কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু লেখা, ছবি কিংবা নকশা তৈরির প্রযুক্তি নয়। গ্রাহকের হয়ে কেনাকাটা করা, পণ্য ফেরত দেওয়ার আবেদন সামলানো, অর্থ পরিশোধের তথ্য ব্যবহার করা এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করার মতো দায়িত্বও নিতে শুরু করেছে এআইভিত্তিক এজেন্ট। এতে ফ্যাশন ও সৌন্দর্যশিল্পের সামনে নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাড়ছে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ।
প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মধ্যে ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে এআই ব্যবহার করে ব্যবসার দক্ষতা বাড়ানো যাবে, অথচ গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হবে না। ডেটা বিজ্ঞানী ও দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের পক্ষে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের প্রতিষ্ঠাতা রুম্মান চৌধুরীর মতে, এআই ব্যবহারে সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ে মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এআই নিয়ে উচ্ছ্বাসের চেয়ে উদ্বেগ বেশি অনুভব করেন—এমন মানুষের হার ২০২১ সালে ছিল ৩৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। অন্যদিকে, বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্যালাপের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের উপকারের তুলনায় ক্ষতি বেশি—এমন ধারণা পোষণকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের এআই সম্পর্কে জ্ঞানী বলে মনে করলেও প্রযুক্তিটি নিয়ে সংশয় কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেশন জেডের প্রায় ৪৭ শতাংশ মনে করেন, এআই উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে।
এই উদ্বেগের কারণ শুধু অজানা প্রযুক্তির প্রতি ভয় নয়। মানুষ ইতিমধ্যে এআই ব্যবহার করছে এবং এর সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে। ফলে এআইকে সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম কোনো অতিমানবীয় শক্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা কমছে। বরং মানুষ বুঝতে পারছে, এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যার ব্যবহার নির্ভর করে কে কী উদ্দেশ্যে এবং কী ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এটি কাজে লাগাচ্ছে তার ওপর।
এআই এজেন্টের ক্ষমতা বাড়লে ঝুঁকিও বাড়ে
এত দিন এআইয়ের বহুল আলোচিত ব্যবহার ছিল লেখা, ছবি ও নকশা তৈরি। এখন প্রযুক্তিটি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে এআই এজেন্ট ব্যবহারকারীর হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করতে পারে। গ্রাহকের হয়ে কেনাকাটা করা কিংবা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার মতো কাজেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন প্রশ্ন। কোনো এআই এজেন্ট যদি একজন মানুষের হয়ে কাজ করে, তাহলে তার নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় কার? এজেন্টটি ভুল করলে, অনুমতি ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ করলে কিংবা এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে যা ব্যবহারকারী চাননি, তার দায় কি ব্যবহারকারীর, প্রযুক্তি নির্মাতার, নাকি এআই ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের?
রুম্মান চৌধুরী এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ব্যবহৃত একটি মডেলকে অস্ট্রেলিয়ায় ওষুধ খাতে সরকারি ব্যয়ের পরিসংখ্যান খুঁজে বের করতে বলা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে না পেয়ে মডেলটি নির্দেশনা বা অনুমোদন ছাড়াই একটি সরকারি ব্যবস্থায় প্রবেশের পথ খুঁজে নেয় এবং সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ নথি ও প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে।
ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওপেনএআই জানিয়েছিল, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে সক্ষম মডেলগুলোর টুল ব্যবহারের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন স্থগিত রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত হলে আবার এ কার্যক্রম শুরু করা হবে।
এই ঘটনা দেখায়, কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য এআইকে বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হলে সেটি প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে যখন এআইয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা সংবেদনশীল ডিজিটাল ব্যবস্থার সংযোগ থাকে, তখন একটি ভুলের প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ফ্যাশন ও সৌন্দর্যশিল্পে এআই এজেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কোনো ব্র্যান্ড এআইকে গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথমত, এআই ঠিক কোন তথ্য ও ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারবে, আর কোন ক্ষেত্রে তার প্রবেশাধিকার থাকবে না—তা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থ ব্যয়, ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান কিংবা কারও চেহারা ও পরিচয়ের অনুকৃতি তৈরির মতো সংবেদনশীল কাজে মানুষের অনুমোদন কখন বাধ্যতামূলক হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, এআই ব্যবস্থা চালুর আগেই সেটিকে সম্ভাব্য আক্রমণকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তিটি শুধু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কাজ করছে কি না, তা দেখলেই চলবে না; নিরাপত্তার দুর্বলতা খুঁজে বের করার জন্যও পরীক্ষা চালাতে হবে। চতুর্থত, কোনো ত্রুটি বা নিরাপত্তা লঙ্ঘন ঘটলে গ্রাহককে কত দ্রুত জানানো হবে, তারও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে।
চৌধুরীর মতে, এআই ব্যবস্থার কোনো সমস্যা ঘটার পর দীর্ঘ সময় নিয়ে তা শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর দৃষ্টিতে, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দ্রুত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিষয়টি জানানো একটি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব।
