মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

রূপের ডালি খেলা (পর্ব-২)

  • Update Time : সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪, ৩.৫৯ পিএম

ইউ. ইয়াকভলেভ

রূপের ডালি খেলা

তখন আমরা ভাবতাম যে কারাভান্নায়া রাস্তায় নিশ্চয় ঠুন-ঠুন ঘন্টি বাজিয়ে যায় ক্লান্ত ধূলি-ধূসর উট, ইতালিয়ানস্কায়া রাস্তায় থাকে কালো-চুল ইতালিয়ানরা, আর চুমকুড়ি সাঁকোতে সবাই চুমু খায়। পরে মিলিয়ে গেছে কারাভান আর ইতালিয়ানরা, রাস্তাগুলোর নাম পর্যন্ত এখন অন্য। অবিশ্যি চুমকুড়ি সাঁকোর নামটা এখনো তাই আছে।

আমাদের পাড়ার আঙিনাটা ছিল পাথরের খোয়ায় বাঁধানো। খোয়া পড়েছিল সমানভাবে নয়, কোথাও উচু কোথাও নিচু। জোর বৃষ্টি হলে নিচু জায়গাগুলো জলে ভরে যেত, উচুগুলো থাকত পাথুরে দ্বীপের মতো। জুতো যাতে না ভেজে তার জন্যে আমরা দ্বীপ থেকে দ্বীপে লাফিয়ে লাফিয়ে আসতাম। তাহলেও বাড়ি পৌঁছতাম ভেজা পায়েই।

বসন্তে আঙিনাটা ভরে উঠত পপুলারের ঝাঁঝালো রজনের গন্ধে, শরতে আপেল। আপেলের গন্ধটা আসত মাটির তলের কুঠরি থেকে, শব্জী জমা থাকত সেখানে। আঙিনাটা আমরা ভারি ভালোবাসতাম। কখনোই একঘেয়ে লাগত না। তাছাড়া অনেক খেলা জানতাম আমরা। খেলতাম লুকোচুরি, ডাংগুলি, বল ছোঁড়া-ছড়ি, ভাঙা টেলিফোন। এসব খেলা আমরা পেয়েছিলাম একটু বড়ো ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিশেবে। কিন্তু আমাদের নিজেদের বানানো খেলাও ছিল। যেমন রূপের ডালি খেলা।

কার মাথা থেকে এটা বেরিয়েছিল জানি না, তবে আমাদের বেশ মনে ধরেছিল। পুরনো পপুলার গাছের দলটা জুটলেই নির্ঘাৎ কেউ না কেউ বলে উঠত:

‘আয় রূপের ডালি খেলি!’

সবাই দাঁড়াতাম গোল হয়ে, ছড়া বলে পর পর গুণে যেতাম কে মাঝখানে দাঁড়াবে:

‘এনা, বেনা, রেস…’

কোন এক দুর্বোধ্য ভাষার এই কথাগুলো ছিল আমাদের ঠোঁটস্থ:

‘কুইন্ডের, কন্তের, জেস!’

কেন জানি আমরা সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিম্ন‌কাকে মাঝখানে দাঁড় করাতে ভালো- বাসতাম, চেষ্টা করতাম যাতে ছড়াটা গিয়ে ঠিক ওর কাছেই শেষ হয়। চোখ নামিয়ে সে তার ফ্রকে হাত বুলাত। আগে থেকেই তার জানা থাকত যে তাকেই মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে রূপসী হয়ে।

এখন আমরা বুঝি যে সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিকা ছিল অসাধারণ অসুন্দর: চওড়া খাঁদা নাক ছিল তার, মোটা মোটা ঠোঁট, তার চারিপাশে আর কপালে রুটির গুড়োর মতো ছলি। বিবর্ণ চোখ। সোজা সোজা অঘন চুল। হাঁটত পা ঘষে ঘষে, পেটটা সামনে এগিয়ে দিয়ে। কিন্তু এসব তখন আমাদের চোখে পড়ত না। যে ন্যায়পর অজ্ঞতায় আমরা তখন ছিলাম তাতে ভালো মানুষকে ধরা হত সুন্দর, খারাপকে অসুন্দর। আর সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিল্কা ছিল গুণী মেয়ে, তাকেই আমরা সমুন্দরী করতাম।

