যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর শুক্রবার এ ঘোষণা আসে, দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইসিসি এই নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে একে আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে আদালতটির ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আইসিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া যায় না। আদালতটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই রাষ্ট্রগুলোর ওপরও, যারা এটি প্রতিষ্ঠা করেছে। বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার নয়; বরং আইনের শাসনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার প্রশ্ন। ইতিহাস এই মুহূর্তের মূল্যায়ন করবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের কার্যক্রমে বড় বাধার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের পদক্ষেপ আগের নিষেধাজ্ঞার তুলনায় আরও বিস্তৃত। এর ফলে শুধু আইসিসির কর্মকর্তা বা বিচারকদের ওপর নয়, আদালতটিকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি বিচারিক সংস্থার বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপকে নজিরবিহীন আক্রমণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইসিসি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হলো রোম সংবিধি বা রোম স্ট্যাটিউট। যুক্তরাষ্ট্র একসময় এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও পরে তা অনুসমর্থন করেনি। ফলে দেশটি আইসিসির সদস্যরাষ্ট্র নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ দেবেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিসির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ও সম্পদের প্রবাহ কমিয়ে দেওয়া এবং এর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করাই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য।
রুবিও আদালতটিকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন আদালত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন সেনাসদস্য, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য এবং নির্বাচিত নেতাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য আদালতের বাইরে থেকেও চাপ তৈরি করা হয়েছে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের বিচারের বিষয়ে আইসিসি কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে ছয় মাসের সময়
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের একটি সময়সীমা রেখেছে। এ সময়ের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন পরিশোধ এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লেনদেন এই ছাড়ের আওতায় পড়বে।
মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে আইসিসি ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞার কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন দাবিগুলো পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞার ধরন ও পরিধি পরিবর্তন করা হতে পারে।
ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই আইসিসির কয়েকটি পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির সমালোচনা করেছে। আফগানিস্তান-সংক্রান্ত তদন্তকে আইসিসি বর্তমানে অগ্রাধিকারহীন পর্যায়ে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর ফলে ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষা প্রত্যাহার করতে পারে এবং সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো সহযোগিতা বন্ধ করতে পারে। আইসিসির ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আদালতটির দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইসিসি বলছে, তদন্ত ও বিচার চলবে
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আইসিসি। আদালতটির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান রয়টার্সকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজকে দুর্বল করা। তবে আদালতের বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে কাজ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে ছয় মাসের সময়সীমা আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আইসিসির গুরুত্বপূর্ণ কাজ অব্যাহত রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে বলেও তিনি জানান।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতটিকে সুরক্ষা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ধরনের ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হতে পারে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট বিদেশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে রক্ষা করা। তবে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
আইসিসি বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০ জনেরও বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, হামাসের কয়েকজন নেতা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো এবং দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াটার বিরুদ্ধে আগে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
আইসিসির পক্ষে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমর্থন
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে আইসিসি থেকে সরে আসার আহ্বান জানালেও আদালতটি অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর অন্য সব সদস্যরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য। আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো—উভয়েরই সদস্য।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই আইসিসিকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে।
সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় আইসিসি কয়েক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আদালতটি মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে মুক্ত উৎসের বিকল্প ব্যবহারের জন্য দপ্তরের কম্পিউটার ব্যবস্থা পরিবর্তন করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রসঙ্গ
আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল চেম্বারে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নোবেল পুরস্কার কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে, তখন এ পুরস্কার আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সমর্থনের বার্তা বহন করে।
কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পান, শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত।
একই দিনে নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা এবং আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়ে চলমান মতপার্থক্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের নাগরিক ও কর্মকর্তাদের ওপর আদালতের এখতিয়ার গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে আইসিসি ও এর সমর্থকদের অবস্থান, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বজায় রাখা জরুরি।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধান সম্ভব হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।












