মাত্র ১০ বছর বয়সে নিজের প্রসাধনী ব্র্যান্ড তৈরির স্বপ্ন দেখেছিল সিডনি মায়ার্স। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার মা-বাবা। একসময় চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা বাবা হয়ে গেলেন মেয়ের প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। আর মায়ের দায়িত্ব হলো সৃজনশীল দিকটি দেখভাল করা। পরিবারের এই সম্মিলিত উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় জনপ্রিয় মার্কিন ব্যবসায়িক রিয়েলিটি শো ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এ। সেখানে সিডনির প্রতিষ্ঠান ‘গ্লিমার উইশ’ পায় ২ লাখ ডলারের বিনিয়োগ।
গ্লিমার উইশ মূলত শিশুদের জন্য তৈরি সৌন্দর্যপণ্য ও প্রসাধনী ব্র্যান্ড। তবে এর বিশেষত্ব হলো—শিশুদের পছন্দের রঙিন, মজার ও কল্পনাময় নকশার সঙ্গে নিরাপদ উপাদান ব্যবহারের চেষ্টা। সিডনির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পে তাই ব্যবসার পাশাপাশি আছে পরিবারের কঠিন সময়, স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এবং একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার গল্প।
সিডনির মা টিফানি মায়ার্স জানান, মেয়েরা ছোট থাকার সময় তিনি নিজেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। গাড়ি চালানোর সময় শ্বাসকষ্ট এতটাই বেড়ে যেত যে পেছনে সন্তানদের নিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার ভয় হতো। দীর্ঘ সাত বছর পর জানা যায়, তিনি লাইম রোগে আক্রান্ত।
রোগ নির্ণয়ের পর পরিবারের জীবনযাপনে বড় পরিবর্তন আনেন টিফানি। খাবার থেকে শুরু করে ঘর পরিষ্কারের পণ্য—সবকিছুতেই তিনি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন।
কিন্তু তার মেয়ে সিডনির পছন্দ ছিল সৌন্দর্যপণ্য ও প্রসাধনী। টিফানি তাকে নিরাপদ বা তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন উপাদানে তৈরি পণ্য ব্যবহার করতে উৎসাহিত করলেও সিডনির কাছে সেগুলো খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। তার ভাষায়, যেসব পণ্যের গন্ধে চা-গাছের তেল বা ল্যাভেন্ডারের মতো উপাদানের প্রাধান্য ছিল, সেগুলো শিশুদের কাছে আনন্দদায়ক মনে হতো না।
সেখান থেকেই সিডনির মাথায় আসে নতুন ধারণা। মাত্র ১০ বছর বয়সে সে এমন একটি সৌন্দর্যপণ্যের ব্র্যান্ড তৈরির পরিকল্পনা করে, যেগুলো হবে শিশুদের কাছে আনন্দদায়ক ও কল্পনাময়, আবার মায়ের নির্ধারিত নিরাপত্তার মানও পূরণ করবে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘গ্লিমার উইশ’।
মায়ের গবেষণা, মেয়ের কল্পনা
সিডনির বাবা বায়রন মায়ার্স আগে থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে প্রায় দুই দশক ধরে সেটি পরিচালনা করেন। তাই মেয়ের ব্যবসার পরিকল্পনা শুনে তিনি তাকে একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে বলেন। পরিকল্পনা তৈরি হলে তিনি সেটিকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
এরপর টিফানিও পণ্যের উপাদান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শুরু করেন। সিডনি নিজেই তার স্বপ্নের বোতলের নকশা আঁকত। সে চেয়েছিল বোতলগুলো কখনো ইউনিকর্ন, কখনো জলপরির আকৃতির হোক।
কিন্তু এমন অস্বাভাবিক আকৃতির বোতল তৈরি করা সহজ ছিল না। এ ধরনের নকশা বাস্তবায়ন করতে পারে—এমন প্রস্তুতকারক খুঁজে পেতে টিফানিকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়।
সিডনি মূলত পণ্যের সৃজনশীল দিক সামলাত। কোন ধরনের সুগন্ধ ভালো হবে, পণ্য দেখতে কেমন হবে—এসব নিয়ে তার ভাবনা ছিল। অন্যদিকে মা-মেয়ে একসঙ্গে নিরাপদ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত উপাদানের তালিকা তৈরি করেন। ফলে ব্যবসাটিতে সৃজনশীলতা ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সমন্বয় ঘটে।
অনলাইন পড়াশোনা ব্যবসায় বাড়তি সুযোগ এনে দেয়
২০২০ সালে পরিবারটি অপেক্ষাকৃত গ্রামীণ এলাকায় চলে যায়। তখন সিডনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সে এবং তার ছোট বোন অড্রে ভর্তি হয় অনলাইনভিত্তিক লরেল স্প্রিংস স্কুলে।
