গর্জন বাংলাদেশের পাহাড়ি বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোর একটি (বৈজ্ঞানিক নাম Dipterocarpus turbinatus, ইংরেজিতে Garjan বা Gurjun)। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের বনে গাছটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। এর কাঠ রেলের স্লিপার, নৌকা আর প্লাইউডে কাজে লাগে। গাছের গা থেকে মেলে আঠালো রজন, যা গর্জন তেল নামে পরিচিত।
তবে বন উজাড় আর নতুন চারা না গজানোয় গাছটি এখন হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন গর্জনকে হুমকিগ্রস্ত প্রজাতির তালিকায় রেখেছে। কোথায় এই গাছ পাওয়া যায়, কীভাবে চিনবেন আর কেন এটি এত দামি, তা নিয়েই এই লেখা।
গর্জন গাছ কী
গর্জন ডিপটেরোকার্প পরিবারের একটি বড় গাছ। এই পরিবারের গাছগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনে বেশি দেখা যায়। আমাদের পরিচিত শাল গাছও একই পরিবারের সদস্য। শাল আর গর্জন দুটিই একসময় দেশের প্রাকৃতিক বনের প্রধান গাছ ছিল। পূর্ণবয়স্ক গর্জন গাছ প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। মানে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ তলা ভবনের সমান।
গাছের কাণ্ড লম্বা, সোজা আর গোলাকার। নিচের দিকে সাধারণত ডালপালা থাকে না। ডাল আর পাতা মূলত মাথার দিকে ছড়িয়ে থাকে। এ কারণে দূর থেকে গর্জন বনকে লম্বা খুঁটির সারির মতো দেখায়।
বাংলাদেশে গর্জন নামে একাধিক প্রজাতির গাছ পরিচিত। Dipterocarpus turbinatus প্রজাতিটিকে অনেক জায়গায় তেলিয়া গর্জন বলা হয়। কোথাও কোথাও একে তেলি, ধুলিয়া বা কালি গর্জন নামেও ডাকা হয়। একই পরিবারের আরও কয়েকটি গর্জন প্রজাতি দেশের পাহাড়ি বনে আছে।
কোথায় জন্মায়
বাংলাদেশে গর্জনের মূল ঘর দক্ষিণ-পূর্ব আর উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি বন। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-বান্দরবান-খাগড়াছড়ি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার আর সিলেট অঞ্চলের বনে গাছটি জন্মায়। ভেজা চিরসবুজ ও আধা চিরসবুজ পাহাড়ি বন এর প্রিয় জায়গা।
কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশের অন্যতম পরিচিত গর্জন বন। সেখানে গবেষকরা জরিপ করে দেখেছেন, বনের গাছগুলোর মধ্যে গর্জনই সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রজাতি। কক্সবাজারের উত্তরের এই বন দেশের শেষ টিকে থাকা ক্রান্তীয় বনের অংশ।
বাংলাদেশের বাইরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশেও গর্জন জন্মায়। গাছটি অনেক বৃষ্টি পায় এমন এলাকায় ভালো বাড়ে। সমতল জমির এঁটেল মাটিতে যেমন হয়, তেমনি পাহাড়ের বেলে-দোআঁশ মাটিতেও টিকে থাকে।
চেনার উপায়
গর্জন চেনার প্রথম চিহ্ন এর উচ্চতা আর সোজা কাণ্ড। আশপাশের অনেক গাছের মাথা ছাড়িয়ে এটি ওপরে উঠে যায়। বাকল ধূসর রঙের।
দ্বিতীয় চিহ্ন হলো আঠা। কাণ্ডে কাটা বা আঁচড় লাগলে সেখান থেকে ঘন, আঠালো রস বের হয়। এই রসই গর্জন তেল বা রজন।
তৃতীয় চিহ্ন পাতা। এই গাছ চিনতে তাই চোখ রাখতে হয় ওপরের দিকে। গর্জনের পাতা বড়, চওড়া আর উজ্জ্বল সবুজ। গাছের মাথায় ঘন হয়ে থাকা এই পাতা দূর থেকেও চোখে পড়ে।
চতুর্থ চিহ্ন ফল। গর্জনের ফল শক্ত বাদামের মতো, সঙ্গে ডানার মতো অংশ থাকে। বর্ষার শুরুর দিকে, মোটামুটি মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ফল পেকে মাটিতে পড়ে। তাজা বীজ থেকেই নতুন চারা হয়।
কাঠ ও তেল কেন দামি
গর্জনের কাঠ লালচে থেকে গাঢ় বাদামি রঙের এবং বেশ শক্ত। বাংলাদেশ রেলওয়ের স্লিপার তৈরিতে এই কাঠ ব্যবহারের কথা জানা যায়। নৌকা, ঘরের কড়িকাঠ, তক্তা আর আসবাবেও গর্জন কাঠ কাজে লাগে।