মাঝখানে গিয়ে ও দাঁড়ালেই খেলার নিয়ম অনুসারে আমাদের ‘মৃদ্ধ হতে’ হত প্রত্যেকেই আমরা প্রশংসা করতাম বইয়ে-পড়া কোনো-না-কোনো কথা দিয়ে। কেউ বলত:

‘কী সুন্দর গলা, রাজহাঁসের মতো।’

‘রাজহাঁসের মতো নয়, মরাল গ্রীবা,’ সংশোধন করে দিয়ে আরেকজন খেই টানত, ‘কী সুন্দর প্রবালের মতো ঠোঁট…’

‘কী সুন্দর সোনালী চাঁচর।’

‘চোখ ওর ইয়ে… ইয়ে…’

‘কেবলি তুই ভুলে যাস। সাগরের মতো নীল।’

জাল-জাল করে উঠত নিকা। ফ্যাকাশে মুখে গাঢ় লাল ছোপ। পেটটা গুটিয়ে নিয়ে সে লীলাময়ীর মতো একটা পা এগিয়ে দিত। আমাদের কথাগুলো হয়ে উঠত আয়না, নিনকা তাতে নিজেকে দেখত সত্যিকারের রূপসী।

‘কী সুন্দর চিকন গা।’

‘কী সুন্দর বাঁকা ভুরু।’

‘ওর দাঁত… দাঁত…’

‘জানিস না? মুক্তোর মতো দাঁত!’

আমাদেরও মনে হতে থাকত সবকিছই ওর মরাল, প্রবাল, মুক্তোর মতো। আমাদের নিনকার চেয়ে রূপসী আর কেউ নেই।

তারপর আমাদের উচ্ছ্বাসের ঝুলি ফুরিয়ে গেলে নিনকা কিছু একটা গল্প শোনাত। হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাসে গা কর্তৃকড়ে সে বলত:

‘কাল আমি ভাই চান করছিলাম গরম সাগরে। বেশ রাত হতেই অন্ধকারে জাল- জাল করে উঠল সাগর। আমিও জ্বল-জ্বল করে উঠলাম। আমি ছিলাম একটা মাছ হয়ে… না, মাছ নয়, মৎস্য-কন্যা।’

রূপসীর কি কখনো বলা সাজে যে সে আলুর খোসা ছাড়িয়েছে, অথবা পড়া মুখস্থ করেছে, কিংবা কাপড় কাচতে সাহায্য করেছে মাকে।

কাছেই হুটোপুটি করছিল সব ডলফিন। তারাও জল-জজ্বল করে উঠল।’

এই সময় কেউ হয়ত আর চুপ করে থাকতে পারত না। বলত:

‘যাঃ, বাজে কথা!’

হাত বাড়িয়ে দিত নিনকা।

‘বেশ, শুকে দ্যাখ। গন্ধ পাচ্ছিস?’

‘সাবানের গন্ধ।’

মাথা নাড়ত নিনকা:

‘উ’হা’, সাগরের গন্ধ! চেটে দ্যাখ হাত নোনতা-নোনতা।’

চারিপাশে ঘোলাটে স্যাঁৎসে’তে আবছায়া, বোঝা যায় না বৃষ্টি হচ্ছে কিনা। শুধু শার্সিতে জাগছে আর ফেটে যাচ্ছে বুদ্বুদ। কিন্তু সবাই আমরা টের পেতাম না-থাকা সমুদ্রটা আছে কাছেই উফ, জ্বলজ্বলে, নোনা।

এই ভাবেই খেলতাম আমরা।

বৃষ্টি নামলে জুটতাম ফটকের তলে। অন্ধকার হয়ে গেলে ভিড়তাম ল্যাম্পপোস্টের কাছে। এমনকি কড়া শীতও আমাদের হঠাতে পারত না আঙিনা থেকে।

