কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি ডলি পার্টন শুধু গান দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেননি, নিজের জীবন, রসবোধ, উদারতা এবং মানুষের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজুড়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক। ৮০ বছর বয়সে ২৫ আগস্ট ন্যাশভিলে মারা যাওয়া এই শিল্পী রেখে গেছেন ঝলমলে পোশাক, উজ্জ্বল মঞ্চসজ্জা আর অসংখ্য জনপ্রিয় গানের পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করার এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার।
তার ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন অনেকটা ‘সেন্ট ডলি’—এমন এক আমেরিকান সাংস্কৃতিক অভিভাবক, যিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্ট, প্রেম, বিচ্ছেদ ও সংগ্রামকে গানে রূপ দিয়েছেন। কঠিন বাস্তবতাকে তিনি প্রায়ই উপস্থাপন করেছেন সুন্দর, সহজ এবং শ্রুতিমধুর আবরণের মধ্যে। সংগীত সাংবাদিক রবার্ট ওরম্যান একসময় তাকে ‘আমাদের সময়ের মোৎসার্ট’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে ডলির বাহ্যিক উপস্থিতিও ছিল তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাথাভর্তি বিশাল চুল, ঝলমলে পোশাক, রাইনস্টোন, উজ্জ্বল মেকআপ এবং নিজের চেহারা নিয়ে খোলামেলা রসিকতা—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক নিজস্ব অবয়ব তৈরি করেছিলেন, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সেই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে ছিল অসাধারণ দৃঢ়তা ও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার মানসিকতা।
২০১৬ সালের অক্টোবরে ‘পিওর অ্যান্ড সিম্পল’ সফরের সময় ডলির একটি অনুষ্ঠান দেখেছিলেন লেখক শিমা ওলিয়ি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল তীব্র বিভাজনে ভরা। কিন্তু ডলির অনুষ্ঠানে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ একই সঙ্গে গান গেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা ওলিয়ির কাছে ডলির জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণকে স্পষ্ট করে দেয়—তিনি মানুষকে বিভক্ত করার চেয়ে একত্রিত করার জায়গাটি খুঁজে নিতে পারতেন।
ডলিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘ডলি পার্টনস আমেরিকা’ বলতে তিনি কী বোঝেন, তার উত্তর ছিল আরও বিস্তৃত। তার দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেটি ‘ডলি পার্টনস ওয়ার্ল্ড’। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, একটু বেশি চেষ্টা করা, আরও দয়ালু হওয়া এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা বাড়ানোর কথাই তিনি বলেছিলেন।
তার শেষ দিকের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ভবিষ্যতে একটি হাসির অ্যালবাম করার পরিকল্পনা ছিল তার। একই সঙ্গে বহু আশাবাদী গান তিনি রেকর্ড করে রেখে দিয়েছিলেন, যেগুলো মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ করা যাবে। অর্থাৎ নিজের মৃত্যুর পরও মানুষের কাছে নতুন গান ও আশার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
দারিদ্র্যের ঘর থেকে মঞ্চের আলোয়
ডলি রেবেকা পার্টনের জন্ম ১৯ জানুয়ারি ১৯৪৬ সালে টেনেসির নক্সভিলের বাইরে গ্রেট স্মোকি মাউন্টেনস অঞ্চলের একটি ছোট, অতি সাধারণ কেবিনে। ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল না ঘরের ভেতর পানির ব্যবস্থাও। তার জন্মের সময় চিকিৎসককে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল ভুট্টার আটার একটি বস্তা।
১২ ভাইবোনের মধ্যে ডলি ছিলেন চতুর্থ। ছোটবেলায় ভাইবোনদের তিন-চারজন করে একই বিছানায় ঘুমাতে হতো। পরিবারের একমাত্র আধুনিক সুবিধা ছিল ব্যাটারিচালিত একটি রেডিও।
