বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

পণ্ডশ্রম

  • Update Time : শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০২৪, ৯.০০ পিএম

আবু ইসহাক

আলমারির নাভিতালায় চাবি ঢুকাই। কিন্তু সবটা ঢুকছে না যে। জোরে চাপ দিতেই কি যেন ভেদ করে চাবি ঢোকে, টের পাই। কিন্তু এবার আবার চাবি ঘুরছে না। জং ধরে গেছে বোধ হয় তালায়। দারোয়ান কেরোসিন তেল নিয়ে আসে। তেল দিয়ে কিছুক্ষণ রাখার পর চাবি ঘোরে। আলমারির কবাট খুলে দেখি, ভিতরে নাভিতালা জুড়ে এক কুমোরে পোকার বাসা। ওহ্ হো, এ জন্যেই চাবি ঢুকছিল না।

আমাদের ক্লাব-লাইব্রেরি আলমারি। ইংরেজি গল্প-উপন্যাস কেউ পড়ে বলে মনে হয় না। বহুদিন না খোলার দরুন তালার ফুটো দিয়ে কুমোরে পোকা ঢুকে নির্ভাবনায় বাসা বেঁধেছিল।

ইংরেজি গল্প-উপন্যাস কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব যখন ঘাড়ে নিয়েছি তখন বই-পুস্তকের যত্ন আমাকে নিতেই হবে। বইগুলো ঝেড়ে মুছে ডি-ডি-টি গুড়ো ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে দারোয়ানকে নির্দেশ দিই।

বাঙলা গল্প-উপন্যাস ভালো হোক, মন্দ হোক, লোকে দেদার পড়ে। দু’দিন আলমারিতে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু ইংরেজি গল্প-উপন্যাস পড়ে না কেন লোকে। উত্তর পাই কবির ভাষায়:

‘নানান দেশের নানান ভাষা বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা?’

একমাত্র স্বদেশী ভাষায়ই মানুষের আশা পূর্ণ হয় এ আমি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি। কারণ বিদেশী ভাষা অনেকবার আমার আশা ভঙ্গ করেছে।

একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়- সে অনেক দিন আগের কথা। বিশ টাকা মাইনের একটা চাকরির জন্যে তখন হাজার গ্রাজুয়েট লাইন ধরত। চাকরির সেই দুর্ভিক্ষের বাজারে কলেজের পাঠ চুকিয়ে কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখছি আর দরখাস্ত পাঠাচ্ছি সরকারী-বেসরকারী অফিসে, যেখানে গিয়ে লাগে। কিন্তু লাগল না। হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে থাকতে অনেক দিন পরে একটা ‘ইন্টারভিউ কার্ড’ পেলাম। স্যুট-টাই ধার করে সায়েব সেজে ‘স্মিথ এন্ড কোহেন লিমিটেড’-এর অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। সিলেকশান বোর্ডে তিন জন খাস বিলেতী সায়েব। যথাসম্ভব চটপটে হওয়ার চেষ্টা করে ভেতরে ঢুকলাম। -গুড মর্নিং স্যার।

আমার অভিবাদনের প্রত্যুত্তরে ‘মর্নিং’ বলে একজন সায়েব কি যে জিজ্ঞেস করলেন, বুঝতে পারলাম না। এ কি ইংরেজি ভাষা। কিন্তু স্কুল-কলেজে যাদের কাছে ইংরেজি শিখেছি, তাঁদের মুখে এ রকম ইংরেজি তো কখনও শুনি নি।

বুঝতে না পেরে বললাম, বেগ ইত্তর পার্জন?

আবার বললেন, কিন্তু মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না।

-পার্জন?

