বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা পেইড স্ট্রিমিং সেবা নেটফ্লিক্স এখন এক অদ্ভুত সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আয় আর মুনাফা ভালো থাকলেও গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর পরদিনই হঠাৎ করে শীর্ষ কনটেন্ট কর্মকর্তাকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনা হয়েছে। হলিউড জুড়ে এই খবর নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা।
এক হাজার কর্মী ছাঁটাই
গত বুধবার নেটফ্লিক্স তাদের প্রায় এক হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করে, যা মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ। গত চার বছরের মধ্যে এটিই প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় ছাঁটাই। অথচ নেটফ্লিক্সের গ্রাহকসংখ্যা এখনো ৩২ কোটি ৫০ লাখের বেশি। টেলিভিশন দেখার মোট সময়ের হিসাবেও তারা ডিজনি, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও কিংবা স্কাইড্যান্সের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেক এগিয়ে।
বেলা বাজারিয়াকে সরিয়ে পিটার রাইস
ছাঁটাইয়ের পরদিন বৃহস্পতিবার নেটফ্লিক্স আরেকটি চমক দেয়। টিভি সিরিজ, সিনেমা, লাইভ অনুষ্ঠান, খেলা ও ভিডিও পডকাস্টের দায়িত্বে থাকা বেলা বাজারিয়াকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় আনা হয়েছে ফক্স ও ডিজনির অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পিটার রাইসকে। সূত্র অনুযায়ী, ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার দিনের শেষ ভাগে বাজারিয়াকে বিষয়টি জানানো হয়।
২০১৬ সালে নেটফ্লিক্সে যোগ দেওয়া বাজারিয়া ২০২৩ সালে টেড সারান্ডোসের কাছ থেকে প্রধান কনটেন্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব নেন। তিনি বড় আয়োজনের জনপ্রিয় অথচ মানসম্পন্ন শো ও সিনেমা বানানোর পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এমি পুরস্কারে খারাপ ফল আর বড় ব্লকবাস্টারের অভাব, দুই দিকেই প্রতিষ্ঠানটি চাপে পড়ে যায়।
কেন এই পরিবর্তন
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী টেড সারান্ডোস সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, নেটফ্লিক্স যতটা দ্রুত বাড়ার কথা ততটা বাড়ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গত এক বছরে শেয়ারদর ৪০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়া। বিশ্লেষকদের মতে, দর্শকের দেখার সময় কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কাই শেয়ারদর পড়ার মূল কারণ।
“স্ট্রেঞ্জার থিংস” গত বছর শেষ হওয়ার পর নেটফ্লিক্স বিশ্বজুড়ে নতুন হিট খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। নিয়মিত সিরিজ “বিফ”, “দ্য নাইট এজেন্ট” ও “অ্যাভাটার: দ্য লাস্ট এয়ারবেন্ডার”-এর সর্বশেষ মৌসুমগুলোতে দর্শক উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ বছরের গ্রীষ্মে কোনো সিনেমাই বড় হিট হয়নি, অথচ গত গ্রীষ্মে “কেপপ ডেমন হান্টার্স” ও “হ্যাপি গিলমোর ২” মাতিয়ে রেখেছিল।
ইউটিউবের কাছে পিছিয়ে
নিলসেনের হিসাবে জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে টেলিভিশন দেখার মোট সময়ের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল নেটফ্লিক্সের দখলে, যা আগের বছরের চেয়ে পুরো এক শতাংশ পয়েন্ট কম। অন্যদিকে ইউটিউবের অংশ ১৪ শতাংশের বেশি। ডিজনির স্ট্রিমিং সেবার অংশ ৪ দশমিক ৭ শতাংশ আর প্রাইম ভিডিওর ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে এমি পুরস্কারে নেটফ্লিক্স পেয়েছে মাত্র ১৬টি, যা অ্যাপল টিভি ও এইচবিও ম্যাক্সের চেয়ে অনেক কম। অথচ ২০১৬ সালের তুলনায় এখন তারা কনটেন্টের পেছনে তিন গুণেরও বেশি অর্থ খরচ করছে। এ বছর জনপ্রিয় নির্মাতারাও প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যাচ্ছেন। “স্ট্রেঞ্জার থিংস”-এর নির্মাতা ডাফার ভাইয়েরা গত বছর প্যারামাউন্টে চলে গেছেন। শন লেভি গত মাসে ডিজনিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ডেভিড ফিঞ্চার চুক্তি নবায়ন করেননি, আর নোয়াহ বাউমব্যাক গেছেন ওয়ার্নার ব্রাদার্সে।
ওয়ার্নার ব্রাদার্স কেনার ব্যর্থ চেষ্টা
গত বছর ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির স্টুডিও ও স্ট্রিমিং ব্যবসা কিনতে ৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি খরচের প্রস্তাব দিয়েছিল নেটফ্লিক্স। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে, নিজেদের শক্তিতে হিট বানানোর যে দাবি এতদিন করা হতো, তা কতটা সত্য। সারান্ডোস বহু বছর বলে এসেছেন, তাঁরা নির্মাতা, ক্রেতা নন। অথচ ওই চুক্তির সময় তিনি নিজেই মেনে নেন, তাঁদের নতুন প্রকল্পের ভান্ডার বেশ সীমিত।
শেষ পর্যন্ত প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের কাছে হেরে যায় নেটফ্লিক্স। সারান্ডোস গত মাসে এক সম্মেলনে বলেছেন, এই চুক্তির চেষ্টা বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যবসার গল্পটাই এলোমেলো করে দিয়েছে। তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই।
দেখার সময়ের হিসাব নিয়ে বিতর্ক
নেটফ্লিক্স সম্প্রতি গ্রাহকসংখ্যার বদলে প্রতিটি ব্যবহারকারী কতটা সময় কাটাচ্ছেন, সেই তথ্য প্রকাশ শুরু করেছে। এমন তথ্য প্রকাশ করে এমন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম খুবই কম। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ একে প্রতিষ্ঠানের নিজের ডেকে আনা সমস্যা বলছেন, কারণ এতে প্রতিটি শো ও সিনেমার দর্শকসংখ্যা আগের চেয়ে কম দেখাচ্ছে।
নতুন কর্তা পিটার রাইস কে
তিন দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে নেটফ্লিক্সে আসছেন পিটার রাইস। তিনি প্রযোজক ছিলেন, ফক্স সার্চলাইটের মতো ফিল্ম স্টুডিও চালিয়েছেন, আবার ডিজনির বিশাল টেলিভিশন বিভাগও সামলেছেন। তাঁর সময়েই “লিটল মিস সানশাইন”, “জুনো” ও অস্কারজয়ী “স্লামডগ মিলিয়নেয়ার”-এর মতো সাফল্য এসেছে। পরিচালকড্যানি বয়েল তাঁকে সবচেয়ে ভালো নির্বাহী বলে প্রশংসা করেছেন। সারান্ডোস কর্মীদের পাঠানো বার্তায় বলেছেন, এই পরিবর্তন বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের কনটেন্ট তালিকাকে পরের ধাপে নেওয়ার সুযোগ এনে দেবে।












