একটি পোষ্যকে দত্তক নেওয়ার দিনটি সাধারণত আনন্দের ছবি আর নতুন পরিবারের সদস্যকে ঘিরে শুভেচ্ছায় ভরে ওঠে। কিন্তু প্রকৃত গল্প শুরু হয় তার পর থেকে—নতুন বাড়িতে প্রথম রাত, প্রথম হাঁটাহাঁটি, প্রথম খেলাধুলা কিংবা প্রথমবার মানুষের কোলে নিশ্চিন্তে মাথা রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণীকল্যাণ সংগঠন বেস্ট ফ্রেন্ডস অ্যানিমেল সোসাইটির কাছে দত্তক নেওয়া পোষ্যদের পরিবারগুলো নিয়মিত তাদের এমন অভিজ্ঞতা শেয়ার করে। এসব গল্প শুধু আনন্দের নয়, আশ্রয়কেন্দ্রের প্রাণীদের দত্তক নেওয়ার গুরুত্বও তুলে ধরে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এমন কয়েকটি গল্পে উঠে এসেছে একটি কুকুর, দুটি বিড়াল এবং একটি নাচতে ভালোবাসা পাখির নতুন জীবনের কথা। প্রত্যেকটির গল্পই আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় মিল রয়েছে—নতুন পরিবার পাওয়ার পর তাদের জীবন আরও আনন্দময় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
ডিউনের নতুন জীবন
কেনেথ ও ক্রিসের পরিবারে আসার পর ডিউন নামের কুকুরটি ধীরে ধীরে নিজের স্বভাব খুলে ধরেছে। শুরুতে কিছুটা ভীতু থাকলেও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যক্তিত্বের নানা দিক প্রকাশ পেতে থাকে।
তার নতুন পরিবার জানায়, ডিউন একই সঙ্গে মিষ্টি, বুদ্ধিমান, দুষ্টু, হাসিখুশি, স্নেহশীল ও অত্যন্ত আদুরে। উত্তর সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার নতুন বাড়িটিও যেন তার পছন্দ হয়ে গেছে। কাছের হ্রদ ও পাহাড়ে হাঁটতে যাওয়া তার অন্যতম প্রিয় কাজ।
বনের পথ ধরে হাঁটার সময় সে চারপাশের গন্ধ ও প্রকৃতি উপভোগ করে। স্থানীয় মানুষ ও অন্য কুকুরদের মধ্যেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ডিউন। বিশেষ করে অন্য কুকুরের সঙ্গে খেলতে সে খুবই পছন্দ করে।
ডগ পার্কে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, কুস্তি আর পেছনে ছুটে খেলা তার নিয়মিত আনন্দের অংশ। তার নতুন পরিবার অবাক হয়ে দেখছে, সে কত দ্রুত দৌড়াতে পারে, মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং বেশ উঁচুতেও লাফ দিতে পারে।
পরিবারটির কাছে ডিউন এখন শুধু একটি পোষ্য নয়; সে তাদের জীবনের আনন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিউনকে পেয়ে তারা ভবিষ্যতে আরও অনেক সুন্দর বছর একসঙ্গে কাটানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
মোজ ও ফক্সের অভিযান
আলি ও জ্যাক্সের পরিবারে জায়গা করে নিয়েছে দুই বিড়াল—মোজ ও ফক্স। তাদের জন্য পোষ্য পালন মানেই ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং নতুন নতুন জায়গা ঘুরে দেখা এবং পরিবারের সঙ্গে নানা অভিযানে অংশ নেওয়া।
মোজকে শুরুতে ব্যাকপ্যাকে করে হাঁটতে নিয়ে যাওয়া হতো। পরে সে ধীরে ধীরে হাঁটার জন্য দড়ি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। পরিবারের সঙ্গে বাইরে সময় কাটানো তার খুব পছন্দ। এমনকি দড়ির দোলনায় বসে বাইরের পরিবেশ উপভোগ করতেও সে ভালোবাসে।
পরিবারে পরে যুক্ত হয় ফক্স। আকারে ছোট হওয়ায় এখনো তাকে দড়িতে হাঁটানো সম্ভব নয়। তবে ব্যাকপ্যাকে করে সে পরিবারের সঙ্গে হাঁটতে বের হয়।