এবার আর একজন বললেন একটু গলা চড়িয়ে। কিন্তু সেই ‘হটিটিফটিশটিও

বুঝতে পারলাম না।

এবার আর অন্যজন বললেন। কিন্তু কত আর মাপ চাওয়া যায়। এ বার চুপ করে অসহায়ের মত হা করে তাকিয়ে আছি। ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ গোছের অবস্থা আমার।

-টুমি ইংলি জানে না। টুমিকে হামাডের ডারকার আছে নাই। টুমি যেটে পারে। বেরিয়ে বাঁচলাম। রীতিমত ঘাম দিয়েছিল আমাকে। আমার অবস্থা শুনে অনেকেই হয়তো হাসবেন। কিন্তু আমার মত অবস্থা আরো অনেকেরই হয়েছে, তাদের নিজেদের মুখে শুনেছি।

সায়েব যে বললেন, আমি ইংরেজি জানি না, চোদ্দ বছর কি শিখলাম তবে?

এ প্রশ্ন আমার মনে আরো বহুবার জেগেছে এবং এখনো জাগে। এ প্রশ্ন জাগে, যখন ইংরেজিতে চিঠি, দরখাস্ত লিখবার সময় সঠিক ‘প্রিপজিশন’ বসাতে গিয়ে মাথা চুলকাই। এ প্রশ্ন জাগে, যখন ইংরেজি উপন্যাস পড়তে গিয়ে অচেনা শব্দের জন্যে বার বার অভিধান হাতড়ে হয়রান হই। এ প্রশ্ন জাগে, যখন ইংরেজি ছবি দেখতে গিয়ে সংলাপের বারো আনাই বুঝি না এবং দর্শক সায়েব-মেম ও তাদের ছেলে-মেয়েদের হাসির রোল শুনে হাসির কারণ খুঁজে ব্যর্থ হই।

চোদ্দ বছর ধরে মাতৃভাষার চেয়ে অন্তত চারগুণ সময় আর শ্রম খরচ করেছি ইংরেজি শিখতে। তারপর আরো ষোল বছর ধরে ইংরেজির মাধ্যমে অফিসে কাজ করে যাচ্ছি। এত করেও ইংরেজি ভালো রপ্ত হয়নি-স্পষ্ট বুঝতে পারি। আরো বুঝতে পারি- বিদেশী ভাষা মাতৃভাষার মত সোজাসুজি বোধগম্য হয় না। মাতৃভাষায় তর্জমা হয়ে তারপর বোধগম্য হয়। অর্থাৎ টাডি সুপারীর মত জাঁতির জাঁতা খেয়ে তারপর দাঁতের তলায় যায়। বিদেশী ভাষার কথন-পঠনে যিনি যত বেশি অভ্যস্ত, তার মগজের মধ্যে তর্জমার প্রক্রিয়াটাও হয় তত তাড়াতাড়ি।

ইংরেজি ভাষায় এই যে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করছি, এতে এতটুকু লজ্জা আমার নেই। কারণ মানুষ স্বীকার করে কখন? ধিক্কার আসে যখন। বিদেশী ভাষার বোঝা মাথায় নিয়ে হোঁচট খেয়ে খেয়ে ধিক্কার এসে গেছে।

অনেকের বোধ হয় এ ধিক্কার আসেনি। চোখের সামনেই রয়েছেন একজন- আমাদের অফিসের আনসার আলী বি.এ.। নামের শেষের ডিগ্রীটা তাঁর এতই প্রিয় যে, এ ডিগ্রী প্রেমের নমুনা তাঁর বাসার নাম-ফলক, চেয়ার, টেবিল, তাক, দোয়াতদানি মায় বদনাটিতে পর্যন্ত জাজ্বল্যমান। আমরাও তাই তাঁর এ প্রেমে কখনো বিচ্ছেদ ঘটাতে চাইনে।

আনসার আলী বি.এ.-র ভাবসাব দেখে মনে হয় তাঁর কাছে ইংরেজি ভাষার বোঝা তাঁর মাথার ফেল্ট হ্যাট্টার চেয়ে ভারী নয়। নামটা মনে পড়তেই ‘ইস্যু রেজিস্টার’ খুলি। আনসার আলী বি. এ.-র নামের পাতাটা বের করে দেখি-এ পর্যও তিনি একখানা ইংরেজি বইও লাইব্রেরি থেকে নেননি। অথচ বাঙলা নাটক, উপন্যাস এমন কি ডিটেকটিভ উপন্যাসও অনেক নিয়ে পড়েছেন। ইংরেজির এত বড় ভক্ত বাঙলা বই পড়েন, এ যে বিশ্বাস করা যায় না।

বেশি নয়, মাস ছয়েক আগের কথা, রেডিওতে রাত পৌনে ন’টার খবর শুনবার জন্য ক্লাবে বসেছিলাম আমরা কয়েক জন। খবর বলা শেষ হলে জাহিদ বলে, যাক, বাঙলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে, প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল।

আনসার আলী বি. এ. ভ্রু কুঁচকান। ভ্রূ কুঁচকাবার কারণ খুঁজতে বিলম্ব হয় না। তিনি নাক সিটকে বলেন, হুঁ হ্, বাঙলা একটা ভাষা, সেটা হবে রাষ্ট্রভাষা।

অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাই। জাহিদ বলে ওঠে, কেন? বাঙলা ভাষা আপনার পছন্দ নয়?

-পছন্দ হবে কি সায়েব? বাঙলা ভাষায় আছেটা কি?

-কি নেই, তাই আগে বলুন?

বঙ্গভাষায় বিজ্ঞানের কোন বই আছে? মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একখানা বইও বাঙলায় বেরিয়েছে এ পর্যন্ত?

-উর্দুতে বেরিয়েছে? জাহিদের পাল্টা প্রশ্ন।

-না, উর্দুর সমর্থন আমি করছি না। আমি ইংরেজির ভক্ত। আনসার আলী বি.এ. বলেন।

-ও বুঝলাম। বাঙলায় ওসব বই নেই স্বীকার করি। কিন্তু এতদিন কেন বাঙলা ভাষায় এসব বই হয় নি, এ-তো খুবই স্পষ্ট। বাঙলা ভাষায় এসব বই হলে সে বই পড়াত কোন বিশ্ববিদ্যালয়? শিক্ষার মাধ্যম বাঙলা হোক, তারপর দেখবেন।

-না, ও কোনদিন হবে না, হতে পারে না। আনসার আলী বি. এ.-র সমর্থনে আনোয়ার বলে।

-হতেই হবে। না হলে এদেশের কোন ভবিষ্যৎ নেই। তর্কে যোগ দিলাম আমিও।

-কেন? আনোয়ার বলে।

-কারণ ইংরেজি ভাষা শিখতেই আমাদের দম ফুরিয়ে যায়। তারপর হাঁপিয়ে-ওঠা দম নিয়ে সমুদ্রের তলায়ও যাওয়া যায় না, মুক্তাও তোলা হয় না। শেওলা কুড়িয়ে ভেসে উঠতে হয়।

-মাহমুদ সায়েব ঠিক বলেছেন। জাহিদ আমাকে সমর্থন করে বলে। মাতৃভাষায় লেখাপড়া করা কত সহজ। কথা বলায় কত স্বস্তি।

-নাহ্, আমার কাছে বরং অস্বস্তি লাগে। আনসার আলী বি. এ. বলেন।

-কি রকম?

-বাঙলা শব্দে এক্সপ্রেশনই হয় না ঠিক মত। এই যে ধরুন Put up কথাটা অফিসে অহরহ ব্যবহার করছি: Put up so and so file. বাঙলায় এর প্রতিশব্দ কি হবে।

-প্রতিশব্দ কি হবে, তা’ আমাদের পণ্ডিতেরা বুঝবেন। পরিভাষা অবিশ্যি তৈরি করে নিতে হবে।

কোণের টেবিল থেকে নূরুল ইসলাম হঠাৎ বলে ওঠে, ‘Put up’ কথাটা শুনে আমার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। নতুন কেরানি। সদ্য ম্যাট্রিক পাশ করে চাকরি পেয়েছে। তার অফিসার বলেন, অমুক ফাইলটা Put up করবেন। তিন-চার দিন পরে অফিসার তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কই আপনি ফাইলটা Put up করলেন নাতো?

-করেছি তো, স্যার!

-কই? না। আমি দেখিনি তো!

-ঐ তো স্যার, ঐ রুমে আলমারির ওপরে পুট আ-প করেছি। সবাই হো-হো করে হেসে ওঠে। আনসার আলী বি.এ.-ও হাসিতে যোগ দেন। তর্কের মোড় ঘুরে যায়। ভুল ইংরেজি বলার গল্প যার তহবিলে যতটা আছে ছাড়তে শুরু করে।

মোবারক বলে, পাড়াগাঁ-র প্রাইমারী ইস্কুলের এক মাষ্টার। ঢাকা এসে তার শহুরে বন্ধুকে বলে, শুনেছি, ভিক্টোরিয়া পার্কে নাকি খুব সস্তায় পুরান কোট পাওয়া যায়। চলো না, দেখে দেবে একটা। শীতে খুব কষ্ট পাচ্ছি।

-কি কোট কিনবে? শহুরে বন্ধু জিজ্ঞেস করে, ওভার কোট?

-না, না, ওভারকোট আবার বেশি লম্বা। ‘পেটিকোট’ হলেই চলবে।

আবার হো-হো হাসি। এ সময়ে দু’জন জাঁদরেল জমিদারের ভুল ইংরেজি বলার সর্বজনবিদিত গল্প মনে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাঁদের একজন কোন ব্রিটিশ রাজপুরুষকে নাকি বলেছিলেন, -I shall eat you, Sir অন্যজনও রোদে ঘুরে-আসা কোন শ্বেতাঙ্গ অফিসারকে বলেছিলেন, – You look bloody Sir.

এ গল্পগুলো হয়তো গল্পই। সত্য হওয়াও বিচিত্র নয়। কলেজে-পড়া লোককে আমি বলতে শুনেছি-ওকে বিশ্বাস করবেন না। লোকটা এক নম্বরের Cheater,-‘আপনার Cooker তো খুব ভালো রান্না করতে পারে’-‘কেমন আছেন Type-writer সায়েব?’

-আর এক গল্প। আহমদ সায়েব বলতে শুরু করেন, ‘হলপ করে বলছি, বিশ্বাস করুন। আমার এক সহকর্মী। ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়ছিলেন-Two under- ground terrorists arrested.’ হেডিংটা পড়েই আমাকে বললেন, ‘আচ্ছা, এই যে শুনি, Underground communists, underground terrorists, এসব লোকগুলো মাটির নিচে থাকে কেমন করে?’

আবার এক ঝলক হাসি।

আমি চেপে-চুপে ছিলাম এতক্ষণ। কিন্তু আর পারলাম না। বললাম, এবার শুনুন আমারটা। আমিও হলপ করেই বলছি। গল্পের নায়ক একজন গ্রাজুয়েট এবং এখানে উপস্থিত।

গল্পের নায়কের উপস্থিতির কথাটা বলা বোধ হয় ঠিক হল না। কারণ আমার গল্প না শুনেই সবাই এ-ওর মুখের দিকে আড়চোখে তাকাতে শুরু করেছে। আমি কারো দিকে না তাকিয়ে বলি, ‘আমাদের লাইব্রেরির জন্যে কিছু টাকা মঞ্জুরীর প্রার্থনা করে গতবার মন্ত্রী বাহাদুরকে যে অভিনন্দন দেয়া হয়েছিল, সেটা আমরা কয়েকজনে মিলে মুসাবিদ করি। এক জায়গায় লিখেছি,.. Your august visit………

অমনি একজন বলে উঠলেন, আগস্ট কেন লিখছেন? এটা তো সেপ্টেম্বর মাস।’ হাসির চোটে পেটে খিল ধরে যাওয়ার যোগাড়। এবার সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে আনসার আলী বি.এ.-র ওপর। বেচারার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

