ওয়ার্নার ব্রস. ডিসকভারি ও প্যারামাউন্টের একীভবনের পর হলিউডে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে স্কাইড্যান্স। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পরিবারের উত্তরসূরি ডেভিড এলিসনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বিশাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন একসঙ্গে একাধিক কঠিন সিদ্ধান্ত। সংবাদ, চলচ্চিত্র, স্ট্রিমিং, টেলিভিশন, খেলাধুলা এবং বিপুল ঋণের চাপ—সবকিছু সামলে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিতে হবে তাকে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে সিএনএন। সংবাদমাধ্যমটি লাভজনক হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার অন্যতম লক্ষ্য এটি। চলতি বছর সিএনএনের নিট মুনাফা প্রায় ৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু দর্শকসংখ্যার দিক থেকে এটি এমএস নাউয়ের পেছনে পড়ে গেছে, আর ডিজিটাল ব্যবসাও এখনো তুলনামূলক প্রাথমিক পর্যায়ে। ফক্স নিউজ এ দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে রয়েছে।
ডেভিড এলিসন সিএনএনের বর্তমান প্রধান মার্ক থম্পসনকে দায়িত্বে রাখার বিষয়ে সমঝোতা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আপাতত সিএনএনকে বারি ওয়েইসের আওতার বাইরে রেখেছেন। ওয়েইসকে সিবিএস নিউজের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই কাঠামো বদলাতে পারে।

সিএনএনের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সংবাদ সেবা। থম্পসনের উদ্যোগে চালু হওয়া এই পরিষেবা যুক্তরাজ্য ও কানাডায় সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে কতজন অর্থপ্রদানকারী গ্রাহক রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। স্কাইড্যান্স চাইলে এই মডেলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। আবার আগের ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগটি বন্ধও করে দিতে পারে।
একীভবনের অংশ হিসেবে একটি স্বাধীন সম্পাদকীয় তদারকি বোর্ড গঠনের কথাও রয়েছে। তবে সেই বোর্ডে কারা থাকবেন, তা এখনো প্রকাশ করেনি স্কাইড্যান্স। গণমাধ্যম ব্যবসায় সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সীমারেখা কতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা যাবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলচ্চিত্রে সংখ্যা বাড়ানোর চাপ
চলচ্চিত্র ব্যবসায় ডেভিড এলিসনের সামনে আরও জটিল সমীকরণ। সাধারণত দুটি স্টুডিও একীভূত হলে নির্বাহী কাঠামো ছোট হয়, বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থা এক করা হয় এবং চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। কিন্তু স্কাইড্যান্সকে অন্তত বছরে ৩০টি চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। দুই বছর পর সেই সংখ্যা বেড়ে ৩২টিতে দাঁড়াবে।
সমস্যা হলো, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্নার ব্রস. ও প্যারামাউন্ট—দুটি স্টুডিও মিলে প্রায় ২৬টি চলচ্চিত্র মুক্তির পথে রয়েছে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে হবে। প্রতিশ্রুতির চেয়ে একটি চলচ্চিত্র কম মুক্তি পেলেও ৩ কোটি ডলার জরিমানা দিতে হতে পারে।
চলচ্চিত্র নির্মাণে সময়ও বড় বিষয়। একটি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছাতে সাধারণত দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়। এরই মধ্যে ‘দ্য ব্যাটম্যান পার্ট টু’ ও ‘গ্রেমলিনস ৩’-এর মুক্তি ২০২৭ থেকে পিছিয়ে ২০২৮ করা হয়েছে। ফলে একদিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক সিনেমা মুক্তির চাপ, অন্যদিকে মান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে নতুন ব্যবস্থাপনাকে।
স্কাইড্যান্সের হাতে অবশ্য জনপ্রিয় চরিত্র ও ফ্র্যাঞ্চাইজির বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, হ্যারি পটার, টিনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস, গেম অব থ্রোনস, দ্য লর্ড অব দ্য রিংস, মিশন: ইমপসিবল, টপ গান, স্টার ট্রেক, ট্রান্সফরমার্স ও স্পঞ্জবব স্কয়ারপ্যান্টস—সবই এখন একই করপোরেট ছাতার নিচে।
কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিও নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। বড় বাজেটের চলচ্চিত্রগুলো একই প্রতিষ্ঠানের অর্থ, বিপণন সুবিধা ও গুরুত্বপূর্ণ মুক্তির তারিখের জন্য নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে একীভূত প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী পর্যায়েও ইতোমধ্যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ওয়ার্নার ব্রস. মোশন পিকচার গ্রুপের সহ-প্রধান প্যাম অ্যাবডি ও মাইকেল ডি লুকার দায়িত্ব শেষ হয়েছে। এখন প্যারামাউন্টের ডানা গোল্ডবার্গ ও জশ গ্রিনস্টেইন দুই স্টুডিওর দায়িত্ব সামলাবেন। কর্মীসংখ্যা কমানোর চাপও সামনে আরও বাড়তে পারে।
স্ট্রিমিংয়ে বড় পরীক্ষার মুখে স্কাইড্যান্স

স্ট্রিমিং ব্যবসায় স্কাইড্যান্সের সামনে সুযোগ যেমন বিশাল, ঝুঁকিও তেমন। কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে আসছে প্যারামাউন্ট+, এইচবিও ম্যাক্স, প্লুটো ও ডিসকভারি+। এই বিশাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে কীভাবে একসঙ্গে সাজানো হবে, সেটিই হবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
এইচবিও ম্যাক্সের স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। স্ট্রিমিং বিভাগের শীর্ষ দায়িত্বে থাকবেন কেসি ব্লয়স। তার হাতে এখন এইচবিওর পাশাপাশি প্যারামাউন্টের জনপ্রিয় কনটেন্টও চলে আসবে।