প্লাইউড ও ভিনিয়ার শিল্পে গর্জন কাঠের কদর আছে। বোর্ডের ওপর পাতলা আবরণ দিতে এই কাঠ ব্যবহার হয়। তবে খোলা জায়গায় রোদ-বৃষ্টিতে রাখলে এই কাঠ বেশি দিন টেকে না। তাই রেলের স্লিপার বা বিদ্যুতের খুঁটির মতো বাইরের কাজে ব্যবহারের আগে কাঠ রাসায়নিকভাবে শোধন করে নিতে হয়। ঠিকমতো শোধন করলে কাঠটি অনেক বেশি দিন কাজে লাগে।
গর্জন গাছের রজন বা তেলের ব্যবহারও পুরোনো। এটি দিয়ে বার্নিশ আর ছাপাখানার লিথোগ্রাফি কালি তৈরি হয়। কাঠের ওপর লাগালে পোকামাকড় থেকে কাঠ কিছুটা সুরক্ষা পায়। কাঠের জিনিস টেকসই রাখতে তাই অনেকে এই তেল ব্যবহার করেন।
লোকজ চিকিৎসায় চর্মরোগ বা ক্ষতে গর্জন তেল বাইরে লাগানোর চল আছে। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যায় না। কোনো রোগে এটি ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কেন হুমকির মুখে
গর্জন গাছের সবচেয়ে বড় বিপদ বন উজাড়। অবৈধভাবে গাছ কাটা, বনভূমি দখল আর মাটির ক্ষয়ে গর্জন বন ছোট হয়ে আসছে। বড় বন ভেঙে ছোট ছোট টুকরায় ভাগ হয়ে যাওয়াও একটি সমস্যা।
অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক বন কেটে দ্রুত বাড়ে এমন বিদেশি গাছ লাগানো হয়েছে। ইউক্যালিপটাস আর আকাশমণির মতো গাছের বাগান দেশি গর্জনের জায়গা দখল করছে। বন গবেষকরা একে দেশি গর্জনের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করেন।
আরেকটি সমস্যা হলো নতুন চারা কম গজানো। ফাঁসিয়াখালীর জরিপে দেখা গেছে, বড় ও মাঝারি গাছ থাকলেও ছোট চারার সংখ্যা খুব কম। গরু-ছাগল চরানো, দখল আর বৃষ্টির ঘাটতিকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। বনের নিচের ঝোপঝাড় কমে গেলে মাটি শুকিয়ে যায়, তাতে বীজ থেকে চারা গজাতে সমস্যা হয়।
গর্জন শুধু কাঠের গাছ নয়। এসব বনের প্রধান গাছ হিসেবে এটিই বনের ছায়া আর ভেতরের পরিবেশ গড়ে তোলে। তাই গর্জন হারালে পুরো বনের চেহারাই বদলে যায়।
গবেষকদের পরামর্শ হলো, গর্জনকে কেন্দ্র করে বন সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা। স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে চারা লাগানো আর বন পাহারার ব্যবস্থা করলে এই গাছ টিকিয়ে রাখা সহজ হবে।
বাংলাদেশে গর্জন দেখবেন কোথায়
কক্সবাজার অঞ্চলের সংরক্ষিত বনগুলোতে এখনো বড় বড় গর্জন গাছ দেখা যায়। ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য তার মধ্যে অন্যতম। পার্বত্য চট্টগ্রাম আর সিলেটের পাহাড়ি বনেও গর্জন আছে।
বনে গেলে গাছের গায়ে কাটাছেঁড়া বা আগুন দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। সংরক্ষিত বনে প্রবেশের আগে বন বিভাগের নিয়ম জেনে নিন। বড় গাছের ছবি তুলুন, কিন্তু বীজ বা চারা তুলে আনবেন না। ঝরে পড়া বীজ থেকেই বনের ভবিষ্যৎ গাছ জন্মায়।
সাধারণ প্রশ্ন
গর্জন গাছ কত বড় হয়?
পূর্ণবয়স্ক গর্জন গাছ প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড সোজা ও লম্বা হয়, ডালপালা থাকে মাথার দিকে।
গর্জন গাছ কোথায় পাওয়া যায়?
বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের পাহাড়ি বনে গর্জন জন্মায়। কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্য পরিচিত গর্জন বন।
গর্জন তেল কী কাজে লাগে?
গর্জন গাছের রজন বা তেল দিয়ে বার্নিশ ও ছাপার কালি তৈরি হয়। কাঠে লাগালে পোকামাকড় থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
গর্জন গাছের বৈজ্ঞানিক নাম কী?
গর্জনের বৈজ্ঞানিক নাম Dipterocarpus turbinatus। এটি ডিপটেরোকার্প পরিবারের গাছ। দেশে একে তেলিয়া গর্জন নামেও ডাকা হয়।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬












