেন।
নিজের জীবনে সেই অভিজ্ঞতাই বেছে নিলেন
২০২৩ সাল ছিল লেখিকার জীবনের বিশেষ একটি বছর। বছরের শুরুতে তিনি ও তার প্রেমিক পাহাড়ে একটি ছুটির বাড়ি কিনেছিলেন। বসন্তে সেই বাড়িতেই এক তারাভরা রাতে প্রেমিক তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
তখন দুজনের বয়সই ত্রিশের মাঝামাঝি। তারা সংসার গড়ার পাশাপাশি সন্তান নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছিলেন। গ্রীষ্মে তারা খুব ঘনিষ্ঠ পরিসরে বিয়ে করেন। জায়গাটিও ছিল বিশেষ—তিন বছর আগে যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, সেখানেই আয়োজন করা হয়েছিল সেই অন্তরঙ্গ বিয়ের অনুষ্ঠান।
এরপর শরতে পরিবার ও বন্ধুদের জানানো হয় আরও একটি সুখবর—তারা প্রথম সন্তানের অপেক্ষায়।
এতগুলো বড় ঘটনা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটায় সামাজিক মাধ্যমে সবকিছু প্রকাশ করার ইচ্ছা তারও হয়েছিল। বাড়ি কেনা, বাগদান, বিয়ে এবং সন্তান আসার খবর—সবকিছুর ছবি তুলে একের পর এক পোস্ট করা যেত।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি অন্য পথ বেছে নেন। ছবির বদলে বন্ধুদের কাছে পাঠান ব্যক্তিগত বার্তা—‘চলো দেখা করি’ অথবা ‘চলো ফোনে কথা বলি।’
নতুন বাড়ি কেনার পরও তারা সামাজিক মাধ্যমে চাবি হাতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেননি। বরং বন্ধুদের সঙ্গে পানীয়ের আড্ডায় বসে খবরটি জানিয়েছেন। বন্ধুরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছেন, তারা নতুন বাড়িটি দেখতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারছেন না। সেই মুহূর্তে সবাই মিলে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন।
এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় আলিঙ্গনের মাঝেই তার হাতে থাকা হীরার আংটির ঝিলিক চোখে পড়ে। বন্ধু তখনই বুঝতে পারেন, জীবনে নতুন কিছু ঘটেছে। আরেক বন্ধু বাড়িতে উপহার নিয়ে আসেন। সেখানে ফ্রিজে রাখা অস্পষ্ট আল্ট্রাসাউন্ডের ছবির এক ঝলক দেখে তিনি বুঝতে পারেন, পরিবারে নতুন অতিথি আসছে। আনন্দে তার চোখে জল চলে আসে।
‘লাইক’-এর চেয়ে আলিঙ্গন বেশি মূল্যবান
লেখিকার মতে, এত অল্প সময়ে জীবনে এত বড় পরিবর্তন আসায় কয়েক মাস পর পর দেখা হওয়া বন্ধুদের কাছে ‘কী খবর?’ প্রশ্নের উত্তরও কখনও অবিশ্বাস্য শোনাত।
উত্তরটা এমন হতো—‘আমরা বাড়ি কিনেছি, বাগদান করেছি, এখন বিয়েও হয়ে গেছে, আর আমরা একটি সন্তানের অপেক্ষায় আছি।’
প্রতিবার কাছের মানুষদের এসব সুখবর জানানোর সময় তিনি অনুভব করেছেন, নিজের আনন্দ যেন আবার নতুন করে ফিরে আসছে। কারণ অন্য মানুষের মুখে আনন্দের ছাপ দেখা, বিস্ময় অনুভব করা কিংবা আবেগে চোখ ভিজে যেতে দেখা—এসব মুহূর্ত নিজের স্মৃতিরও অংশ হয়ে যায়।
তার কাছে সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে পাওয়া অসংখ্য ‘লাইক’ বা হৃদয়চিহ্নের চেয়ে প্রিয় মানুষের একটি আন্তরিক আলিঙ্গন অনেক বেশি অর্থবহ। ব্যক্তিগতভাবে খবরটি জানানোর অপেক্ষা এবং প্রিয় মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তার কাছে এমন এক আনন্দ তৈরি করেছে, যা শুধু অনলাইনে খবর প্রকাশ করলে পাওয়া সম্ভব হতো না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তি বা সামাজিক মাধ্যমকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। বরং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেই তিনি মনে করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় থাকা মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে ফোন ও সামাজিক মাধ্যম নিঃসন্দেহে কার্যকর।
কিন্তু জীবনের আনন্দ-বেদনার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো কীভাবে ভাগ করে নেওয়া হবে, সে ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগত যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কাছাকাছি থাকলে সরাসরি দেখা করা, আর দূরে থাকলে ফোনে কথা বলাই তার কাছে সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে ধরে রাখার উপায় হয়ে উঠেছে।
জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সবার সামনে তুলে ধরতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কখনও কখনও একটি সুখবরকে সামাজিক মাধ্যমের অসংখ্য প্রতিক্রিয়ার বদলে কয়েকজন প্রিয় মানুষের সঙ্গে বসে ভাগ করে নেওয়াই সেই মুহূর্তকে আরও গভীর, উষ্ণ ও স্মরণীয় করে তুলতে পারে।