শুরুতে টিফানির কাছে অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল নমনীয়তা। কিন্তু গ্লিমার উইশ বড় হতে থাকলে এই নমনীয়তাই সিডনির ব্যবসায়িক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সিডনি সকালে পড়াশোনা করত এবং দিনের বাকি সময় বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারত। বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়িক বৈঠকসহ নানা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগও পায় সে।
এভাবে একজন স্কুলছাত্রীর জীবন আর একজন উদ্যোক্তার জীবন ধীরে ধীরে একইসঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকে।
বাবাও হয়ে গেলেন মেয়ের প্রতিষ্ঠানের সিইও
২০২১ সালে বায়রন তার আগের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেন। সেটি পরিবারের মূল পরিকল্পনার অংশ ছিল না। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গ্লিমার উইশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
বায়রন তখন নতুন কী করবেন, তা ভাবছিলেন। টিফানি তাকে মেয়ের সঙ্গে কাজ করার কথা বলেন। বায়রন মজা করে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি কি তাহলে চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবসা ছেড়ে ‘জলপরির’ ব্যবসায় চলে যাবেন?
শেষ পর্যন্ত সেটিই বাস্তব হয়।
বর্তমানে বায়রন গ্লিমার উইশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সিডনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করছে। টিফানি দেখছেন সৃজনশীল দিক। আর ছোট বোন অড্রেও পরিবারের এই ব্যবসায় সহযোগিতা করছে।
সিডনি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো সামলানোর ক্ষেত্রেও বায়রনের সিইও হিসেবে থাকা পরিবারের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে।
‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এ স্বপ্নপূরণ
বায়রন ও সিডনি দুজনেই ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’ অনুষ্ঠানের ভক্ত ছিলেন। তাই অনুষ্ঠানে নিজেদের ব্যবসা উপস্থাপন করার সুযোগ পাওয়া ছিল তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
শেষ পর্যন্ত গত গ্রীষ্মে তিনজন—বায়রন, সিডনি ও টিফানি—অনুষ্ঠানটিতে অংশ নেন। টিফানির জন্য অভিজ্ঞতাটি ছিল ভীতিকর। কিন্তু বায়রন ও সিডনির কাছে সেটি ছিল স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
অনুষ্ঠানে গ্লিমার উইশের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেন লরি গ্রেইনার ও কেন্দ্রা স্কট। তারা প্রতিষ্ঠানটির ২০ শতাংশ মালিকানার বিনিময়ে ২ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। পাশাপাশি ওই ২ লাখ ডলার ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত রয়্যালটির ব্যবস্থাও রাখা হয়।
টিফানির কাছে এই বিনিয়োগ শুধু অর্থ পাওয়ার ঘটনা নয়। মেয়ের ব্যবসায় এমন দুই সফল নারী উদ্যোক্তার যুক্ত হওয়াকে তিনি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।
অসুস্থতা থেকে নতুন স্বপ্ন
টিফানির কাছে গ্লিমার উইশের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবার।
লাইম রোগে আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে পরিবারকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। সেই স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রভাবই পরে মেয়ের ব্যবসার ধারণায় এসে পড়ে।
তার কাছে গ্লিমার উইশ সফল হয়েছে তখনই, যখন শিশুরা এমন পণ্য পাচ্ছে যা তাদের আনন্দ দেয় এবং একই সঙ্গে পরিবারের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেয়।
একটি শিশুর ১০ বছর বয়সে করা কল্পনা থেকে শুরু হওয়া ব্যবসা আজ বিনিয়োগ পেয়েছে, টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছে এবং পুরো পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।
সিডনির জন্য এটি শুধু একটি প্রসাধনী ব্র্যান্ড নয়। এটি তার নিজের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। আর তার পরিবারের জন্য এটি প্রমাণ করেছে—কঠিন সময়ের মধ্যেও একসঙ্গে থাকলে নতুন স্বপ্ন তৈরি করা সম্ভব।