চারপাশের পাহাড়, পাইনগাছ, ঝরনা, প্রজাপতি আর সবুজ শ্যাওলায় ঘেরা সেই পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা। বাবা কৃষিকাজ করতেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। আর মা সন্তানদের শোনাতেন আইরিশ ও ওয়েলশ লোকগান। সংগীতের প্রথম বীজ সেখানেই বোনা হয়।
একসময় তামাকের কাঠি ও টিনের কৌটা দিয়ে নিজের জন্য একটি কৃত্রিম মাইক্রোফোন বানিয়ে অনুষ্ঠান করেছিলেন ছোট্ট ডলি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তিনি প্রথম গান লেখেন—‘লিটল টিনি ট্যাসেলটপ’, একটি ভুট্টার মোচার পুতুলকে নিয়ে লেখা গান।
আট বছর বয়সে তার মামা বিল ওউয়েন্স তাকে গিটার শেখাতে শুরু করেন। দুজন একসঙ্গে পূর্ব টেনেসিয়ার বিভিন্ন সুপারমার্কেট উদ্বোধন, মেলা, সমাবেশ ও প্রতিভা প্রতিযোগিতায় গান করতেন।
১০ বছর বয়সে স্থানীয় রেডিও-টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান করার সুযোগ পান ডলি। ১১ বছর বয়সে ‘পাপি লাভ’ নামে তার প্রথম রেকর্ড করা গান রেডিওতে প্রচারিত হয়। ১৩ বছর বয়সে তিনি কিংবদন্তি জনি ক্যাশকে জানিয়েছিলেন, তার স্বপ্ন গ্র্যান্ড ওলে অপ্রিতে গান করা।
১৯৫৯ সালে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। এক প্রবীণ শিল্পী এক শনিবার রাতে নিজের জায়গা ছেড়ে দিলে ডলি মাত্র ১৩ বছর বয়সে গ্র্যান্ড ওলে অপ্রির মঞ্চে ওঠেন। জনি ক্যাশ প্রায় দুই হাজার দর্শকের সামনে তাকে ‘পূর্ব টেনেসিয়ার পাহাড় থেকে আসা ছোট্ট মেয়ে’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। সেদিন দর্শকদের কাছ থেকে তিনি তিনবার অতিরিক্ত গান গাওয়ার অনুরোধ পান।
উচ্চবিদ্যালয় শেষ করার পরদিনই ডলি গ্রেহাউন্ড বাসে ১৮০ মাইল পাড়ি দিয়ে ন্যাশভিলে চলে যান। সেখানে শুরুর দিনগুলো ছিল কঠিন। কয়েক সপ্তাহ তাকে কেচাপ ও সরিষা দিয়ে তৈরি স্যুপ এবং হোটেলের করিডোরে পড়ে থাকা খাবার দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল।
কিন্তু সেই সংগ্রাম বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯ বছর বয়সে তিনি রেকর্ড চুক্তি পান। এর কিছুদিন পর বিয়ে করেন কার্ল ডিনকে। তাদের পরিচয় হয়েছিল একটি লন্ড্রিতে। ২০২৫ সালে ডিনের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়।
রেকর্ড কোম্পানি তাকে পুরুষ শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে বিয়ে কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু ডলি নিজের সিদ্ধান্তেই বিয়ে করেন।
‘ডাম্ব ব্লন্ড’ থেকে ‘জোলিন’
১৯৬৬ সালে ‘ডাম্ব ব্লন্ড’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার পর ডলির দিকে নজর পড়ে দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় কান্ট্রি সংগীত টেলিভিশন অনুষ্ঠানের তারকা পোর্টার ওয়াগনারের। তিনি নতুন এক নারী শিল্পী খুঁজছিলেন।
ডলি ও ওয়াগনারের পেশাগত সম্পর্ক শুরু থেকেই ছিল টানাপোড়েনে ভরা। প্রথম অনুষ্ঠানে ওয়াগনার গান শেষ করার আগেই লাজুক ডলিকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের সম্পর্কের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, সহযোগিতা এবং সৃজনশীল প্রতিযোগিতা একের পর এক সফল গান তৈরি করে।
ওয়াগনার ডলিকে আরও দক্ষ মঞ্চশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। আর ডলি তাকে গান লেখার ক্ষেত্রেও নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেন। একই সঙ্গে নিজের রসবোধকে আত্মরক্ষার এক ধরনের অস্ত্র হিসেবে আরও ধারালো করে তোলেন ডলি।
ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে অনেকে ‘মিনি মাউসের কণ্ঠের বোকাসোকা মেয়ে’ হিসেবে উপহাস করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার গায়কী ও শিল্পীসত্তার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালে ‘দ্য মিউল স্কিনার ব্লুজ’ রেকর্ড করার সময় ডলি প্রথম নোটটি এত দীর্ঘ করে গেয়েছিলেন যে ব্যান্ডকে তার কণ্ঠের সংকেতের অপেক্ষা করে বাজানো শুরু করতে হয়েছিল। গানটি তাকে প্রথম একক গ্র্যামি মনোনয়ন এনে দেয়। পুরো ক্যারিয়ারে তিনি ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার পান।
ওয়াগনারের সঙ্গে কাজ করার সময়ই তিনি লেখেন তার বহু বিখ্যাত গান, যার মধ্যে রয়েছে ‘কোট অব মেনি কালার্স’ এবং ‘জোলিন’।
ওয়াগনারের অনুষ্ঠান ছেড়ে নিজের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ওয়াগনার তার বিরুদ্ধে ৩০ লাখ ডলারের মামলা করেন। সেই সম্পর্কের সমাপ্তির আবেগকে ডলি রূপ দেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানে। একই সঙ্গে ওয়াগনারের সঙ্গে আইনি বিরোধের নিষ্পত্তিতে তাকে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়।
গানটি পরে এলভিস প্রিসলির গাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এলভিসের ব্যবস্থাপক গানটির প্রকাশস্বত্বের অর্ধেক দাবি করলে ডলি তা দিতে অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেছিলেন, এলভিস গানটি গাইবেন শুনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেও সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর সারা রাত কেঁদেছিলেন।
তার বাবা কৃষক ছিলেন। ডলির কাছে গানও ছিল ফসলের মতো—নিজের ফসলের মালিকানা না থাকলে পরিবার কীভাবে বাঁচবে, সেই বাস্তব শিক্ষা তিনি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।
সংগীতের বাইরে সমাজের গল্প
ডলির জীবন যেন মার্কিন সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার আইনি পরিবর্তনের সময় তিনি পেশাজীবনে প্রবেশ করেন। পরে পোর্টার ওয়াগনারের সঙ্গে সৃজনশীল অংশীদারিত্ব থেকে বেরিয়ে নিজের পথ তৈরি করেন এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও বড় পরিবর্তন ঘটছিল।
১৯৮০ সালের ‘নাইন টু ফাইভ’ চলচ্চিত্রে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে অভিনয় করেন ডলি। বাস্তব জীবনের নারী কর্মীদের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শিরোনাম গানটিও লেখেন। গান ও চলচ্চিত্র—দুটিই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।
ডলি সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে যখন ‘পারিবারিক মূল্যবোধ’ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা জোরালো হচ্ছিল, তখন নিজের কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে।
তার সংগীতও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। হৃদয়ভাঙা গান থেকে তিনি নারীশক্তির গান, আবার সেখান থেকে আধ্যাত্মিক সংগীতেও গিয়েছেন। ‘লাইট অব আ ক্লিয়ার ব্লু মর্নিং’ কিংবা ‘দ্য সিকার’-এর মতো গান তার শিল্পীসত্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন, পারিবারিক সমস্যা এবং চলচ্চিত্রে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার পর বিষণ্নতার কথা প্রকাশ্যে বলেন তিনি। একই সময়ে নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে। অস্ত্রোপচারও হয়েছিল।
এই কঠিন সময়কে তিনি গানে তুলে ধরেন। পরে নিজের ব্যান্ড ছোট করেন, নিজস্ব রেকর্ড লেবেল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ডলিউড নামে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলেন। সংকটের মধ্যেও নতুন করে নিজের ক্যারিয়ার সাজিয়ে নেন তিনি।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা
ডলি পার্টন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট দলীয় পরিচয়ে আটকে রাখতে চাননি। তার ভাতিজা ও দেহরক্ষী ব্রায়ান সিভার তার রাজনীতির এই ধরনকে মজা করে ‘ডলিটিক্স’ বলেছিলেন।
