নিউইয়র্কে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন, এমন এক সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কূটনীতিকদের মধ্যে ঐকমত্য দুর্লভ হলেও প্রায় সব নেতাই একমত, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার ভাষণে বলেন, “বিশ্বনেতারা গভীর অনিশ্চয়তার এক যুগে জাতিসংঘে সমবেত হচ্ছেন,” আর ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বদলাতে হবে বলে মন্তব্য করেন। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রবার্ট উড আরও কড়াভাবে বলেন, “জাতিসংঘ এখন সত্যিকারের এক টার্নিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে, গতবারও পরিস্থিতি খারাপ ছিল, এবারও তেমন ভালো নয়।”
অধিবেশনের পটভূমিতে রয়েছে দুটি চলমান বড় যুদ্ধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার চার বছরের অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে জড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, যা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। গত নয় মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মার্কিন-সমর্থিত অপসারণ, ইরানে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন এবং তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার ঘটনাও অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডায় ইবোলার প্রাদুর্ভাব এবং একাধিক মহাদেশে ভূমিকম্প ও বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেও নতুন করে সামনে এনেছে। ইউরোপীয় কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর আঘাত, ব্যর্থ মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা এবং জলবায়ু-শান্তি-নিরাপত্তা প্রশ্নে ঐকমত্যহীনতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে হরমুজ প্রণালীর সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও এআই তদারকির প্রশ্নও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। স্লোভেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিত্রতার পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও জাতীয় স্বার্থের ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়ে “স্থায়ী সংঘাত নয়, শান্তির” পক্ষে কথা বলেন।
বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশের জন্য এই অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জলবায়ু অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়ে জাতিসংঘের মনোযোগ ও সম্পদ বণ্টন মূলত এই অধিবেশনেই নির্ধারিত হয়। বৈশ্বিক সংকটের এই জট যত ঘনীভূত হচ্ছে, ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর কণ্ঠস্বর ঢাকা পড়ার শঙ্কাও তত বাড়ছে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন তাই কেবল বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটির প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণের একটি কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভাজন এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে রাশিয়া ও পশ্চিমা শক্তির অবস্থান এতটাই বিপরীতমুখী যে যৌথ কোনো প্রস্তাব পাসের সম্ভাবনা এবারও ক্ষীণ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলো জোট বেঁধে সংস্কারের দাবি তুলতে পারে কিনা, সেদিকেই এখন নজর কূটনৈতিক মহলের। এবারের জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন তাই বিশ্লেষকদের চোখে বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।












