০৪:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬
জ্বালানি নিরাপত্তায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়ছে ভারত, গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন শুল্কের পরিকল্পনা ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ, প্রায় ৫৮ হাজার শিক্ষার্থীকে আবার পরীক্ষা দিতে বলল মেক্সিকোর শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হরমুজ ও বাব এল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক, শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তা কাটেনি সাইবার প্রতারণা দমনে কঠোর আইন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান অনুমোদন করল মিয়ানমারের জান্তা যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার নিচে কতটা নিরাপদ জাপানের ইয়েন? রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাঁপল কিয়েভ, নিহত অন্তত ১৭ মিয়ানমারের পাহাড়ে শুরু হয়েছে ২১ শতকের নতুন ‘গ্রেট গেম’  ও বাংলাদেশ    এআই কর্মসংস্থান, ফেডের নতুন দিকনির্দেশনা ও মূল্যস্ফীতির বৈষম্য—বিশ্ব অর্থনীতিতে তিন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন মোদির ভিডিও সরানো বিতর্ক: তিন দিনের মধ্যে ক্ষমা না চাইলে মেটার ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা হারানোর হুঁশিয়ারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাকরি-ঝড়, নতুন ফেড ও ‘দুই গতির’ মূল্যস্ফীতি: বিশ্ব অর্থনীতি কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে?

মিয়ানমারের পাহাড়ে শুরু হয়েছে ২১ শতকের নতুন ‘গ্রেট গেম’  ও বাংলাদেশ   

কাচিন রাজ্যের পাহাড়ে ভোর নামছে। বর্ষার কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি বন, দূরে পাহাড় কেটে তৈরি করা অসংখ্য খাদ, আর মাটির গায়ে প্লাস্টিকের পাইপের জট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি আরেকটি সাধারণ খনি এলাকা। কিন্তু বাস্তবে এই পাহাড়ের নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক সম্পদ, যার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো।

এখানে খোঁজা হচ্ছে সোনা নয়, তেলও নয়।

এখানে উত্তোলন করা হচ্ছে রেয়ার আর্থ—বিরল মৃত্তিকা খনিজ, যা ছাড়া আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিগুলোর অনেকই কার্যত অচল।

আপনি যদি একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি চালান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সার্ভার ব্যবহার করেন, কিংবা কোনো আধুনিক যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা নিয়ে খবর পড়েন—তবে সেই গল্পের সঙ্গে কাচিনের পাহাড়ের অদৃশ্য সম্পর্ক রয়েছে।

এ কারণেই মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চল এখন শুধু একটি সংঘাতপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে।

এই পরিবর্তনকে বোঝা জরুরি বাংলাদেশের জন্যও। কারণ এটি শুধু প্রতিবেশী একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, চীন, ভারত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।

পৃথিবীর নতুন ‘তেল’

বিশ শতকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেল।

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি থেকে শুরু করে উপসাগরীয় যুদ্ধ—বিশ্বশক্তির কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে ছিল জ্বালানি।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সেই সমীকরণ বদলাচ্ছে।

Toward a More Sustainable Future for the Rare Earths Industry - Eos

আজ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (Rare Earth Elements বা REEs)।

এগুলো ১৭টি ধাতব মৌলের একটি পরিবার, যার মধ্যে রয়েছে নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, সামারিয়াম ও ইট্রিয়ামের মতো উপাদান।

এই ধাতুগুলোকে “বিরল” বলা হলেও পৃথিবীতে এগুলোর অস্তিত্ব খুব কম নয়। সমস্যা হলো, এগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ঘনত্বে পাওয়া যায়। আরও বড় সমস্যা হচ্ছে, এগুলো উত্তোলন ও পরিশোধন অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ফলে যে দেশ এই খনিজের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতির ওপর তার প্রভাবও হবে তত বেশি।

একটি স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান

রেয়ার আর্থকে প্রায়ই “আধুনিক শিল্পসভ্যতার ভিটামিন” বলা হয়।

পরিমাণে খুব সামান্য লাগলেও এগুলো ছাড়া অনেক প্রযুক্তি তৈরি করা যায় না।

নিওডিমিয়াম দিয়ে তৈরি হয় অত্যন্ত শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, উইন্ড টারবাইন এবং রোবোটিক্সে ব্যবহৃত হয়।

