ব্রণকে সাধারণত কৈশোরের সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এটি বেশ সাধারণ। বিশেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পর অনেকের মুখে নতুন করে ব্রণ দেখা দেয়, যা আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বস্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। মুখের পাশাপাশি বুক, কাঁধ ও পিঠেও ব্রণ হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না নিলে ত্বকে কালচে দাগ ও স্থায়ী ক্ষত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের ব্রণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ফিলিপাইনের বিপণনকর্মী ও কনটেন্ট নির্মাতা গিলিয়ান মেগান মন্টালবোর কৈশোরে কপাল ও নাকে অল্প কয়েকটি ব্রণ ছিল। কর্মজীবনে প্রবেশের পর তাঁর গাল ও থুতনিতে আবারও ব্রণ দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে তীব্র হয়। এতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও অস্বস্তি বোধ করতেন তিনি। তাঁর আত্মবিশ্বাসেও এর প্রভাব পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স স্কুল অব মেডিসিনের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও এথনিক স্কিন প্রোগ্রামের পরিচালক ক্রিস্টাল আগুহের মতে, ব্রণ নিয়ে একা কষ্ট পাওয়ার প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিন ব্রণ থাকলে কিংবা ত্বকের রং ও গঠনে পরিবর্তন দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রাপ্তবয়স্কদের ব্রণের কারণ কী?
ব্রণ তৈরি হয় যখন ত্বকের ক্ষুদ্র রন্ধ্র তেল, ব্যাকটেরিয়া ও মৃত কোষ জমে বন্ধ হয়ে যায়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের পরিবর্তন, পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাস এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। অতিরিক্ত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গেও কিছু ক্ষেত্রে ব্রণের সম্পর্ক থাকতে পারে।
কৈশোরে সাধারণত কপাল, নাক ও গালে ব্রণ বেশি দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত ব্রণ প্রায়ই চোয়াল ও থুতনির আশপাশে দেখা দেয়। স্টেরয়েড ব্যবহারও ব্রণ সৃষ্টি করতে পারে।
ব্রণ কখনো ছোট, ব্যথাহীন সাদা বা কালো দানার মতো হয়। আবার গুরুতর ক্ষেত্রে লাল, ব্যথাযুক্ত গুটি কিংবা ত্বকের গভীরে সিস্ট তৈরি হতে পারে। মাঝেমধ্যে একটি-দুটি ব্রণ ওঠা এবং দীর্ঘদিন ধরে বারবার ব্রণ হওয়া এক বিষয় নয়। ব্রণ ছড়িয়ে পড়লে বা স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কোন চিকিৎসায় ব্রণ কমে?
হালকা ব্রণের ক্ষেত্রে বেঞ্জয়েল পারঅক্সাইড, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড কিংবা অ্যাডাপালিনের মতো রেটিনয়েডযুক্ত ফেসওয়াশ ও ক্রিম কাজে আসতে পারে। তবে ঘন ঘন ব্রণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক বা ট্রেটিনয়িন ব্যবহার করা হতে পারে। গুরুতর সিস্টিক ব্রণ কিংবা অন্য চিকিৎসায় কাজ না হলে আইসোট্রেটিনয়িন বিবেচনা করা হয়।
প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের হরমোনজনিত ব্রণের চিকিৎসা কৈশোরের ব্রণের চিকিৎসা থেকে আলাদা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হরমোন নিয়ন্ত্রণে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি কিংবা স্পাইরোনোল্যাকটোনের মতো ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ব্রণ দ্রুত কমাতে কর্টিসোন ইনজেকশন দেওয়া হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
ব্রণ চেপে ধরা বা নখ দিয়ে খোঁচানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এতে প্রদাহ বাড়তে পারে, ব্রণ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং দাগের ঝুঁকি বাড়ে। শিকাগোর ফাইন ডার্মাটোলজির প্রতিষ্ঠাতা লরেন ফাইনের মতে, ব্রণ চেপে ধরলে পরিস্থিতি প্রায়ই আরও খারাপ হয়।
গাঢ় ত্বকের মানুষের ক্ষেত্রে প্রদাহের পর কালচে দাগ থেকে যাওয়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে। হাইড্রোকলয়েডযুক্ত পিম্পল প্যাচ কিছু ব্রণকে সুরক্ষিত রাখতে এবং খোঁচানো কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সব ধরনের ব্রণে এসব প্যাচ উপযোগী নয়; কারও কারও ক্ষেত্রে ত্বকের রঙের পরিবর্তনও হতে পারে।

ব্রণের দাগ সারতে সময় লাগে
ব্রণ কমে গেলেও কালচে দাগ ও ক্ষত সারতে বেশি সময় লাগতে পারে। গ্লাইকোলিক অ্যাসিডযুক্ত পণ্য, অ্যাডাপালিন কিংবা রেটিনল ক্রিম কিছু ক্ষেত্রে দাগের চেহারা উন্নত করতে পারে। গভীর ক্ষতের জন্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ লেজারের মতো চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।
চিকিৎসার ফল পেতে ধৈর্য প্রয়োজন। কিছু চিকিৎসা শুরু করার পর প্রথম দিকে সাময়িকভাবে ব্রণ বেড়ে যেতে পারে, যাকে ‘স্কিন পার্জিং’ বলা হয়। তাই নিজে নিজে ওষুধ বদলানো বা চিকিৎসা বন্ধ করার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
মন্টালবোর ব্রণ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার এক বছরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে দাগ রয়ে যায়, আর তাঁকে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে আলাদাভাবে চেষ্টা করতে হয়। পরিবারের সমর্থন এবং কাছের মানুষের ইতিবাচক আচরণ তাঁকে কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করেছে।