একবার নতুন বাসিন্দা এল পাড়ায়। আঙিনায় দেখা দিল নতুন একটি ছেলে। চ্যাঙামতো, হাঁটত একটু কাজো হয়ে, যেন দেখাতে চাইত যে তত ঢ্যাঙা নয়। গালে তার একটা বড়ো লম্বাটে তিল, সেটার জন্যে লজ্জা হত তার, কথা বলার সময় অন্য গালটা ফিরিয়ে রাখত আমাদের দিকে। নাকটা তরতরে, একেবারে মেয়েলী বড়ো বড়ো চোখের রোঁয়া। চোখের রোঁয়ার জন্যেও সঙ্কোচ ছিল তার।

আমাদের থেকে দূরে দূরে থাকত নতুন ছেলেটা। আমরা ওকে রূপের ডালি খেলতে ডাকি। জানত না খেলাটা কী, রাজী হয়ে যায়। চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে আমরা ঠিক করে নিলাম রূপসী করব… ওকেই। মরাল গ্রীবা আর প্রবাল ঠোঁটের কথা বলতে-না-বলতেই ও ভয়ানক লাল হয়ে পালিয়ে গেল খেলা ছেড়ে।

হেসে উঠে আমরা চে’চালাম:

‘তোকে ছাড়াই আমরা খেলব!’

কিন্তু ফের যখন গোল হয়ে দাঁড়ালাম, হঠাৎ নিনকা পেছিয়ে এল:

‘আমিও খেলব না…’

হৈ-হৈ করে উঠলাম আমরা:

‘এ আবার কী কথা? কেন খেলবি না?’

‘এমনি,’ আমাদের কাছ থেকে চলে গেল নিনকা।

সঙ্গে সঙ্গেই খেলার সাধ উবে গেল আমাদের। বিচ্ছিরি লাগল। আর নিনকা নতুন ছেলেটার কাছে গিয়ে বললে:

‘রূপের ডালি খেলার সময় কেবলি আমায় বাছে।’

‘তোকে? কিন্তু তোকে কেন?’ অবাক হল ছেলেটা, ‘তুই কি রূপসী নাকি?’

ছেলেটার সঙ্গে আমরা তক’ করলাম না। শুধু হাসাহাসি করলাম ওর উদ্দেশে। আর নিনকার মুখখানা কেমন বসে গেল, মুখ আর কপালের ছলিগুলো হয়ে উঠল আরো কটকটে।

‘কিন্তু আমাকেই বাছে।’

‘খুবই খারাপ করে,’ বললে ছেলেটা, ‘তাছাড়া তোদের এই সব ছেলেমানুষী খেলায় আমার আদপেই কোনো শখ নেই।’

‘বটেই তো।’ কেন জানি চট করেই তার কথায় সায় দিলে নিনকা।

নতুন ছেলেটা দেখা দেবার পর থেকে কেমন অদ্ভুত হয়ে উঠল সে। যেমন,,

রাস্তায় ছেলেটার পেছ-পেছ যেত সে। যেত চুপি-চুপি, রাস্তার অন্য ধার দিয়ে, যাতে কারো চোখে না পড়ে। তবে আমাদের চোখে পড়েছিল বৈকি। ভাবলাম নিনকার মাথা খারাপ হয়েছে, অথবা কিছু একটা খেলছে। হয়ত গোয়েন্দা-গোয়েন্দা খেলা। ছেলেটা যেত রুটির দোকানে, ও দাঁড়িয়ে থাকত উল্টো দিকে, দরজার শার্সি থেকে চোখ সরাত না। সকালেও সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত ওর জন্যে, ইশকুল পর্যন্ত যেত তার পেছ-পেছ।

নতুন ছেলেটা প্রথমে টের পায় নি যে সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা তার পেছ- পেছ ফেরে ছায়ার মতো। যখন ধরতে পারল, ভারি চটে গেল সে। ধমক দিলে: ‘খবরদার, পেছ-পেছ আসবি না বলছি!’

