এশিয়ার শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর উত্থানের গতি কিছুটা কমে আসার পর বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি নতুন করে ভারতের দিকে ফিরছে। এতদিন বড় ভাষা মডেল, অর্ধপরিবাহী চিপ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রধান নির্মাতাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা কম থাকায় ভারতীয় শেয়ারবাজারকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা বাজার হিসেবে দেখা হতো। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই ধারণায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
প্রযুক্তিনির্ভর বাজার থেকে ভারতের দিকে ঝুঁকছে বিনিয়োগ
গত বছরের অধিকাংশ সময় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করেন। কিন্তু জুনের মাঝামাঝি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগের লাভজনকতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করলে ওই দুই দেশের বাজারে চাপ দেখা দেয়।
একই সময়ে ভারতের প্রধান শেয়ারসূচক প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিখাতের অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে অনেক বিনিয়োগকারী এখন ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির বাজারে ঝুঁকছেন।
অর্থনীতির ইতিবাচক কয়েকটি ভিত্তি

ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণ বিতরণ ও স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ছে, যা ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ উভয়ের উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রথম প্রান্তিকে দেশটির প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এর ফলে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগেও পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথমার্ধে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করলেও জুলাইয়ের শুরুতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার ভারতীয় বাজারে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেছেন।
সরকারি পদক্ষেপে বাড়ছে বিদেশি আগ্রহ
ভারত সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি বন্ডে বিদেশিদের জন্য উৎসে কর ও মূলধনী মুনাফা কর থেকে অব্যাহতি এবং প্রবাসী ভারতীয়দের আমানত বাড়াতে ব্যাংকিং খাতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
এসব উদ্যোগ ভারতীয় মুদ্রার ওপর চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
শুধু ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিরোধী’ বাজার নয়
অনেকেই ভারতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বাইরে থাকা বাজার হিসেবে দেখলেও বাস্তবতা আরও জটিল।
দেশটির বিপুল জনসংখ্যা, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং তুলনামূলক কম দামের ইন্টারনেট সেবার কারণে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের ৪০ শতাংশেরও বেশি কর্মী প্রতিদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
একই সঙ্গে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে তথ্যকেন্দ্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও শীতলীকরণ ব্যবস্থায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে। এতে বোঝা যায়, ভারত প্রযুক্তির বাইরে নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও অবকাঠামো গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
তবু ঝুঁকি রয়ে গেছে
তবে ভারতের শেয়ারবাজারের এই ইতিবাচক ধারা স্থায়ী হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা ভারতের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য বড় ঝুঁকি। তেলের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
![]()
এ ছাড়া দুর্বল বর্ষা মৌসুমের কারণে খাদ্যপণ্যের মূল্যও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সামনে কী দেখছেন বিনিয়োগকারীরা
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সাম্প্রতিক অগ্রগতি কেবল স্বল্পমেয়াদি প্রবণতা নাকি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিবর্তনের সূচনা—তা নির্ভর করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বাজারগুলোর ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। যদি দেশটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে পারে, তাহলে আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে।
ভারতের বাজারকে তাই শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে দূরে থাকা অর্থনীতি হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তি খাতে অপেক্ষাকৃত বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