ডিসপ্রোসিয়াম উচ্চ তাপমাত্রায়ও সেই চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখে।

টার্বিয়াম ও ইউরোপিয়াম ব্যবহার হয় ডিসপ্লে প্রযুক্তিতে।

সামারিয়াম-কোবাল্ট চুম্বক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের এআই ডেটা সেন্টার, সুপারকম্পিউটার, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ড্রোন, স্যাটেলাইট—সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে রেয়ার আর্থ অপরিহার্য।

ফলে এই খনিজ আর কেবল শিল্পের কাঁচামাল নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সম্পদ।

কেন কাচিন?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভূতত্ত্ব এবং ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে।

Satellite images show surge in rare earth mining in rebel-held Myanmar

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্য বহু দশক ধরেই প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ।

জেড, স্বর্ণ, কাঠ, তামা—সবকিছুর পাশাপাশি এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভারী রেয়ার আর্থের মজুত।

এই অঞ্চলটি চীনের ইউনান প্রদেশের একেবারে সীমান্তে।

অর্থাৎ খনিজ উত্তোলনের পর খুব অল্প দূরত্বেই সেগুলো চীনের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

এই ভৌগোলিক সুবিধাই কাচিনকে বিশ্ব রেয়ার আর্থ মানচিত্রে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

একটি যুদ্ধ, যা শুধু বন্দুকের নয়

মিয়ানমারের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধকে অনেকেই সামরিক শাসন বনাম গণতন্ত্রের সংঘাত হিসেবে দেখেন।

কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।

দেশটির বহু সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।

কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন (KIO), মিয়ানমারের সামরিক সরকার, স্থানীয় ব্যবসায়ী, সীমান্ত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি ক্রেতারা—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই সম্পদের সঙ্গে যুক্ত।

আপনার দেওয়া গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উত্তর মিয়ানমারের পরিবেশগত সংকটকে শুধু খনিজ উত্তোলনের ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, সীমান্ত বাণিজ্য, বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং বৈদেশিক চাহিদার মতো একাধিক কাঠামোগত বাস্তবতা।

অর্থাৎ, এখানে প্রতিটি খনি কেবল একটি শিল্প প্রকল্প নয়; এটি ক্ষমতা, অর্থ এবং অস্তিত্বের লড়াইয়ের অংশ।

How China came to rule the rare earth world : NPR

চীনের নীরব কৌশল

বিশ্বে রেয়ার আর্থের কথা উঠলে একটি দেশের নাম সবার আগে আসে—চীন।

গত তিন দশকে বেইজিং শুধু খনিজ উত্তোলনই বাড়ায়নি; তারা গড়ে তুলেছে এমন একটি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, যার সমকক্ষ পৃথিবীতে খুব কম।

ফলে বিশ্বের বহু দেশ রেয়ার আর্থ উৎপাদন করলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত পরিশোধনের জন্য চীনে পাঠাতে হয়।

কিন্তু এই আধিপত্যের পেছনে একটি মূল্যও ছিল।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে চীনের অনেক খনি এলাকায় ব্যাপক পরিবেশ দূষণ, নদী নষ্ট হওয়া এবং কৃষিজমি ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীকালে বেইজিং নিজ দেশে পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে।

আপনার দেওয়া গবেষণাপত্রেও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ সালের দিকে চীন নিজস্ব রেয়ার আর্থ খাতে পরিবেশগত তদারকি জোরদার করার পর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়ে যায়। একই সঙ্গে লেখাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, নিয়ন্ত্রণহীন উত্তোলনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্য চীন নিজেও একসময় বহন করেছে।

এখানেই মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চল নতুন গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

অভ্যুত্থানের পর বদলে যায় সমীকরণ

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় প্রশাসন দুর্বল হতে থাকে।

দেশের বহু সীমান্ত অঞ্চল কার্যত স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

কাচিনও তার ব্যতিক্রম নয়।

National strategy for rare earths expected for issuance in 2026 - VnEconomy

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর KIO বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ খনি এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০২৬ সালে নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো চালুর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাস্তবে পরিবেশগত তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

ফলে উত্তর মিয়ানমারে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্র দুর্বল।

যুদ্ধ চলছে।

কিন্তু খনিজ উত্তোলন থেমে নেই।

বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা আরও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কয়েক বছর আগেও বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ছিল ‘তেল’। এখন সেই জায়গা দ্রুত দখল করছে আরেকটি শব্দ—’ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’ বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ।

লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল এবং রেয়ার আর্থ—এই চারটি নাম এখন ওয়াশিংটন, বেইজিং, টোকিও, ব্রাসেলস এবং নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে। কারণ আগামী প্রজন্মের প্রযুক্তি শুধু সফটওয়্যার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপরও।

আর সেই বাস্তবতাই মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মানচিত্রগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

এআই-এর যুগে নতুন কাঁচামাল

অনেকের ধারণা, এআই বিপ্লব মানেই উন্নত অ্যালগরিদম, শক্তিশালী সফটওয়্যার এবং বিপুল পরিমাণ ডেটা।

কিন্তু এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

একটি বড় এআই ডেটা সেন্টার চালাতে হাজার হাজার সার্ভার লাগে। সেই সার্ভার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক মোটর, সেন্সর এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো। এসব প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রেই রেয়ার আর্থ-ভিত্তিক স্থায়ী চুম্বক অপরিহার্য।

The Future of AI: The Pivotal Role of Chip Manufacturing and the New Race for Raw

একইভাবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারও এই খনিজের চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একটি বড় অফশোর উইন্ড টারবাইনে কয়েক শ কেজি পর্যন্ত রেয়ার আর্থ-ভিত্তিক ম্যাগনেট ব্যবহার হতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটরেও একই ধরনের উপাদান ব্যবহৃত হয়।

অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার—দুটি বড় বৈশ্বিক প্রবণতার পেছনেই একই ধরনের খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

প্রযুক্তির যুদ্ধ মানেই এখন খনিজের যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাকে অনেকেই শুল্ক, চিপ বা বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবে দেখেন।

কিন্তু গত কয়েক বছরে এই প্রতিযোগিতা আরও গভীরে পৌঁছেছে।

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, এআই চিপ, সুপারকম্পিউটিং এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ—সবকিছু এখন একই কৌশলগত সমীকরণের অংশ।

চীনের শক্তি শুধু রেয়ার আর্থ উত্তোলনে নয়; বরং এগুলোকে রাসায়নিকভাবে পৃথক করা, বিশুদ্ধ করা এবং শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার সক্ষমতায়।

এই প্রক্রিয়াজাতকরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

ফলে বহু দেশ খনিজ উৎপাদন করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত চীনের কারখানার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এ কারণেই ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস এবং টোকিও গত কয়েক বছরে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার উদ্যোগ বাড়িয়েছে।

Kachin - Burma Link

কেন কাচিনের খনিজ আলাদা

বিশ্বের সব রেয়ার আর্থ এক ধরনের নয়।

কিছু খনিজ তুলনামূলক সহজলভ্য।

কিন্তু ভারী রেয়ার আর্থ—যেমন ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের মতো উপাদান—অনেক বেশি মূল্যবান এবং প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানকার অনেক খনিতে এই ভারী রেয়ার আর্থের উপস্থিতি রয়েছে।

এই খনিজগুলো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

এই কারণেই কাচিনের পাহাড় শুধু একটি সীমান্ত অঞ্চল নয়; এটি বিশ্বের প্রযুক্তি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস।

একটি নদীর গল্প

কাচিনের পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট ছোট ঝরনা ও নদীগুলো বহু গ্রামের জীবনের ভিত্তি।

সেই নদীর পানি দিয়ে সেচ হয়।

মানুষ পানীয় জল সংগ্রহ করে।

মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।

কিন্তু খনিজ উত্তোলনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেই নদীগুলোর রঙ বদলাতে শুরু করেছে।

আপনার দেওয়া গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত খনি এবং ইন-সিটু লিচিং পদ্ধতির কারণে বন উজাড়, মাটির ক্ষয়, ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ এবং নদীর পানিতে রাসায়নিক বর্জ্য মিশে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী পানির মানের অবনতি, কৃষিজমির ক্ষতি এবং মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার অভিযোগ করছে।

গবেষণাটি আরও সতর্ক করে বলছে, এই নদীগুলো কেবল স্থানীয় জলধারা নয়; এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থার অংশ। ফলে দূষণের প্রভাব খনি এলাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

10 Benefits of Electric Cars (Why You Should Own an EV?) - GuangcaiAuto

‘সবুজ’ প্রযুক্তির অন্ধকার দিক

বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে, তখন একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসছে।

এই সবুজ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ কোথা থেকে আসছে?