কর্মীদের বাদ দিয়ে এআই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নয়
এআই নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই দুটি বিপরীত অবস্থান দেখা যায়। একদিকে রয়েছে প্রযুক্তির সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে চরম আশঙ্কা, অন্যদিকে রয়েছে—এআই গ্রহণ না করলে ব্যবসা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে—এমন চাপ। এই দুই অবস্থানই কখনো কখনো কর্মীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করার সুযোগ সংকুচিত করে।
চৌধুরীর মতে, ভালো নেতৃত্বের কাজ হলো আতঙ্ক কিংবা অন্ধ প্রতিযোগিতার মধ্যে সিদ্ধান্ত না নিয়ে এআই ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতি তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, কোন কাজে এআই ব্যবহার করা হবে, কোন কাজে কখনোই করা হবে না এবং কোনো ভুল হলে কে তার দায় নেবেন।
ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের সৃজনশীল কর্মীদেরও জানানো প্রয়োজন, তাঁদের কাজের কোন অংশে এআই সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং কোন ক্ষেত্রে মানুষের সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাবে। পাশাপাশি কর্মীদের এআই পরীক্ষা ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।
দোকানে কাজ করা কর্মী কিংবা গ্রাহকের অভিযোগ সামলানো কর্মীরা অনেক সময় এমন সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন, যা প্রযুক্তি সরবরাহকারীর প্রদর্শনীতে ধরা পড়ে না। তাই কর্মীদের সমস্যা আড়াল করার পরিবর্তে দ্রুত জানাতে উৎসাহিত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআই যেন গ্রাহকসেবাকে উন্নত করে, কিন্তু গ্রাহক যে মানবিক যোগাযোগের প্রত্যাশা নিয়ে একটি ব্র্যান্ডের কাছে আসেন, সেটিকে পুরোপুরি সরিয়ে না দেয়।
স্বচ্ছতা ও সম্মতি ছাড়া আস্থা তৈরি কঠিন
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে জনসাধারণের আস্থা পুরোপুরি অর্জন করা যায়নি। ফ্যাশনশিল্পেও শুধু নিজেদের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে গ্রাহকের বিশ্বাস ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
চৌধুরীর মতে, যেসব ব্র্যান্ড এআই কোথায় ব্যবহার করছে এবং কোথায় করছে না, তা প্রকাশ করবে, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করবে এবং কারও চেহারা বা পরিচয়ের অনুকৃতি তৈরির আগে সম্মতি নেবে, তাদের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তৈরির সুযোগ বেশি থাকবে। একই সঙ্গে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কার্যক্রম যাচাইয়ের সুযোগও দেওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে আইন ও নীতিমালার ভূমিকা রয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে কোনো মডেলের ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরির আগে তাঁর সম্মতির প্রয়োজন হয়। কৃত্রিমভাবে তৈরি অভিনয়শিল্পী ব্যবহার করা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট পরিচিতি দেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে সব বিষয়ে আইন এখনো একই ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেনি। যেসব ক্ষেত্রে আইনি নির্দেশনা নেই, সেখানে ব্র্যান্ডগুলো নিজেরাই দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণ করতে পারে।
এর উদাহরণ হিসেবে চৌধুরী পোশাক ব্র্যান্ড অ্যারির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিজ্ঞাপনে এআই দিয়ে তৈরি শরীর বা মানুষের ছবি ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘোষণা এক বছরে ব্র্যান্ডটির ইনস্টাগ্রামে সবচেয়ে বেশি পছন্দ পাওয়া পোস্টে পরিণত হয়। ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয়, প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা উদ্ভাবনের গতি কমায় না
এআই ব্যবহারে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরোপ করলে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হবে—এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু চৌধুরীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। তাঁর মতে, কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশি আস্থা পায়। কারণ, কোনো সমস্যা হলে কে দায় নেবে এবং কীভাবে তা সমাধান করা হবে, সে বিষয়ে তাদের ধারণা থাকে।
এই যুক্তি ফ্যাশন ও সৌন্দর্যশিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এআই ব্যবহার করে পণ্যের নকশা, বিপণন, গ্রাহকসেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও দক্ষ করা সম্ভব। কিন্তু এসব সুবিধা কাজে লাগাতে গিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য, সম্মতি এবং মানবিক পছন্দকে উপেক্ষা করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চৌধুরীর বক্তব্যের মূল কথা হলো, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিকে প্রযুক্তি ব্যবহারের অতিরিক্ত খরচ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলো ব্র্যান্ডের পরিচয় ও মূল্যবোধেরই অংশ।
ভবিষ্যতে এআই নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক বা কেলেঙ্কারি সামনে এলে যেসব ব্র্যান্ড গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পারবে, তাদের বৈশিষ্ট্য হবে প্রযুক্তির কেন্দ্রে মানুষকে রাখা। শুধু এআই কী করতে পারে, তা নয়; কী করা উচিত নয়, কোন সিদ্ধান্তে মানুষের অনুমতি প্রয়োজন এবং ভুল হলে কে দায় নেবে—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।
প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের পছন্দ, সম্মতি ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়াও সমান জরুরি। শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের আস্থা অর্জন করবে তারাই, যারা এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, মানুষের প্রয়োজন পূরণের দায়িত্বশীল উপায় হিসেবে ব্যবহার করবে।