আনোয়ার বলে, খুব তো পরের ভুল নিয়ে হাসাহাসি করছেন। আপনাদের ভুল নিয়েও দেখুন গে কতজন হাসাহাসি করছে।

-আপনি ঠিকই বলেছেন, আমি বলি, ‘আমরাও এরকম অজস্র ভুল করি। কিন্তু এই ভুল শেখার চেয়ে না শেখাই ভালো ছিল না কি? এ পণ্ডশ্রম করে লাভটা কি? আধা- শেখা ইংরেজির মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই পড়ি বলেই তো শিক্ষার সাথে আমাদের আত্মার যোগ নেই।

-সে যা-ই হোক, ইংরেজি ছাড়া এ যুগে চলতেই পারে না। -কেন?

-এই ধরুন, বিভিন্ন দেশে আমাদের এমব্যাসি-কনস্যুলেটগুলো। ইংরেজি না হলে এসব কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্বন্ধ স্থাপনে অসুবিধে হবে কত!

-এমব্যাসি-কসন্যুলেট আর কটা? এগুলোর জন্যে কয়েক শ’ ইংরেজি জানা লোক দরকার। এ জন্যে একটা দেশের সাড়ে চার কোটি মানুষের ওপর বিদেশী ভাষার বোঝা চেপে থাকবে?

-চেপে থাকবে কেন? জাহিদ ফোড়ন কাটে। সাড়ে চার কোটি লোককেই আমরা অ্যামব্যাসাডার, কনসাল করে পাঠিয়ে দেব।

মোবারক খেলোয়াড়। খেলোয়াড়সুলভ একটা উপমা দেয় সে-ও, হ্যাঁ-হ্যাঁ, এদেশের সব মানুষকে ধরে অলিম্পিকে পাঠাতে হবে। খোঁড়া-ল্যাংড়া-লুলা কেউ বাদ যাবে না। সবাইকে ধরে ইংরেজির লং জাম্প হাই জাম্প শেখাতে হবে।

আনসার আলী বি. এ. এতক্ষণ ‘চুব’ খেয়ে ছিলেন যেন। ভেসে উঠে বলেন,- বিদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নতি হচ্ছে দিন দিন, ইংরেজি না জানলে তার খবরই আমাদের কাছে পৌঁছবে না।

-কেন পৌঁছবে না? বিদেশী ভাষার কয়েকটা ডিপার্টমেন্ট রাখলেই চলতে পারে। আমার এক দূর-সম্পর্কীয় মামা প্রবেশ করলে জাহিদের কথায় বাধা পড়ে। মামা এখানে নতুন বদলি হয়ে এসেছেন। বাসা যোগাড় হয় নি বলে আমার বাসায় উঠেছেন।

জাহিদ তার অসমাপ্ত কথার খেই ধরে আবার শুরু করে, বিদেশী ভাষার কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট রাখলেই চলতে পারে। বেছে বেছে একদল মেধাবী ছেলের কাউকে ইংরেজি, কাউকে ফারসী শিখিয়ে এদের দিয়ে বিদেশী ভাষার জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইগুলো আমাদের ভাষায় অনুবাদ করিয়ে নিলেই চলতে পারে।

আমাদের আলোচনার বিষয়-বন্ধু কি বুঝতে পেরে মামা বলে ওঠেন, আমি এখনো ক্লাবের মেম্বার হইনি। আপনাদের আলোচনায় যোগ দেয়া বোধ হয় আমার ঠিক হবে ना।

-না, না বলুন। সকলে সমস্বরে বলে।

-আপনারা বোধ হয় সবাই বাঙলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষাপাতী। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার, পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামী তাহজীব ও তমদ্দুন বাঁচাতে হলে আমার মনে হয় আরবী-একমাত্র আরবীকেই রাষ্ট্র ভাষা করা উচিত।