কোনো জবাব দিলে না নিনকা। ফ্যাকাশে মেরে চলে গেল। আর ছেলেটা তার উদ্দেশে চ্যাঁচালে:

আয়নায় বরং নিজের মুখখানা একবার দ্যাখ গে যা!’

আয়নায় মুখ দেখতে বললে সে। অথচ কেমন আমাদের নাক, মুখে, থুতনি, কোথায় উ’চিয়ে উঠেছে চুল, রণ বেরিয়েছে এসব জানার কোনো আগ্রহই আমাদের ছিল না। নিনকাও শুধু একটা আয়নাই জানত, রূপের ডালি খেলার সময় যে-আয়না হতাম আমরা। বিশ্বাস করত সে আমাদের। আর গালে তিল-ওয়ালা এই ছোঁড়াটা কিনা ভেঙে দিল আমাদের আয়নাটা। হাসিখুশি, মায়াময়, জীবন্ত আয়নার বদলে দেখা দিল ঠান্ডা, মসৃণ, নিষ্করুণ একটা জিনিস। জীবনে এই প্রথম তাতে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখল নিনকা রূপসীকে খুন করলে আয়না। যতবারই আয়নার কাছে গেছে নিনকা, ততবারই কী একটা যেন মরে গেছে তার ভেতর। অদৃশ্য হল মরাল গ্রীবা, প্রবাল দাঁত, সাগর-নীল চোখ।

তখন কিন্তু সেটা আমরা বুঝি নি। মাথা কুটে মরতাম আমরা কী হল ওর?

নিজেদের সইকে আমরা চিনতেই পারতাম না। কেমন পর-পর, দুর্বোধ্য হয়ে উঠল সে। আমরা সরে গেলাম ওর কাছ থেকে। সেও আসতে চাইত না আমাদের কাছে, নীরবে চলে যেত পাশ কাটিয়ে। আর গালে মন্ত তিল-ওয়ালা নতুন ছেলেটা সামনে পড়লে সে প্রায় ছুটেই পালাত।

আমাদের শহরে বৃষ্টি নামে প্রায়ই। কখনো কখনো সারা দিন-রাত ধরে। সবাই তাতে এত অভ্যন্ত যে ভ্রুক্ষেপও করে না। বড়োরা ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটে। ছোটোরা এক-একটা ছুট দিয়ে যায় ফটকের এক খিলান থেকে আরেক খিলানে, লাফিয়ে যায়

আঙিনার একটা পাথুরে দ্বীপ থেকে আরেকটায়।

জোর বৃষ্টি নেমেছিল সে সন্ধ্যায়। বইছিল হাড়-কাঁপানে বাতাস। লোকে বললে, শহরের কাছাকাছি কোথায় বান ডেকেছে। তাহলেও ফটকের খিলানের নিচে আমরা রইলাম ঘে’ষাঘেষি করে, বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হচ্ছিল না। সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা কিন্তু দাঁড়িয়ে রইল নতুন ছেলেটার জানলার নিচে। ওখানে ওর দাঁড়িয়ে থাকার দরকার পড়ল কেন? ছেলেটার ওপর কি ও একচোট নেবে ভাবছে? নাকি ঠিক করেছে মনে মনে এক হাজার অবধি না গোনা পর্যন্ত বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকবে? অথবা দুই হাজার। পরনে তার অনেক আগেই খাটো-হয়ে-যাওয়া একটা কোট, মাথায় ওড়না নেই। সোজা সোজা চুলগুলো ভিজে লেপটে গেছে গালের সঙ্গে, তাতে লম্বা দেখাচ্ছে মুখখানা। জমে-যাওয়া দু’বিন্দু জলের মতো জজ্বল-জ্বল করছে চোখ। কম-কম করছে জল নামার পাইপগুলো, চড়বড় শব্দ হচ্ছে জানলায়, ক্যাঁচ-ক্যাঁচ করছে ছাতার

চাঁদোয়া। কিন্তু কিছুই দেখছে না নিনকা, কিছুই শুনছে না। টেরও পাচ্ছে না জলের ঠান্ডা ছাট। কী একটা মরিয়া সংকল্পে তন্ময় হয়ে সে দাঁড়িয়েই রইল জানলার নিচে।

ফটক থেকে আমরা ডাকলাম তাকে:

‘নিনকা, এখানে চলে আয়! নিনকা!’