ডলি নিজেই একবার বলেছিলেন, তার বাবা ছিলেন রিপাবলিকান আর মা ডেমোক্র্যাট—তাই তিনি নিজেকে মজা করে ‘হাইপোক্র্যাট’ বলতেন।
২০১৭ সালে ৬৯তম এমি অ্যাওয়ার্ডসে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে ‘নাইন টু ফাইভ’ পুনর্মিলনীতে মঞ্চে ওঠেন তিনি। সেখানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে দুই সহশিল্পীর রাজনৈতিক রসিকতায় তিনি যোগ দেননি। বরং নিজের পরিচিত রসিকতার ভঙ্গিতে পরিস্থিতি সামলান।
তবে দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি অবস্থান না নিলেও তার গানে সামাজিক বাস্তবতা বারবার ফিরে এসেছে।
তিনি নির্বাসিত বা বিতাড়িত মানুষ বহনকারী একটি বিমান দুর্ঘটনার করুণ সত্য ঘটনা নিয়ে গান করেছেন। কয়লাখনি শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি এবং শ্রমিকদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও গান লিখেছেন। আবার যৌনপেশায় বাধ্য হওয়া এক মেয়ের গল্পও তার গানে উঠে এসেছে।
২০০৫ সালের ‘ট্রান্সআমেরিকা’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘ট্রাভেলিন থ্রু’ গান দেওয়ার পর তিনি মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছিলেন। সমকামী ভক্তদের প্রতি সমর্থনের জন্যও তাকে হুমকির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এসবের মধ্যেও তিনি এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে গেছেন।
তিনি নিজেকে রসিকতার ছলে ‘ড্র্যাগ কুইনদের পৃষ্ঠপোষক’ বলতেন। একবার একটি ড্র্যাগ কুইন প্রতিযোগিতায় উপস্থিত হয়ে নিজের আদলে সাজা প্রতিযোগিতাতেও অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত ডলি সেজে থাকা একজন পুরুষ প্রতিযোগীর কাছে সেই প্রতিযোগিতায় হেরে যান।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার
ডলি নিজেকে কখনো সহজে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাননি। এমনকি নিজেকে প্রকাশ্যে নারীবাদী বলার ক্ষেত্রেও তিনি সতর্ক ছিলেন। তার যুক্তি ছিল—তিনি মূলত কোনো ধরনের লেবেলই পছন্দ করেন না।
মানুষকে তাদের পরিচয় বা মতের ভিত্তিতে আলাদা না করে গ্রহণ করার প্রবণতার কারণে তিনি ‘দ্য গ্রেট ইউনিফায়ার’ নামেও পরিচিত হন।
তার ধর্মীয় বিশ্বাসও ছিল ব্যক্তিগত ও কর্মমুখী। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শুধু আমার বিশ্বাস পালন করি না; আমি তা জীবনেও ধারণ করি।’
ন্যাশভিল থেকে স্মোকি মাউন্টেনসে ফিরে গিয়ে তিনি কখনো উপবাস করতেন, প্রার্থনা করতেন এবং নতুন গান নিয়ে ভাবতেন। রাত তিনটার সময় গান পাওয়ার জন্য করা প্রার্থনা একসময় বদলে যায়—তিনি এমন আশা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা তার মৃত্যুর পরও মানুষের কাজে লাগবে।
তার বাবার পড়তে বা লিখতে না পারার অভিজ্ঞতা ডলির মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাই শিক্ষাকে তিনি নিজের জনকল্যাণমূলক কাজের অন্যতম কেন্দ্র বানান।
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ১৫ হাজার ডলারের বৃত্তি দিয়েছেন তিনি। নিজের এলাকার মধ্যবিদ্যালয় পর্যায়ের শিশুদের পড়াশোনার হার বাড়াতে স্নাতক হওয়ার সময় প্রত্যেক শিশুকে ৫০০ ডলার দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালে তিনি শুরু করেন ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বই দেওয়ার এই কর্মসূচির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩০ কোটিরও বেশি বই বিতরণ করা হয়েছে।
হুইটনি হিউস্টনের ১৯৯২ সালের ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ সংস্করণ থেকে অর্জিত বিপুল অর্থের একটি অংশ তিনি টেনেসির কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটি এলাকায় বিনিয়োগ করেন।
২০১৬ সালে গ্যাটলিনবার্গে ভয়াবহ দাবানলের পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তিনি কোটি কোটি ডলার সংগ্রহ করেন। ২০২৪ সালে হারিকেন হেলেনের ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায়ও বড় অঙ্কের অর্থ দেন। কোভিড-১৯-এর টিকা উদ্ভাবনের গবেষণায় ১০ লাখ ডলার দেন এবং ডলিউডের কর্মীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ কলেজ বৃত্তির ব্যবস্থাও করেন।
পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল মানুষের ভালোবাসা
২০০১ সালে গান লেখকদের হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন ডলি। ২০০৫ সালে পান ন্যাশনাল মেডেল অব আর্টস। ২০০৯ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট পান। ২০১১ সালে পান গ্র্যামি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। ২০২৫ সালে তাকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক অস্কার।
পুরস্কারের এই দীর্ঘ তালিকা তার শিল্পীজীবনের ব্যাপ্তি বোঝায়। কিন্তু তার উত্তরাধিকার শুধু পুরস্কারে আটকে নেই। বরং অচেনা-অজানা মানুষের জন্য কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাসই তাকে আলাদা করে তুলেছে।
ডলি একবার বলেছিলেন, তিনি মানুষকে ভালোবাসেন। দর্শকদের দিকে তাকালে তাদের নিজের পরিবারের মতো মনে হয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই তিনি ভালোত্ব ও আলো দেখতে পান—এমনকি সেই মানুষটি নিজে তা দেখতে না পেলেও।
সম্ভবত এ কারণেই ‘জোলিন’ গানটি বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পীর কাছে বারবার ফিরে এসেছে। গানটির ৪০০টিরও বেশি সংস্করণ হয়েছে। লেখকের বাবা ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইরানে লায়লা ফোরুহারের কণ্ঠে গানটি শুনেছিলেন। এমনকি নেলসন ম্যান্ডেলাও রবেন দ্বীপে কারাগারে থাকার সময় প্রহরীদের দিয়ে ডলির গান লাউডস্পিকারে বাজানোর অনুরোধ করেছিলেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডলির জীবনকে রূপকথার মতো মনে হতে পারে। পাহাড়ের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান থেকে বিশ্বখ্যাত শিল্পী, গীতিকার, অভিনেত্রী, উদ্যোক্তা ও জনকল্যাণকর্মী হয়ে ওঠার গল্প নিঃসন্দেহে অসাধারণ।
কিন্তু তার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত সাফল্য অর্জনের চেয়েও অন্য কিছু। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, অন্যের জন্য কিছু করার ইচ্ছা এবং নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে যাওয়ার মধ্যেই তিনি জীবনের অর্থ খুঁজেছিলেন।
যে নারীকে একসময় তার চেহারা, চুল, পোশাক ও শরীর নিয়ে উপহাস করা হয়েছে, সেই নারীই শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয়ের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে কোটি মানুষের কাছে আশার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তার নিজের ভাষায়, তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। আর সেই ভালোবাসাকে শুধু কথায় রাখেননি—গান, শিক্ষা, বই, অর্থ, কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
ডলি পার্টনের জীবন তাই শুধু একজন সংগীতশিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের শৈশবের দারিদ্র্য ভুলে যাননি, খ্যাতির শিখরে উঠেও সাধারণ মানুষের গল্প বলতে থেকেছেন এবং নিজের জন্য অর্জিত সম্পদের একটি বড় অংশ অন্যদের জীবন বদলাতে ব্যবহার করেছেন।
রাইনস্টোনের ঝলক, বিশাল চুল আর মঞ্চের হাসির আড়ালে যে মানুষটি ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো সেটিই—তিনি মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চেয়েছিলেন। আর সেই কাজের উত্তরাধিকারই তার মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকবে।