-এ সম্ভব নয়। জাহিদ বলে।

-কেন সম্ভব নয়? স্বীকার করি প্রথমে কিছু অসুবিধে হবে। কিন্তু সে সব অসুবিধের দোহাই দিয়ে একটা জাতির আদর্শের বিচার করা চলে না। সমস্ত ভাবালুতা ও পক্ষপাতিত্ব বিসর্জন দিয়ে আরবীকেই রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। কারণ আরবী ভাষা ও হরফ সমস্ত ভাষা ও হরফের জননী।

– জননীকে শ্রদ্ধা করি, ভক্তি করি হাজার বার। কিন্তু তার মানে এই নয়-জাহাজ ছেড়ে জাহাজ ও নৌকার আদি জননী ভেলায় চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। আমি বলি।

জাহাজ ও নৌকার আদি জননী ভেলা, কে বলেছে? নূহ আলাহেসসালামের কিতির কথা কে না শুনেছে? সে কিস্তিতে তামাম জাহানের গাছ-গাছড়ার বীজ, সমস্ত জীব-জন্তু ও পশু-পাক্ষীর এক জোড়া করে রাখা হয়েছিল। এ যুগে এ তো বড় জাহাজ একটাও হয়েছে?

প্রশ্নের ঐ দিকে না গিয়ে আমি বলি, বাঙলা ভাষায় যেভাবে এখন কথা বলতে পারছেন, আরবীতে এ রকম মন খুলে কথা বলতে পারবেন?

-তুমি কি যে বলো? আমার সম্বন্ধে তোমার এ রকম ধারণা। তুমি জানো, আমি ম্যাট্রিকে আরবীতে লেটার পেয়েছিলাম! অথচ বাঙলায় পেয়েছিলাম এক পেপারে সাতচল্লিশ আর এক পেপারে মাত্র ঊনচল্লিশ।

-বাঙলা বোধ হয় ভালো করে পড়েননি?

-পড়েছি খুবই। কিন্তু ঐ পৌত্তলিকদের ভাষা আমাদের জন্যে নয়, বুঝেছ?

-আরবী বুঝি পৌত্তলিকদের ভাষা ছিল না?

-ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। আর রসূলুল্লাহ্ বলেছেন,-তিন কারণে অরবীকে ভালবাস-আমি একজন আরব, কোরানের ভাষা আরবী এবং বেহেশতের ভাষাও হবে আরবী।

মামা বয়সে মুরব্বি বলে ঠিক নয়, তর্কের বাড়াবাড়িতে হাদিসের বিরুদ্ধাচরণ হয়ে যায় কিনা, এই ভয়ে সবাই চুপ মেরে গেছেন।

আমি শুধু বলি, কেন, সমস্ত ভাষাই তো খোদার সৃষ্টি।

-সমস্ত ভাষা কেন, সমস্ত মানুষও তো খোদার সৃষ্টি। তবে কেন হিন্দু-বৌদ্ধ-ইহুদী- খ্রিষ্টানের চেয়ে মুসলমান খোদার এত প্রিয়?

রাত দশটা বাজে। আর কথা না বাড়িয়ে মামাকে নিয়ে বাসার দিকে রওনা হই। পথে যেতে যেতে মনে হয়, মামা ঠিক সময়েই এসেছেন। ছোটভাই মতিনের ম্যাট্রিক পরীক্ষার তিন মাস মাত্র বাকি। আরবী ছাড়া সব বিষয়ে ভালো করবে বলে সে আশা করে। ‘জের-জবর-পেশ’ না থাকার দরুন আরবী পাঠ্য বই সে পড়তেই পারে না। আমিও যে সাহায্য করব, তার উপায় নেই। ম্যাট্রিক পর্যন্ত যে আরবী শিখেছিলাম, তা কবে ভুলে বসে আছি।