কোন পরিবেশগত মূল্য দিয়ে তা উত্তোলন করা হচ্ছে?

কাচিন সেই প্রশ্নের একটি অস্বস্তিকর উত্তর।

একদিকে বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ কমাতে চায়।

অন্যদিকে সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল উত্তোলনের ফলে বিশ্বের অন্য প্রান্তে বন ধ্বংস হচ্ছে, নদী দূষিত হচ্ছে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী জীবিকার সংকটে পড়ছে।

ফলে জলবায়ু নীতির সঙ্গে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের একটি নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

লাভ কার, ক্ষতি কার?

খনিজ অর্থনীতি সব সময় স্থানীয় মানুষের সমৃদ্ধি বয়ে আনে না।

অনেক ক্ষেত্রেই খনিজ উত্তোলন থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পায় সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, যাদের খনি পরিচালনাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষতি, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির বোঝা বহন করে স্থানীয় জনগণ।

গবেষণায় শ্রমিকদের অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, মজুরি বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এটি সেই পরিচিত “রিসোর্স কার্স” বা “সম্পদের অভিশাপ”-এর আরেকটি উদাহরণ—যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলও সংঘাত, দুর্নীতি এবং দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারে না।

সম্পদের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক

রেয়ার আর্থ এখন শুধু একটি রপ্তানি পণ্য নয়।

এটি অর্থায়নের উৎস।

এটি রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যম।

এটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর আয়ের উৎস।

এটি আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার।

এই বাস্তবতাই উত্তর মিয়ানমারের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।

খনির নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়; সামরিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্বও।

Mining for rare earth metals takes an ugly toll on Myanmar's environment | Canada's National Observer: Climate News

তাই “গভর্ন্যান্স” বা শাসনব্যবস্থার সংকটকে মূল সমস্যা । পরিবেশ রক্ষার আইন থাকলেও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না, ফলে খনিজ উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের বদলে সংঘাত-অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে।

কাচিনের পাহাড়ে খননযন্ত্রের শব্দ শোনা যায়। কিন্তু সেই শব্দের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় বেইজিং, ওয়াশিংটন, টোকিও, নয়াদিল্লি, ব্রাসেলস—এমনকি ঢাকাতেও।

কারণ, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে যা ঘটছে, তা আর শুধু একটি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে খনিজ সম্পদ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু, বাণিজ্য ও কূটনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির ভাষায় একে অনেকে বলছেন—“The New Great Game of Critical Minerals”

নতুন মানচিত্র আঁকছে খনিজ

বিশ্বের শিল্প বিপ্লবগুলোকে যদি খনিজ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে প্রথম শিল্পবিপ্লব ছিল কয়লা, দ্বিতীয়টি ছিল তেল, আর বর্তমান প্রযুক্তি বিপ্লব দাঁড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর।

আজ আর কেবল উৎপাদন ক্ষমতা কোনো দেশের শক্তির একমাত্র মাপকাঠি নয়।

বরং প্রশ্ন হলো—

কে কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ করছে?

কে সেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করছে?

আর সংকটের সময় কে সরবরাহ বন্ধ করতে পারে?

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই আজ বিশ্ব কৌশলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

The End of China's Economic Miracle | Foreign Affairs

কেন যুক্তরাষ্ট্র এত উদ্বিগ্ন?

ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কারণ শুধু চীনের অর্থনৈতিক উত্থান নয়।

উদ্বেগের মূল কারণ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রীভবন।

যদি একটি দেশ বিশ্ববাজারে রেয়ার আর্থের প্রক্রিয়াজাতকরণে আধিপত্য ধরে রাখে, তাহলে সেই দেশ ভবিষ্যতের শিল্প, প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি বাজারেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত উন্নত রাডার, গাইডেড মিসাইল, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান, স্যাটেলাইট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রেয়ার আর্থের ওপর নির্ভরশীল।

ফলে এটি আর কেবল শিল্পনীতি নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই কারণেই গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় নতুন খনিজ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে শুরু করেছে।

চীনের সুবিধা শুধু খনিতে নয়

প্রায়ই বলা হয়, চীন বিশ্বের রেয়ার আর্থ উৎপাদনের শীর্ষে।

কিন্তু বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের প্রকৃত শক্তি হলো সম্পূর্ণ মূল্য শৃঙ্খল