আলি ও জ্যাক্সের পরিকল্পনা এখন আরও বড়। ভবিষ্যতে মোজ ও ফক্সকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার এবং আরও দীর্ঘ অভিযানে বের হওয়ার ইচ্ছা তাদের। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যেকোনো কাজে যোগ দেওয়ার জন্য দুই বিড়ালই যেন সবসময় প্রস্তুত।
তাদের ভাষায়, মোজ ও ফক্স তাদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। দুই বিড়ালকে তারা নিজেদের জীবনের বিশেষ আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন।
বিউর নতুন ঘর
মেরির পরিবারে নতুন সদস্য হয়ে এসেছে বিউ। বাড়ি ফেরার পথেই সে ভালো আচরণ করেছিল। নতুন পরিবেশে তার স্বাচ্ছন্দ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
মেরি জানান, বিউ খুবই মিষ্টি স্বভাবের। এমনকি তাকে আদর করার সুযোগও মিলেছে—যদিও তা ছিল অল্প সময়ের জন্য। তবু সেই ছোট্ট মুহূর্তটিও তার কাছে ছিল আনন্দের।
বাড়িতে বিউর জন্য টেলিভিশনে ‘রিও’ ও ‘রিও ২’ চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মনে হয়েছে, সে টেলিভিশন দেখতে পছন্দ করছে। একপর্যায়ে তাকে নাচতেও দেখা যায়।
নতুন বাড়িতে বিউ বেশ আনন্দেই আছে বলে মনে করছেন মেরি। এখন তার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
দত্তক নেওয়ার পরের গল্পও গুরুত্বপূর্ণ
বেস্ট ফ্রেন্ডস অ্যানিমেল সোসাইটির মতে, একটি প্রাণীকে দত্তক নেওয়ার দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার পরের দিনগুলোও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন পরিবারে একটি পোষ্যের মানিয়ে নেওয়া, তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং মানুষের সঙ্গে বন্ধন তৈরি হওয়ার গল্প অন্যদেরও দত্তক নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারে।
প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কুকুর বা বিড়াল দত্তক নেওয়া শুধু একটি পরিবারে নতুন সদস্য যোগ করা নয়; একই সঙ্গে একটি প্রাণীকে নিরাপদ ও ভালোবাসাপূর্ণ জীবন দেওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে এমন একটি ব্যবস্থার দিকে নিতে চায়, যেখানে নিরাপত্তা ও প্রাণীর জীবনমান বিবেচনায় বাঁচানো সম্ভব এমন প্রতিটি কুকুর ও বিড়ালকে বাঁচানো যায়। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মীদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও প্রয়োজন।
একটি প্রাণীকে সাময়িকভাবে লালন-পালনের দায়িত্ব নেওয়া, দত্তক নেওয়া কিংবা প্রাণীদের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করা—সবই এ প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
একটি প্রাণীকে কয়েক দিনের জন্য আশ্রয় দেওয়াও তার জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আর স্থায়ীভাবে দত্তক নেওয়া তাকে দিতে পারে এমন একটি ঘর, যেখানে সে নিরাপদে বেড়ে উঠবে, ভালোবাসা পাবে এবং নতুন পরিবারের সঙ্গে নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করবে।
ডিউন, মোজ, ফক্স ও বিউর গল্প তাই শুধু চারটি পোষ্যের নতুন জীবনের গল্প নয়। এগুলো দেখায়, একটি প্রাণীকে ঘর দেওয়া যেমন তার জীবন বদলে দিতে পারে, তেমনি সেই প্রাণীও একটি পরিবারের জীবনকে নতুন আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে।