পরের দিন মামাকে বলতেই তিনি আরবী বইতে হরকত বসিয়ে দিতে রাজী হন।

আমি বলি, ডাকি তা হলে মতিনকে। -ডাকার দরকার নেই। আমি যাচ্ছি।

মামা মতিনের পড়ার ঘরে যান। আমি পাশের ঘর থেকে মামা ও মতিনের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি।

মামা মতিনকে জিজ্ঞেস করনে,-গ্রামার-ট্রানস্লেশন পড়েছো কেমন? -তা ভালোই পড়েছি। কিন্তু ‘জের-জবর-পেশ’ না থাকায় হেকায়াত ও নযম পড়তেই পারি না।

-পড়তে পারো না। এদ্দিন কি করেছো তবে? থাক ঠিক আছে। এখন ‘হেকায়াত’

পড়বার দরকার নেই আর।

-না পড়লে প্রশ্নের উত্তর লিখব কেমন করে?

‘হেকায়াত’ আর নযম থেকে দেবে তো শুধু বাংলা তর্জমা করতে। অর্থ বই থেকে বঙ্গানুবাদ একটানা মুখস্ত করে ফেলো। হেকায়াতে তো কোনো অসুবিধাই নেই। যেই দেখবে কামার ও কুকুরের গল্পটা এসেছে, অমনি ঝেড়ে লিখে দেবে। যদি বুঝতে না পারো কোন গল্পটা এসেছে, পাশের কাউকে জিজ্ঞেস করবে আর কাছীদাহ্-র প্রথম লাইনগুলো শুধু চিনে রাখবে। তা হলেই ধরতে পারবে কোন কাছীদাহ-র বঙ্গানুবাদ লিখতে হবে। ব্যস, হয়ে গেল।

-কিন্তু হরকত?

-সময় তো মাত্র তিন মাস। এখন হরকত দিয়ে দিলে পড়ে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। যে পথ বাৎলে দিলাম, ঐ মত পড়ে যাও। আর গ্রামার-ট্রানম্নেশন যখন মুখস্ত আছে, তখন চিন্তা কি?

বইগুলো ঝেড়ে-মুছে আলমারিতে সাজিয়ে রাখছে দারোয়ান। আমি ইস্যু রেজিষ্টারের পাতা উল্টিয়ে চলেছি। আরবী-ভক্ত মামা এ ক’মাসে ক’খানা আরবী বই পড়েছেন দেখবার ইচ্ছে হয়। মামার নামের পাতা বের করি। আরবী ভাষার বই আমাদের বেশি নেই। তবুও আরবী ভাষায় কয়েকখানা হাদিস থাকা সত্ত্বেও মামা মেশকাত শরীফের বঙ্গানুবাদ, ‘হজরতের কথামৃত’, ‘প্রিয় পয়গম্বরের প্রিয় কথা’ নিয়ে পড়েছেন কেন? একখানা আরবী কিবাতও তো নিয়ে তিনি পড়েন নি এ পর্যন্ত।

পায়ের শব্দে চেয়ে দেখি ছোটভাই মতিন এসেছে। হাতে একটা কাগজ। ওর উল্লসিত ভাব দেখে জিজ্ঞেস করি, কিরে?

-মার্কশীট এসেছে। আরবীতে লেটার পেয়েছি। হাত বাড়িয়ে মার্কশীটটা নিয়ে দেখি। সত্যিই তো। মতিন আরবীতে লেটার

পেয়েছে। কিন্তু, একি! বাঙলায় এত কম। এক পেপারে পঞ্চাশ আর এক পেপারে বায়ান্ন মাত্র।

জিজ্ঞেস করি, কিরে বাঙলায় এত কম কেন? তুই না বাঙলায় গল্পো লিখিস? মুকুলের মহফিলে তা ছাপাও হয়?

মতিন নিরুত্তর।

-হরকত নিয়ে কসরত না করেই লেটার পেয়েছিস, সাবাস! আমি আবার বলি,- যা, এবার আরবীতে ‘হেকায়াত’ লিখতে শুরু কর।

৩ রাজার দেউড়ি, ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬০, জুন, ১৯৫৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024