এল না সে। বৃষ্টির মধ্যে আমরাই ছুটে এসে তার হাত ধরলাম: মারা পড়বে যে!

‘চলে যা বলছি!’ স্রেফ খে’কিয়েই উঠল আমাদের ওপর।

চলে এলাম আমরা। ওর দিকে পেছন ফিরে দেখতে লাগলাম রাস্তা। ছাতা মাথায় দিয়ে তাড়াতাড়ি করে হাঁটছে লোকে। মনে হয় যেন ভয়ঙ্কর সব কালো কালো প্যারাশুটে পুরো একদল সৈন্য নেমেছে শহরে।

পরে আমাদের চোখে পড়ল নিনকার মা এসেছে তার কাছে। অনেকখন ধরে মা তাকে চলে আসার জন্যে বোঝালে। শেষ পর্যন্ত তাকে বৃষ্টি থেকে নিয়ে গেল সদর দরজায়। মিটমিটে আলো জ্বলছিল। তার দিকে মুখ তুললে নিনকার মা, তাকে বলতে শুনলাম:

‘চেয়ে দ্যাখ আমার দিকে। তুই কি ভাবিস, আমি সুন্দরী?’

অবাক হয়ে নিনকা তাকালে মায়ের দিকে, আর নিশ্চয় কিছুই সে দেখতে পেলে না।

মা কি কখনো সুন্দরী হতে পারে, কিংবা অসুন্দরী?

‘জানি না,’ কবুল করলে নিনকা।

‘এত দিনে তোর জানা উচিত ছিল,’ রূঢ়ভাবে বললে নিনকার মা, ‘আমি মোটেই সুন্দরী নই, স্রেফ কুৎসিত।’ ‘না, না!’ বলে উঠল নিনকা।

মায়ের গা ঘে’ষে দাঁড়িয়ে সে কোঁদে ফেললে। আমরা বুঝতে পারলাম না কার জন্যে ওর কষ্ট, মায়ের জন্যে না নিজের জন্যে।

‘সেটা কী এমন ভয়ঙ্কর ব্যাপার? কিছুই না,’ এবার শান্ত গলায় বললে নিনকার মা, ‘কেবল সুন্দরীরাই সুখী হয় এমন নয়। অসুন্দরীরও বিয়ে হয়।’

‘বিয়ে আমি করব না।’ রেগে জবাব দিলে নিনকা। এ ব্যাপারে আমরাও ওর সঙ্গে একমত।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে তো বটেই,’ যেন সচেতন হয়ে উঠল মা, ‘বিয়ে করতেই হবে এমন কাঁ কথা আছে…’

তারপর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ওরা চলে গেল রাস্তার দিকে। নিজেরা কোনো বলা- কওয়া না করেই আমরাও পিছু নিলাম, কৌতূহলের বশে আর কি। না, আমাদের মনে হল আমাদের হয়ত দরকার পড়বে নিনকার।

হঠাৎ আমাদের কানে এল নিনকা জিজ্ঞেস করছে:

‘তোমার বর ছিল?’

‘না।’

‘কিন্তু আমার বাবা তো কেউ ছিল?’

মা জবাব দিলে না। যেন তার কানেই যায় নি প্রশ্নটা। রেগে গিয়ে নিনকা বেশ রূঢ়ভাবেই বললে:

‘বলতে চাও আমায় বকের কাছ থেকে পেয়েছ?’