প্যারামাউন্ট+–এর জনপ্রিয় সিরিজগুলোর মধ্যে রয়েছে টেলর শেরিডানের বিভিন্ন সিরিজ এবং ‘স্টার ট্রেক’ ফ্র্যাঞ্চাইজি। ভবিষ্যতে এসব কনটেন্টকে এইচবিও ম্যাক্সের কনটেন্টের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে।
প্রাথমিকভাবে এইচবিও ম্যাক্স ও প্যারামাউন্ট+কে এক প্ল্যাটফর্মে পুরোপুরি একীভূত করার বদলে বান্ডেল হিসেবে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এর আগে এইচবিও ম্যাক্সের সঙ্গে ডিসকভারি+ একীভূত করে তৈরি করা মডেল প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। পরে আবার প্ল্যাটফর্মটির নাম এইচবিও ম্যাক্স করা হয় এবং ডিসকভারির আনস্ক্রিপ্টেড কনটেন্টের ওপর জোর কমানো হয়।
নতুন ব্যবস্থাপনার যুক্তি হলো, গ্রাহকদের এমন কনটেন্ট দিতে হবে যা তারা দেখতে চান—শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বলে সবকিছু একসঙ্গে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
ঋণের পাহাড় সবচেয়ে বড় চাপ
ওয়ার্নার ব্রস. ডিসকভারি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে এলিসনের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। নেটফ্লিক্সকে পেছনে ফেলতে একাধিক দফায় প্রস্তাব বাড়ানোর পর চূড়ান্ত মূল্য দাঁড়ায় ১১১ বিলিয়ন ডলারে।
এর সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৮২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। আগামী তিন বছরে ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এলিসন। এর ফলে প্রায় ৫০ হাজার কর্মীর সম্মিলিত কর্মীবাহিনী থেকে বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ঋণের সুদ ও অন্যান্য আর্থিক দায় মেটাতেই বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। ফলে নতুন অধিগ্রহণ বা বড় বিনিয়োগের জন্য হাতে থাকা অর্থের ওপর চাপ বাড়বে।
অন্যদিকে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত টেলিভিশন ব্যবসা এখনো বড় আয়ের উৎস হলেও পুরো খাতটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। ফলে পুরোনো কেবল টেলিভিশন ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ঋণ সামলানোর পাশাপাশি নতুন স্ট্রিমিং ব্যবসাকে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন ও ডিজনির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিয়ে যেতে হবে।
স্কাইড্যান্সকে এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কয়েক কোটি নতুন গ্রাহক সংগ্রহ করতে হবে। একই সময়ে খরচ কমাতে হবে, কর্মী কমাতে হবে এবং কনটেন্টে বিনিয়োগও বজায় রাখতে হবে। ফলে ব্যবসাটি অনেকটা চলন্ত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের মতো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
খেলাধুলাই হতে পারে বড় শক্তি
স্ট্রিমিংয়ের পাশাপাশি খেলাধুলা স্কাইড্যান্সের জন্য দর্শক ধরে রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগ বা এনএফএল।
সিবিএস স্পোর্টসের সঙ্গে এনএফএলের বর্তমান চুক্তির মূল্য বছরে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার এবং এটি ২০৩৩ মৌসুমের শেষে শেষ হওয়ার কথা। তবে প্যারামাউন্টের মালিকানা বদলের কারণে এনএফএলের হাতে চুক্তি পুনরায় আলোচনার সুযোগ রয়েছে। ২০২৯ মৌসুম শেষে লিগ চাইলে চুক্তি থেকে বেরিয়েও যেতে পারে।
এখন পর্যন্ত এনএফএল সেই সুযোগ ব্যবহার করেনি। তবে শিল্প বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ভবিষ্যতে সিবিএস স্পোর্টসের কাছ থেকে বছরে আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার দাবি করতে পারে লিগ।
এর বিনিময়ে ২০২৯ সালে চুক্তি বাতিলের সুযোগ বাদ দিয়ে সিবিএসকে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে পারে এনএফএল। কারণ ফুটবল শুধু টেলিভিশনের দর্শকই আনে না, এটি বিজ্ঞাপন, কেবল ও স্যাটেলাইট বিতরণ এবং স্ট্রিমিং গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
মার্চ ম্যাডনেস বাস্কেটবল টুর্নামেন্ট নিয়েও নতুন ব্যবস্থাপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমানে সিবিএস স্পোর্টস ও ওয়ার্নার যৌথভাবে এর সম্প্রচার স্বত্ব ধরে রেখেছে। এই চুক্তি ২০৩২ সাল পর্যন্ত চলবে। টুর্নামেন্টের পরিধি ভবিষ্যতে আরও বাড়লে সম্প্রচার ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
এর পাশাপাশি দ্য মাস্টার্স, পিজিএ চ্যাম্পিয়নশিপ, পিজিএ ট্যুর, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউএফসি—বিভিন্ন বড় ক্রীড়া স্বত্বও স্কাইড্যান্সের হাতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের তুলনায় খেলাধুলার সম্প্রচার স্বত্বে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে নতুন প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে ডেভিড এলিসনের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় লক্ষ্য—সিএনএনের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও ব্যবসায়িক সাফল্য ধরে রাখা, চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়িয়েও মান বজায় রাখা, একাধিক স্ট্রিমিং সেবা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা, বিপুল ঋণ কমানো এবং খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রচার স্বত্ব ধরে রাখা।
হলিউডে বড় একটি সাম্রাজ্য তৈরি করা হয়তো তার জন্য প্রথম সাফল্য। এখন সেই সাম্রাজ্যকে লাভজনক, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তোলাই হবে আসল পরীক্ষা।












