ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত সৃজনশীল রান্না, আধুনিক রেস্তোরাঁ এবং জটিল স্বাদের খাবারের জন্য। কিন্তু শহরটির খাদ্যপ্রেমীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে একেবারে সাধারণ একটি খাবার: রুটি, মাখন আর এক টুকরা শক্ত পনির। উপকরণ মাত্র তিনটি হলেও এই খাবার নিখুঁতভাবে তৈরি করতে শহরের নামী বেকারিগুলোর মধ্যে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা।
খাবারটির ড্যানিশ নাম ‘বোল্লে মেড ওস্ত’, যার অর্থ পনিরসহ বান। সংক্ষেপে একে বলা হয় ‘বিএমও’। চলতি বছর ডেনমার্কের বৃহত্তম অভিধানেও জায়গা পেয়েছে এই সংক্ষিপ্ত নাম। সাধারণ পারিবারিক খাবার থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে এটি।
সাধারণ খাবারেই নিখুঁত স্বাদের পরীক্ষা
বিএমও দেখতে অনেকটা স্যান্ডউইচের মতো হলেও স্থানীয়দের কাছে এটি খাওয়ারও রয়েছে নিজস্ব রীতি। রুটির দুই অংশ জোড়া দিয়ে স্যান্ডউইচ বানানোর বদলে সাধারণত খোলা অবস্থায় রুটির ওপর মাখন ও পনির রেখে খাওয়া হয়। ডেনমার্কের ঐতিহ্যবাহী খোলা স্যান্ডউইচের তুলনায় এটি আরও সরল। এখানে বাহারি উপকরণ বা জটিল পরিবেশনার চেয়ে গুরুত্ব পায় রুটি, মাখন ও পনিরের নিজস্ব গুণমান।
ডেনিশ খাদ্যপ্রবণতা নিয়ে গবেষণা করেন অ্যান-সোফি লাহমে। তাঁর মতে, এ খাবারে উপকরণের মান আড়াল করার সুযোগ নেই। প্রতিটি উপাদান ভালো না হলে পুরো খাবারের স্বাদে তার প্রভাব পড়ে।

শহরের বেকারিগুলো তাই রুটির ময়দা, গাঁজনের সময়, বাইরের আবরণ এবং পনিরের ধরন নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। কোথাও রুটির ওপর বীজ বা ভুট্টার গুঁড়া ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও পনির কেটে নেওয়া হচ্ছে অর্ডার পাওয়ার পর। মাখন লবণযুক্ত হবে, নাকি বাদামি করে তৈরি করা হবে, সেটিও বিবেচনায় আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা
বিএমওর জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও এটি এখন অবশ্যই চেখে দেখার মতো খাবার। অনেকের ভ্রমণতালিকায় এটি জায়গা করে নিয়েছে ডেনমার্কের পরিচিত এলাচের বান ও দারুচিনির বানের সঙ্গে।
শহরের একটি জনপ্রিয় বেকারি চেইন হার্টের ১৩টি শাখায় প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার বিএমও বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটির সৃজনশীল পরিচালক তালিয়া রিচার্ড-কারভাজাল জানিয়েছেন, সঠিক স্বাদ খুঁজে পেতে তাঁরা নানা ধরনের পনির পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি রুটির বাইরের আবরণকে কাচের টুকরার মতো মচমচে করার চেষ্টা চলছে।
ডেনমার্কের সংবাদপত্র পলিটিকেনও এই প্রবণতাকে গুরুত্ব দিয়ে কোপেনহেগেনের সেরা ৫০টি বিএমওর তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকাটি তৈরি করতে খাদ্যসমালোচক ডেভিড ডিরহোলম প্রায় ৬৫টি বিএমও খেয়েছেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছে দুই হাজার ড্যানিশ ক্রোনারের বেশি, যা প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলারের সমান।
পনিরের সংকটও তৈরি হয়েছিল
বিএমওর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ২০২৪ সালে বিশেষ এক ধরনের ড্যানিশ পনিরের সরবরাহে টান পড়ে। ‘গ্যামেল ক্রনাস’ নামের এই পনির দুই বছরের বেশি সময় পরিপক্ব করা হয়। তখন এর ভেতরে তৈরি হয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মচমচে প্রোটিনের স্ফটিক।

নতুন বেকারিগুলো এই পনিরের চাহিদা বাড়িয়ে দেওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ডেনমার্কের সংবাদমাধ্যমে পরিস্থিতিকে ‘পনির সংকট’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। পনির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরলা ইউনিকার পরিচালক সোফি বিলটোফট-রিসের ভাষ্য অনুযায়ী, চাহিদা সামলানোর বিষয়টি নিয়ে তাঁকে দিনরাত কাজ করতে হয়েছে।
নাম নিয়ে বিতর্ক, খাবারটি সবার
বিএমও নিয়ে উন্মাদনার পাশাপাশি নামটি নিয়েও আপত্তি রয়েছে। কারও মতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খাওয়া সাধারণ খাবারকে নতুন নাম দিয়ে অভিজাত রূপ দেওয়ার প্রবণতা এতে প্রকাশ পায়। ডেনমার্কের প্রভাবশালী খাদ্য উদ্যোক্তা ক্লাউস মেয়ার মনে করেন, রুটি সবার খাবার এবং বিএমওও সবার জন্য। অন্যদিকে, কিছু বেকারি মালিক নামটি নিজেরা ব্যবহার না করলেও গ্রাহকদের পছন্দকে বাধা দেন না।

এখন বিএমওর জনপ্রিয়তা আগের মতো আলোচনার কেন্দ্রে না থাকলেও কোপেনহেগেনের নামী বেকারিগুলোর অন্যতম বিক্রিত খাবার এটি। স্থানীয়দের কাছে খাবারটি শুধু পেট ভরানোর উপায় নয়, ব্যস্ত দিনের মাঝখানে একটু থেমে স্বাদ উপভোগ করার উপলক্ষও।
এ খাবার খাওয়ার রীতিতেও স্থানীয় পরিচয়ের ছাপ রয়েছে। রুটির ওপর মাখন ও পনির রেখে ধীরে ধীরে খাওয়াই তাঁদের পছন্দ। দুই টুকরা রুটি জুড়ে বার্গারের মতো খেলে অনেকেই বুঝে যান, খাদকটি স্থানীয় নন।
কোপেনহেগেনের বিএমও তাই দেখাচ্ছে, খাবারের আকর্ষণ সব সময় জটিল রেসিপিতে থাকে না। কখনো পরিচিত তিনটি উপকরণকেই যত্ন, দক্ষতা ও নিজস্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশেষ করে তোলা যায়।















