ইংল্যান্ডের রয়্যাল শেক্সপিয়র কোম্পানির নতুন প্রযোজনা ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’-এর উদ্বোধনী রাতে মঞ্চের যান্ত্রিক ত্রুটিতে দীর্ঘ সময় থেমে যায় অভিনয়। তবে এই অপ্রত্যাশিত বিপত্তিই যেন নাটকটির আনন্দ, সহমর্মিতা ও শিল্পীদের পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও গভীরভাবে সামনে আনে। সব চরিত্রে পুরুষ অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে তৈরি এই প্রযোজনায় শেক্সপিয়রের পরিচিত হাস্যরস, প্রেম, পরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
গত সপ্তাহে স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনের রয়্যাল শেক্সপিয়র থিয়েটারে উদ্বোধনী প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। বাইরে ছিল মেঘলা আকাশ, নদীতে ভাসছিল রাজহাঁসের দল। মঞ্চেও প্রথম প্রায় এক ঘণ্টা সবকিছু চলছিল পরিকল্পনামতো। কিন্তু প্রথম অঙ্কের শেষ দিকে মঞ্চের একটি বড় অংশ ওপরে উঠতে শুরু করে মাঝপথে আটকে যায়। পর্দার আড়ালে কর্মীরা মই ও সরঞ্জাম নিয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন। দর্শকদের অপেক্ষা করতে বলা হয়।
এই বিপত্তিতে প্রদর্শনী এক ঘণ্টারও বেশি থেমে থাকে। শেষে রয়্যাল শেক্সপিয়র কোম্পানির সহশিল্পনির্দেশক ও নাটকের পরিচালক ড্যানিয়েল ইভান্স নিজে দর্শকদের সামনে এসে জানান, কর্মীরা হাতে করেই রাজদরবারের সেট সরিয়ে নিয়েছেন। দর্শকেরা করতালি দিয়ে তাঁদের অভিনন্দন জানান। এরপর মঞ্চে হাজির হয় বহুল প্রতীক্ষিত আর্ডেনের বন: সবুজ ঘাস, শ্যাওলা আর রোদে ভরা এক বিশাল কল্পলোক।
পুরুষ অভিনয়শিল্পীদের চোখে নতুন রোজালিন্ড
উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ প্রেম, পরিচয়, ছদ্মবেশ ও স্বাধীনতার গল্প। কেন্দ্রীয় চরিত্র রোজালিন্ডের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জোনাথন গ্রফ। তার চাচাতো বোন সিলিয়ার চরিত্রে ফিসায়ো আকিনাদে এবং অরল্যান্ডোর চরিত্রে এলিয়ট বার্নস-ওরেল।
নাটকের শুরুতে রোজালিন্ড জানতে পারে, তার ক্ষমতালোভী চাচা ডিউক তাকে মেরে ফেলতে চান। সিলিয়া প্রিয় বন্ধুকে ছেড়ে থাকতে রাজি নয়। অন্যদিকে অরল্যান্ডোও প্রাণনাশের আশঙ্কায় পালাতে বাধ্য হয়। তিনজনই শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুর রাজদরবার ছেড়ে আশ্রয় নেয় আর্ডেনের বনে।
ইভান্সের নির্দেশনায় রাজদরবার হয়ে উঠেছে শীতল, বিকৃত ও অস্বস্তিকর এক জগৎ। দাবার ঘুঁটির মতো সাদাকালো আবহ, প্রায় ছয় মিটার উঁচু সাদা দরজা আর কালো পোশাকে ডিউকের উপস্থিতি ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে। কোথাও কোথাও ডিউকের লোকজনকে দেখা যায় ভয়ংকর সাদা খরগোশের মুখোশ পরে। পুরো পরিবেশটি যেন অ্যালিসের পরিচিত কল্পজগতের উল্টো পিঠ, যেখানে চেনা সবকিছু অদ্ভুত ও বিপজ্জনক।
এই অন্ধকার জগৎ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই প্রথম অঙ্কের শেষ মুহূর্তগুলোকে তীব্র করে তোলে। সিলিয়া যখন বলে, এবার তারা স্বাধীনতার পথে যাবে, গানের সুরে বেজে ওঠে মুক্তির ডাক। রোজালিন্ড ও সিলিয়ার পালানোর দৃশ্যের সঙ্গে অরল্যান্ডোর মুক্তির যাত্রাও পাশাপাশি এগিয়ে নিয়েছেন ইভান্স। ফলে সেট আটকে যাওয়ার ঠিক আগে দর্শকের মধ্যে তৈরি হয়েছিল প্রবল উত্তেজনা।
হাস্যরসের আড়ালে বন্ধুত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন
এই প্রযোজনার বিশেষত্ব শুধু সব চরিত্রে পুরুষ শিল্পী নয়। এর মধ্য দিয়ে শেক্সপিয়রের সময়ের মঞ্চের ঐতিহ্যও ফিরে এসেছে। এলিজাবেথীয় যুগে নারী চরিত্রে পুরুষেরাই অভিনয় করতেন। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে ইভান্স নাটকের পরিচিত সম্পর্ক ও হাস্যরসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
নাটকে রোজালিন্ড ছদ্মবেশে গ্যানিমিড নামের এক তরুণ সাজে। এরপর অরল্যান্ডোকে প্রেমের আচরণ অনুশীলনের প্রস্তাব দেয়। এই ছদ্মবেশের সুযোগে রোজালিন্ড নারীদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে এবং অহংকারী রাখালকন্যা ফিবিকে কটাক্ষ করে। ফিবি আবার না জেনেই নিজের বিদ্রূপকারীর প্রেমে পড়ে যায়।
মূল নাটকে এই হাস্যরস কখনো কখনো নির্মমতার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। কিন্তু ইভান্সের প্রযোজনায় তা অনেকটাই কোমল। শিল্পীদের বন্ধুত্ব, একসঙ্গে গান আর দৃশ্যের ভেতরের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ নাটকটিকে আরও মানবিক করেছে। ওয়েলশ লোকগানের সুরে শিল্পীরা যখন সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন, মঞ্চে তৈরি হয় আন্তরিক আবহ। কেউ নারী চরিত্রে পুরোপুরি রূপান্তরিত হয়েছেন, কেউ বেছে নিয়েছেন অতিরঞ্জিত কৌতুকের ভঙ্গি। কিন্তু কোনো চরিত্রই বিদ্রূপের বস্তু হয়ে যায়নি, হাস্যরসের মধ্যেও প্রত্যেকের প্রতি মমতা বজায় থেকেছে।
রোজালিন্ডের চরিত্রে গ্রফের অভিনয়েও আছে আনন্দময় স্বাধীনতা। বনে ঢোকার পর তার ছদ্মবেশের প্রয়োজন যেন কমে আসে। চরিত্রটি তখন নিজের স্বাভাবিক সত্তার কাছাকাছি পৌঁছায়। পোশাক, কণ্ঠ ও আচরণের এই বদল নাটকের পরিচয়ের প্রশ্নগুলোকে আরও অর্থবহ করে।
সিলিয়ার চরিত্রে বন্ধুত্বের গভীরতা
এই প্রযোজনার অন্যতম শক্তির দিক সিলিয়ার চরিত্রে ফিসায়ো আকিনাদের অভিনয়। রোজালিন্ডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিলিয়া শুধু হাসির সঙ্গী নয়, রোজালিন্ডের কথা ও আচরণে নিজের প্রতিক্রিয়াও স্পষ্ট জানায়। রোজালিন্ড যখন নারীদের নিয়ে কঠোর মন্তব্য করে, সিলিয়া সত্যিই আহত হয়। দুই বন্ধুর মধ্যে দূরত্ব তৈরির আশঙ্কা দেখা দেয়। এই মুহূর্তটি নাটকের অনেক কৌতুকদৃশ্যের চেয়ে বেশি আবেগঘন।
আকিনাদের বিশেষত্ব তাঁর মুখের অভিব্যক্তি আর নীরব প্রতিক্রিয়া। রোজালিন্ডের অদ্ভুত কাণ্ডের সময় তাঁকে প্রায়ই মঞ্চের মাঝখানে বসে থাকতে দেখা যায়। কিছু না বলেও শুধু মুখভঙ্গিতে তিনি দর্শককে হাসান। তাঁর মুখে কখনো বিস্ময়, কখনো বিরক্তি, কখনো বন্ধুর কাণ্ডে অবিশ্বাস ফুটে ওঠে।
অন্যদিকে গ্রফের রোজালিন্ডে আছে সহজাত উচ্ছ্বাস। বার্নস-ওরেলের সঙ্গে তাঁর রসায়নও বিশ্বাসযোগ্য। দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষমতা গ্রফের অভিনয়কে আরও প্রাণবন্ত করেছে। নাটকের শেষে দর্শকের উদ্দেশে রোজালিন্ডের মজার বক্তব্যও নিছক কৌতুক না থেকে দর্শক ও শিল্পীর ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত হয়ে ওঠে।
আর্ডেনের বনে প্রেমের নানা রূপ
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আর্ডেনের বন মঞ্চে আসতেই দৃশ্যপট পুরো বদলে যায়। রাজদরবারের শীতলতার বদলে দেখা যায় রোদে উজ্জ্বল সবুজ পাহাড়ি ঢাল, ঘাস আর শ্যাওলা। চরিত্রগুলো কখনো ঢালে ছুটে বেড়ায়, কখনো ঘাসের আড়াল থেকে উঁকি দেয়। যেন এক রূপকথার জগৎ, যেখানে প্রকৃতির কাছে ফিরে মানুষ সমাজের কঠোর নিয়ম থেকে মুক্তি পায়। মঞ্চসজ্জায় অনিশা ফিল্ডস, শব্দ পরিকল্পনায় পল গ্রুথুইস এবং আলোক পরিকল্পনায় রায়ান ডে পুরো থিয়েটারে গ্রীষ্মের অলস, শান্ত আবহ ছড়িয়ে দিয়েছেন।
একটি দৃশ্যে প্রেমের জটিল সম্পর্কগুলো একসঙ্গে সামনে আসে। সিলভিয়াস, ফিবি, রোজালিন্ড ও অরল্যান্ডো, চারজনের আকাঙ্ক্ষা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ফিবি যখন সিলভিয়াসকে জিজ্ঞেস করে প্রেম আসলে কী, সিলভিয়াস দীর্ঘশ্বাস আর অশ্রুতে গড়া প্রেমের কথা বলে। কিন্তু অরল্যান্ডো আর গ্যানিমিডের প্রেমালাপে দীর্ঘশ্বাসের চেয়ে হাসিই বেশি। সেই হাসি ধীরে ধীরে পুরো বনকে উচ্ছ্বসিত করে তোলে। এখানে প্রেম শুধু বেদনা বা ত্যাগ নয়, আনন্দ, খেলা, ভুল বোঝাবুঝি আর নিজেকে নতুন করে চেনার অভিজ্ঞতাও।
নাটকের শেষে চারটি বিয়ের আয়োজন হয়। ইভান্স এই অংশে তাড়াহুড়া করেননি। ধীর, মর্যাদাপূর্ণ আনন্দে বিয়ের দৃশ্যগুলো সাজিয়েছেন তিনি। শিল্পীরা প্রাচীন ইউরোপীয় নাচের ছন্দে এগিয়ে যান, সঙ্গে থাকে হৃদয়ছোঁয়া গান। দৃশ্যটি মঞ্চের সব চরিত্রের আনন্দ ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতাকে সামনে আনে।
বিপত্তিই হয়ে উঠল উদ্বোধনী রাতের স্মরণীয় অংশ
যান্ত্রিক ত্রুটি উদ্বোধনী রাতকে অস্বাভাবিক করে তুললেও শেষ পর্যন্ত তা দর্শকের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়। নাটক আদৌ বনের দৃশ্যে পৌঁছাবে কি না, এই অনিশ্চয়তা দর্শকদের মধ্যে একধরনের সম্মিলিত উদ্বেগ তৈরি করেছিল। অপেক্ষার সময় সবাই যেন একই অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে ওঠেন।
নাট্যসমালোচক হেলেন শ মনে করেন, এমন পরিস্থিতি রোজ ঘটবে না। তবে অপ্রত্যাশিত এই বিরতি দর্শক ও শিল্পীদের মধ্যে উচ্ছ্বসিত সংহতি তৈরি করেছে। মঞ্চের পেছনের কারিগরি কর্মীদের ভূমিকার গুরুত্বও এতে স্পষ্ট হয়েছে। তবে এই প্রযোজনার সাফল্য শুধু বিপত্তি সামলে ওঠায় নয়। পুরো দলের সমন্বিত অভিনয়, গান, মঞ্চসজ্জা আর চরিত্রগুলোর আনন্দের আদান-প্রদান নাটকটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ শেষ পর্যন্ত এমন এক জগৎ গড়ে, যেখানে ক্ষমতা ও ভয়ের রাজদরবার ছেড়ে মানুষ স্বাধীনতার খোঁজে প্রকৃতির কাছে ফেরে। সেখানে প্রেম, বন্ধুত্ব ও পরিচয়ের নানা রূপ মিলেমিশে যায়। উদ্বোধনী রাতের যান্ত্রিক বিপত্তি সেই যাত্রা কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতে নাটকের মূল সুর, স্বাধীনতা, সহমর্মিতা ও সম্মিলিত আনন্দ, আরও স্পষ্ট হয়েছে।












