যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপের ফলে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দর উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। তবে এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য, যেখানে তিনি জাপানের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে পার্ল হারবার হামলার প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
ডলারের বিপরীতে দ্রুত শক্তিশালী ইয়েন
সোমবার যৌথ হস্তক্ষেপের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য দ্রুত বাড়ে। গত সপ্তাহের আগে যেখানে এক ডলারের বিনিময়ে ১৬৩ ইয়েনেরও বেশি লেনদেন হচ্ছিল, সেখানে সোমবার তা নেমে আসে প্রায় ১৫৫.২০ ইয়েনে। পরে টোকিওর লেনদেন শেষে হার দাঁড়ায় প্রায় ১৫৬.৭৫ ইয়েন।
জাপানের দীর্ঘদিনের দুর্বল মুদ্রা দেশটির জন্য বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছিল। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে দুর্বল ইয়েনের কারণে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায়। উচ্চ তেলের দাম পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
কেন হস্তক্ষেপ করল দুই দেশ
সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সুদের হারের বড় ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের ইয়েন বিক্রি করে ডলার কেনার দিকে উৎসাহিত করেছে। এতে ইয়েনের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হয়।
জাপানের আগের একক উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় এবার যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় যৌথ হস্তক্ষেপ করা হয়। এমন পদক্ষেপ প্রকাশ্যে স্বীকার করার ঘটনা খুবই বিরল বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও দুই দেশ যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করবে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে বিতর্ক
রোববার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খুব ভালো এবং দুর্বল ইয়েনের কারণে তারা কিছু সহায়তা চেয়েছিল। এরপরই তিনি বলেন, “জাপান আমাদের প্রতি খুব ভালো ছিল, অবশ্য পার্ল হারবারের ঘটনাটি বাদ দিলে।”
এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক হামলার উল্লেখকে অনেকেই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই যৌথ হস্তক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিকভাবেও লাভবান হয়েছে এবং এটি দুই দেশের বন্ধুত্বের একটি ইতিবাচক বার্তা।

যুক্তরাষ্ট্রেরও রয়েছে অর্থনৈতিক লাভ
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের কিছুটা দুর্বল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্য জাপানের বাজারে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। এতে মার্কিন রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের পাশাপাশি বৈশ্বিক মুদ্রা ও বন্ডবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখারও একটি তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল উপায়।
তবুও রয়ে গেছে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপ ইয়েনকে কিছুটা শক্তিশালী করলেও দুর্বলতার মূল কারণগুলো এখনো বহাল রয়েছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার এখনও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। পাশাপাশি দেশটির বিপুল সরকারি ঋণ, সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা ইয়েনের ওপর দীর্ঘমেয়াদে চাপ বজায় রাখতে পারে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দ্রুত সুদের হার কমানোর অবস্থানে নেই। ফলে দুই দেশের সুদের হারের ব্যবধান অদূর ভবিষ্যতেও বড় পরিবর্তন নাও হতে পারে।
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সমন্বিত পদক্ষেপ আপাতত ইয়েনকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।




















