রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম জ্বালানি পরিবহনে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছে ইসলামাবাদ। বিষয়টিকে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে ‘কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত’ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে জানিয়েছে ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন।
ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে পাকিস্তান হাইকমিশন এ ব্যাখ্যা দেয়।
হাইকমিশন জানিয়েছে, কূটনৈতিক ফ্লাইট ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতির আবেদন নির্ধারিত নিয়ম এবং বেসামরিক বিমান চলাচল-সংক্রান্ত প্রোটোকল অনুযায়ী প্রক্রিয়া করা হয়। রূপপুরের জ্বালানি বহনকারী ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।

পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচিত ঘটনাটি মূলত ফ্লাইটের রুট নির্ধারণ এবং আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থাপনার বিষয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এর ফলে কখনো কখনো নির্ধারিত ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন করতেও হতে পারে।
পাকিস্তান হাইকমিশন আরও বলেছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই ঘটনাটিকে যথাযথ কারিগরি প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত। এমন কোনো প্রতিবেদন বা বক্তব্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে পাঠানো ইউরেনিয়াম জ্বালানি ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এএনআইকে জানিয়েছিলেন, রূপপুরের জন্য ইউরেনিয়াম বহনকারী একটি কার্গো বিমান ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তান কেন অনুমতি দেয়নি, সে বিষয়ে তখন বাংলাদেশ সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না।
মন্ত্রী আরও জানান, রাশিয়া নতুন করে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইউরেনিয়াম জ্বালানি পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় জানিয়েছে।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তার ভাষ্য, জ্বালানি গ্রহণের জন্য বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের একজন লিয়াজোঁ কর্মকর্তা তাদের জানান, নির্ধারিত রুটের আকাশসীমা পরিষ্কার নয়। ফলে চালানটি পাঠানো সম্ভব হয়নি এবং নতুন করে সময় নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে।

রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পদ্মা নদীর তীরে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং রোসাটম এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
রূপপুর প্রকল্পে তৃতীয় প্রজন্মের দুটি ভিভিইআর-১২০০ পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হচ্ছে। দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম চালান বাংলাদেশে আসে। রোসাটমের নভোসিবির্স্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্টে তৈরি ১৬৪টি নতুন ফুয়েল অ্যাসেম্বলি নিয়ে একটি রুশ কার্গো বিমান সরাসরি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
পরে বিশেষ বিকিরণ-নিরাপদ কনটেইনারে করে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এসব পারমাণবিক জ্বালানি পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় নির্ধারিত ‘গ্রিন করিডোর’ ব্যবহার করে চালানটি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানো হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি হস্তান্তর শুরু হয়।
এবার দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য জ্বালানি পরিবহনে সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ায় নতুন করে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ বিলম্বকে তারা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি-সংক্রান্ত কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত করছে।