একটি রেয়ার আর্থ খনিজ মাটি থেকে বের হওয়ার পর সেটিকে রাসায়নিকভাবে পৃথক করা, বিশুদ্ধ করা, শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করা এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যে রূপ দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অংশ এখনও চীনের হাতে।

এই কারণেই কাচিনের পাহাড় থেকে উত্তোলিত অনেক খনিজ শেষ পর্যন্ত ইউনানের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে যায়।

সেখানে কাঁচামাল আর শুধু খনিজ থাকে না; সেটি পরিণত হয় বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, চুম্বক, সামরিক সরঞ্জাম কিংবা শিল্প যন্ত্রাংশে।

Myanmar border to get barbed-wire fence: minister

ভারতের দৃষ্টিতে মিয়ানমার

বাংলাদেশের মতো ভারতেরও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে।

কিন্তু দিল্লির উদ্বেগের কারণ শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়।

ভারত বহু বছর ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।

কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্প, ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করছে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার ওপর।

যদি কাচিন, সাগাইং বা রাখাইন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অব্যাহত থাকে, তবে শুধু নিরাপত্তাই নয়, বাণিজ্যিক সংযোগও বাধাগ্রস্ত হবে।

এ কারণেই দিল্লি একদিকে জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, অন্যদিকে সীমান্ত অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

জাপান ও ইউরোপের নতুন হিসাব

জাপান অনেক আগেই বুঝেছিল, একটি মাত্র দেশের ওপর রেয়ার আর্থ নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।

২০১০ সালে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনার সময় রেয়ার আর্থ সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার পর টোকিও বিকল্প উৎস খোঁজা শুরু করে।

আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পথ অনুসরণ করছে।

সবুজ জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং শিল্প রূপান্তরের জন্য তারা নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে চায়।

ফলে মিয়ানমারের মতো অঞ্চলগুলো এখন শুধু ভূগোলের অংশ নয়; বৈশ্বিক শিল্পনীতির অংশ।

পরিবেশ বনাম উন্নয়ন—একটি অসম লড়াই

কাচিনের পাহাড়ে যে খনিজ উত্তোলন চলছে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে স্থানীয় মানুষ।

তাই  বর্তমান সংকট শুধু খনি নয়; এটি শাসনব্যবস্থার সংকট।

আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই।

Satellite images show surge in rare earth mining in rebel-held Myanmar | Environment News | Al Jazeera

নীতিমালা রয়েছে, কিন্তু কার্যকর নজরদারি নেই।

স্থানীয় মানুষের মতামত প্রায়ই সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে থেকে যায়।

ফলে বন ধ্বংস, নদী দূষণ, কৃষিজমি নষ্ট হওয়া এবং জীবিকার সংকট দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পরিবেশ আইন যথেষ্ট নয়; দরকার স্বচ্ছ প্রশাসন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, কার্যকর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের সঙ্গে রেয়ার আর্থের সম্পর্ক খুব সীমিত।

বাস্তবে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত।

বাংলাদেশের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে।

রাখাইন রাজ্যের অস্থিরতা যেমন বহু বছর ধরে শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করেছে, তেমনি উত্তর মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও পুরো দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।

একটি দুর্বল বা বিভক্ত মিয়ানমার মানে সীমান্তে অনিশ্চয়তা, অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জটিল হওয়ার সম্ভাবনা।

অন্যদিকে, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিকেও নতুন রূপ দিচ্ছে।

বাংলাদেশকে তাই কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের দৃষ্টিতেও এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

সবুজ জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বছরে লাগবে ১ বিলিয়ন ডলার | The Daily Star

বাংলাদেশের শিল্পনীতির নতুন প্রশ্ন

বাংলাদেশ আগামী এক দশকে যদি বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস সংযোজন বা উন্নত উৎপাদনশিল্পে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বৈশ্বিক বাজার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন হবে।

কারণ ভবিষ্যতের শিল্প প্রতিযোগিতা শুধু শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে না।

নির্ভর করবে—

  • কাঁচামালের নিরাপদ সরবরাহ,
  • আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব,
  • পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি,
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কূটনীতির ওপর।

