বিশ্বের আর্থিক বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে করপোরেট আয়ের ইতিবাচক খবর, জাপানের মুদ্রা ইয়েনকে স্থিতিশীল রাখতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ এবং ইরান যুদ্ধের ওঠানামা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও অর্থনীতিবিদদের নজর এখন আরও গভীর তিনটি পরিবর্তনের দিকে। এগুলো হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে সম্ভাব্য নতুন ধারা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ধনী ও দরিদ্র মানুষের ওপর অসম প্রভাব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব চাকরির বাজারে দৃশ্যমান
প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগ চললেও এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে এআই কর্মীদের সহায়তা করার পরিবর্তে তাদের কাজের জায়গা দখল করতে শুরু করেছে।
এখনও যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম এবং নতুন বেকার ভাতার আবেদনও নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। তবে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, যেসব পেশা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে বেকারত্বের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/federal-reserve-building-in-washington-dc-939248364-2f3eabd995a54a55b457b26c3899a231.jpg)
একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআই-সংবেদনশীল পেশাগুলোতে বেকারত্ব স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ বেশি। যদিও এটি এখনো বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকট নয়, তবুও প্রযুক্তির কারণে শ্রমবাজারে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এআই-জনিত কর্মসংস্থান সংকট সীমিত হলেও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী বৈঠক এখনও কয়েক সপ্তাহ দূরে থাকলেও নীতিনির্ধারণ নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে। নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম ও নীতিমালা পর্যালোচনার জন্য একাধিক বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছেন।
এই দলগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগ ব্যবস্থা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ, উৎপাদনশীলতা এবং মূল্যস্ফীতির নীতিকাঠামো নিয়ে কাজ করবে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরদের যুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন কানাডীয় অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম হোয়াইট। তিনি দুই হাজার সাত থেকে দুই হাজার আট সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগেই অতিরিক্ত সহজ ঋণনীতি ও সম্পদের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। সে সময় তার সতর্কবার্তা গুরুত্ব না পেলেও পরবর্তী সংকটের পর তার বিশ্লেষণ ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পায়।
এখন তিনি মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা দলের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নির্ধারণ এবং সম্পদবাজার পর্যবেক্ষণে নতুন ধরনের চিন্তাভাবনা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি সবার জন্য সমান নয়
অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, একই ধরনের পণ্যের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম দামের সংস্করণগুলোর দাম বেশি হারে বেড়েছে। উৎপাদকরা অনেক ক্ষেত্রে সব ধরনের পণ্যে একই পরিমাণ অর্থমূল্যের দাম বাড়িয়েছেন। ফলে কম দামের পণ্যে শতাংশের হিসেবে মূল্যবৃদ্ধি বেশি হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, দুই হাজার একুশ থেকে দুই হাজার তেইশ সালের মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দেখায় যে মূল্যস্ফীতি কেবল গড় হার দিয়ে মূল্যায়ন করলে প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। একই মূল্যস্ফীতি সমাজের বিভিন্ন আয়ের মানুষের ওপর ভিন্ন মাত্রায় প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন এবং মূল্যস্ফীতির বৈষম্যমূলক প্রভাব—এই তিনটি বিষয় আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















