ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকার শিরোপা, চ্যাম্পিয়নস লিগের সাফল্য আর রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর—সব মিলিয়ে তাঁর অর্জনের তালিকা ঈর্ষণীয়। অথচ এত সাফল্যের পরও আর্জেন্টিনার এই মহাতারকার মনে হচ্ছে, ফুটবল তাঁকে যা দিয়েছে, তার পুরোটা হয়তো এখনো উপলব্ধি করতে পারেননি তিনি।
৩৯ বছর বয়সী মেসি সম্প্রতি আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানার পর নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর শেষ ম্যাচ। এরপর ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস প্রকাশিত একটি বিশেষ ভিডিওতে নিজের দীর্ঘ ফুটবলজীবন, অর্জন ও বিদায়ের আবেগ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলে নিজেকে কী পরামর্শ দিতেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মেসি বলেন, প্রতিটি মুহূর্ত আরও বেশি উপভোগ করতে। তাঁর ভাষায়, ‘উপভোগ করো। প্রতিটি মুহূর্তকে আরেকটু বেশি উপভোগ করো। সত্যি বলতে, ফুটবলে আমি যা অর্জন করেছি, তার সবকিছুর ব্যাপ্তি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি কি না, তা-ও জানি না।’
মেসির মতো একজন খেলোয়াড়ের মুখে এমন কথা নিঃসন্দেহে বিস্ময় জাগায়। যে ফুটবলার বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা জিতেছেন, ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য পেয়েছেন এবং আটবার ব্যালন ডি’অর জয়ের কীর্তি গড়েছেন, তিনিই নিজের অর্জনের বিশালতা নিয়ে এখনো ভাবছেন।
তবে মেসির ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এই সাফল্য এক দিনে আসেনি। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার হয়ে বড় শিরোপা জিততে না পারার হতাশা একসময় তাঁকে গভীরভাবে পীড়া দিয়েছিল। একের পর এক ফাইনালে হারের পর সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। এমনকি একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই হতাশার কাছে হার মানেননি মেসি। ফিরে এসে আবারও জাতীয় দলের হয়ে লড়াই করেছেন। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জিতিয়ে পূর্ণ করেছেন দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। যে শিরোপাগুলো একসময় বারবার অধরা থেকে গিয়েছিল, সেগুলোই পরে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জনের অংশ হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্যের এত দীর্ঘ তালিকার পরও মেসির কাছে আর্জেন্টিনার জার্সির গুরুত্ব আলাদা। জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকের বেশি সময় কাটানোর পর সেই পরিচিত পরিবেশ থেকে বিদায় নেওয়া যে সহজ নয়, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট।
মেসি বলেন, ‘এখানে আসতে আমার খুব ভালো লাগত। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি এখানে আসছি। তাই এই জায়গা থেকে সরে যাওয়া সহজ নয়। এতগুলো বছর আমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য আর্জেন্টিনাকে ধন্যবাদ।’
জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেসি জয় ও পরাজয়—দুই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন। তাঁর কাছে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার অর্থ শুধু ট্রফি জেতা নয়; বরং হৃদয় দিয়ে দেশের হয়ে খেলা এবং জাতীয় দলের প্রতি নিজের অঙ্গীকার ধরে রাখা।
তাঁর ভাষায়, ‘এই জার্সি পরতে পারা এবং পুরো হৃদয় দিয়ে এর মর্যাদা রক্ষা করতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের। আমি পরাজয় দেখেছি, জয়ও পেয়েছি। কিন্তু এই জার্সি পরার অর্থ সবকিছুর চেয়ে বড়। আমি সব সময় এভাবেই নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছি।’
আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর অধ্যায় শেষ হলেও মেসির ফুটবলজীবন এখনো শেষ হয়নি। ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পায়ে বল এলেই এখনো তাঁর পরিচিত জাদু দেখার অপেক্ষায় থাকেন সমর্থকেরা। কোন মুহূর্তে কী করবেন, তা আগেভাগে অনুমান করা এখনো কঠিন।
মেসিকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের বিস্ময়েরও যেন শেষ নেই। তাঁর অসংখ্য দুর্দান্ত ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস কিংবা অবিশ্বাস্য গোলের মধ্যে কোনটিকে সেরা বলা যায়, তা নিয়ে দর্শকদের দ্বিধা কাটে না। একটি মুহূর্তকে সেরা মনে হতে না হতেই আরেকটি মুহূর্ত এসে আগের ধারণা বদলে দেয়।
এখানেই মেসি ও তাঁর ভক্তদের অনুভূতির মিল। সমর্থকেরা তাঁর অসাধারণ কীর্তিগুলোর মধ্যে কোনটিকে সবচেয়ে বড় বলবেন, তা ঠিক করতে পারেন না। আর মেসি নিজেই ভাবছেন, ফুটবলজীবনে পাওয়া সব অর্জনের প্রকৃত মূল্য তিনি কতটা বুঝতে পেরেছেন।
পার্থক্য শুধু এটুকু—মেসিকে খেলতে দেখে সমর্থকেরা বিস্মিত হন, আর নিজের দীর্ঘ ও অসাধারণ যাত্রার দিকে ফিরে তাকিয়ে বিস্মিত হচ্ছেন মেসি নিজেই।