আজ যে দেশগুলো এ বিষয়ে পরিকল্পনা করছে, তারাই আগামী দশকের শিল্প নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কাচিনের গল্প আসলে বিশ্বের গল্প

এই শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের মনোযোগ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দিকে।

আজ সেই মনোযোগ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পাহাড়ি খনি, লিথিয়াম মরুভূমি এবং রেয়ার আর্থ সমৃদ্ধ সীমান্ত অঞ্চলের দিকে।

মিয়ানমারের কাচিন তার একটি প্রতীক।

সেখানে যে খনিজ উত্তোলন হচ্ছে, তা হয়তো হাজার কিলোমিটার দূরের একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত হবে।

Myanmar's rare earth boom | Global Witness

হয়তো কোনো এআই ডেটা সেন্টারের যন্ত্রাংশে।

হয়তো কোনো যুদ্ধবিমানের নেভিগেশন ব্যবস্থায়।

আবার হয়তো সেই খনিজ উত্তোলনের কারণে একটি গ্রামের নদী চিরতরে দূষিত হবে, একটি বন হারিয়ে যাবে, কিংবা একটি পরিবার তাদের জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে।

এই দ্বৈত বাস্তবতাই রেয়ার আর্থকে শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, ন্যায়বিচার, পরিবেশ এবং ভূরাজনীতির প্রশ্নেও পরিণত করেছে।

একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার মানচিত্র আর শুধু সমুদ্রপথ, তেলক্ষেত্র বা সামরিক ঘাঁটি দিয়ে আঁকা হচ্ছে না। সেটি আঁকা হচ্ছে এমন সব পাহাড়, বন ও সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে, যেখানে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির কাঁচামাল।

উত্তর মিয়ানমারের কাচিন সেই নতুন মানচিত্রের একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট। প্রতিবেশী দেশের সংঘাতকে কেবল মানবিক বা নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একই সঙ্গে শিল্পনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল, কূটনীতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন। আগামী দশকে যে দেশ এই পরিবর্তনকে দ্রুত বুঝতে পারবে, তারাই নতুন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জ্বালানি নিরাপত্তায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়ছে ভারত, গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন শুল্কের পরিকল্পনা

মিয়ানমারের পাহাড়ে শুরু হয়েছে ২১ শতকের নতুন ‘গ্রেট গেম’  ও বাংলাদেশ   

০৪:০৬:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

কাচিন রাজ্যের পাহাড়ে ভোর নামছে। বর্ষার কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি বন, দূরে পাহাড় কেটে তৈরি করা অসংখ্য খাদ, আর মাটির গায়ে প্লাস্টিকের পাইপের জট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি আরেকটি সাধারণ খনি এলাকা। কিন্তু বাস্তবে এই পাহাড়ের নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক সম্পদ, যার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো।

এখানে খোঁজা হচ্ছে সোনা নয়, তেলও নয়।

এখানে উত্তোলন করা হচ্ছে রেয়ার আর্থ—বিরল মৃত্তিকা খনিজ, যা ছাড়া আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিগুলোর অনেকই কার্যত অচল।

আপনি যদি একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি চালান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সার্ভার ব্যবহার করেন, কিংবা কোনো আধুনিক যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা নিয়ে খবর পড়েন—তবে সেই গল্পের সঙ্গে কাচিনের পাহাড়ের অদৃশ্য সম্পর্ক রয়েছে।

এ কারণেই মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চল এখন শুধু একটি সংঘাতপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে।

এই পরিবর্তনকে বোঝা জরুরি বাংলাদেশের জন্যও। কারণ এটি শুধু প্রতিবেশী একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, চীন, ভারত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।

পৃথিবীর নতুন ‘তেল’

বিশ শতকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেল।

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি থেকে শুরু করে উপসাগরীয় যুদ্ধ—বিশ্বশক্তির কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে ছিল জ্বালানি।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সেই সমীকরণ বদলাচ্ছে।

Toward a More Sustainable Future for the Rare Earths Industry - Eos

আজ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (Rare Earth Elements বা REEs)।

এগুলো ১৭টি ধাতব মৌলের একটি পরিবার, যার মধ্যে রয়েছে নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, সামারিয়াম ও ইট্রিয়ামের মতো উপাদান।