‘হ্যাঁ রে,’ চাপা ফিস ফিস করলে মা, ‘বক উড়ে এল তোকে নিয়ে। তারপর উড়ে গেল। তুই রয়ে গেলি।’

যাচ্ছিল তারা অন্ধকার গলি দিয়ে, ছাতা ছিল না। কিন্তু কিছুই যেন তাতে এসে যায় না ওদের। বৃষ্টি পড়ছে, পড়ুক। অথচ ভেজা ঠান্ডায় কাঁপছিলাম আমরা।

‘তার মানে বক আমার বাবা?’ সামান্য হেসে বললে নিনকা, ‘চমৎকার! আমি যখন মাস্টারনী হব, তখন আমায় লোকে ডাকবে নিনা বক-কন্যা। কে জানে, ডানাও গজাতে পারে আমার। তুমি যদি আমায় বাঁধাকপির মধ্যে কুড়িয়ে পেতে, তাহলে কত খারাপ হত দ্যাখো তো।’

‘হাসি রাখ,’ মা বললে।

‘মোটেই আমি হাসছি না।’ সত্যিই তখন আর হাসছিল না নিনকা, গলা ওর কাঁপছিল, ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। ‘কিন্তু কোথায় সে… বক?’

মা মুখ ঘুরিয়ে বৃষ্টির জল মুছে নিলে গাল থেকে।

‘সেও দেখতে কুৎসিত ছিল?’

নিনকা থেমে গিয়ে জোরে মায়ের বাহপাশ চেপে ধরে তাকালে তার মুখের দিকে। এমনভাবে সে মায়ের দিকে দেখছিল যেন কী একটা ভুল হয়ে গেছে, তার পাশে-পাশে যে হাঁটছে সে যেন তার মা নয়, অচেনা কোনো মেয়ে। মাকে যেন সে দেখছে এক ঠান্ডা নিষ্করুণ আয়নায়। ঠিক সে যেমনটি, তেমনি। বাড়ির অন্ধকার দেয়াল ঘে’যে আমরা, পরের ছেলেমেয়েরা তাকে যেমন দেখছি। ওদের কাছ থেকে আমরা এত কাছে ছিলাম যে সাবান আর জীর্ণ পোষাকের গন্ধ পর্যন্ত টের পাচ্ছিলাম। আর আমাছের না দেখলেও সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা যেন আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়েই একেবারেই অন্যরকম গলায় শান্তভাবে বললে:

‘এসো মা, তোমার সঙ্গে রূপের ডালি খেলা খেলি।’

‘ঢঙ রাখ!’

‘না, না, মা, এসো খেলি। আমি তোমায় শিখিয়ে দেব। তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনো আমি যা বলছি।’

আরো জোরে সে মায়ের হাত চেপে ধরে আস্তে-আন্তে শুধু ঠোঁট দিয়েই আমাদের খেলার সেই কথাগুলো বলতে লাগল, নতুন ছেলেটা আসার আগে যা আমরা তাকে শোনাতাম:

‘মা, তোমার কী সুন্দর মরাল গ্রীবা, বড়ো বড়ো চোখ তোমার সাগরের মতো নীল। কী সুন্দর তোমার লম্বা সোনালী চুল, প্রবালের মতো ঠোঁট….

অদৃশ্য মেঘ থেকে অঝোরে বৃষ্টি নামল। পায়ের তলে জেগে উঠল তুহিন সমুদ্র। শহরের সবকিছু লোহা আর টিন বাজছিল কম-ঝম শব্দে। কিন্তু বাতাসের গর্জন, শেষ হেমন্তের কনকনে শীত আর অন্ধকার ভেদ করে জীবন্ত উষ্ণ ধারায় বয়ে চলল দুঃখ-হরা কথার স্রোত:

‘কী সুন্দর তোমার চিকন গা… বাঁকা ভুরু… মুক্তোর মতো দাঁত…’

গায়ে গা ঘে’ষে তারা এগিয়ে চলল সামনে। কথা আর কিছু বলছিল না। তারা তখন শান্ত হয়ে এসেছে। আমাদের বানানো খেলায় উপকার হয়েছে ওদের। এনা, বেনা, রেস… এর ওর আস্তিন ধরে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম দেয়াল ঘেষে, চেয়ে রইলাম অন্ধকার কুহেলীতে তারা মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত। কুইন্ডের, কন্তের, জেস…

সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা মারা যায় ১৯৪২ সালে ম্ঙ্গার কাছে ফ্রন্টে। নার্স ছিল সে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024