এই ধাতুগুলোকে “বিরল” বলা হলেও পৃথিবীতে এগুলোর অস্তিত্ব খুব কম নয়। সমস্যা হলো, এগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ঘনত্বে পাওয়া যায়। আরও বড় সমস্যা হচ্ছে, এগুলো উত্তোলন ও পরিশোধন অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ফলে যে দেশ এই খনিজের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতির ওপর তার প্রভাবও হবে তত বেশি।

একটি স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান

রেয়ার আর্থকে প্রায়ই “আধুনিক শিল্পসভ্যতার ভিটামিন” বলা হয়।

পরিমাণে খুব সামান্য লাগলেও এগুলো ছাড়া অনেক প্রযুক্তি তৈরি করা যায় না।

নিওডিমিয়াম দিয়ে তৈরি হয় অত্যন্ত শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, উইন্ড টারবাইন এবং রোবোটিক্সে ব্যবহৃত হয়।

ডিসপ্রোসিয়াম উচ্চ তাপমাত্রায়ও সেই চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখে।

টার্বিয়াম ও ইউরোপিয়াম ব্যবহার হয় ডিসপ্লে প্রযুক্তিতে।

সামারিয়াম-কোবাল্ট চুম্বক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের এআই ডেটা সেন্টার, সুপারকম্পিউটার, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ড্রোন, স্যাটেলাইট—সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে রেয়ার আর্থ অপরিহার্য।

ফলে এই খনিজ আর কেবল শিল্পের কাঁচামাল নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সম্পদ।

কেন কাচিন?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভূতত্ত্ব এবং ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে।

Satellite images show surge in rare earth mining in rebel-held Myanmar

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্য বহু দশক ধরেই প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ।

জেড, স্বর্ণ, কাঠ, তামা—সবকিছুর পাশাপাশি এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভারী রেয়ার আর্থের মজুত।

এই অঞ্চলটি চীনের ইউনান প্রদেশের একেবারে সীমান্তে।

অর্থাৎ খনিজ উত্তোলনের পর খুব অল্প দূরত্বেই সেগুলো চীনের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

এই ভৌগোলিক সুবিধাই কাচিনকে বিশ্ব রেয়ার আর্থ মানচিত্রে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

একটি যুদ্ধ, যা শুধু বন্দুকের নয়

মিয়ানমারের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধকে অনেকেই সামরিক শাসন বনাম গণতন্ত্রের সংঘাত হিসেবে দেখেন।

কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।

দেশটির বহু সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।

কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন (KIO), মিয়ানমারের সামরিক সরকার, স্থানীয় ব্যবসায়ী, সীমান্ত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি ক্রেতারা—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই সম্পদের সঙ্গে যুক্ত।

আপনার দেওয়া গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উত্তর মিয়ানমারের পরিবেশগত সংকটকে শুধু খনিজ উত্তোলনের ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, সীমান্ত বাণিজ্য, বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং বৈদেশিক চাহিদার মতো একাধিক কাঠামোগত বাস্তবতা।

অর্থাৎ, এখানে প্রতিটি খনি কেবল একটি শিল্প প্রকল্প নয়; এটি ক্ষমতা, অর্থ এবং অস্তিত্বের লড়াইয়ের অংশ।

How China came to rule the rare earth world : NPR

চীনের নীরব কৌশল

বিশ্বে রেয়ার আর্থের কথা উঠলে একটি দেশের নাম সবার আগে আসে—চীন।

গত তিন দশকে বেইজিং শুধু খনিজ উত্তোলনই বাড়ায়নি; তারা গড়ে তুলেছে এমন একটি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, যার সমকক্ষ পৃথিবীতে খুব কম।

ফলে বিশ্বের বহু দেশ রেয়ার আর্থ উৎপাদন করলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত পরিশোধনের জন্য চীনে পাঠাতে হয়।

কিন্তু এই আধিপত্যের পেছনে একটি মূল্যও ছিল।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে চীনের অনেক খনি এলাকায় ব্যাপক পরিবেশ দূষণ, নদী নষ্ট হওয়া এবং কৃষিজমি ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীকালে বেইজিং নিজ দেশে পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে।

আপনার দেওয়া গবেষণাপত্রেও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ সালের দিকে চীন নিজস্ব রেয়ার আর্থ খাতে পরিবেশগত তদারকি জোরদার করার পর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়ে যায়। একই সঙ্গে লেখাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, নিয়ন্ত্রণহীন উত্তোলনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্য চীন নিজেও একসময় বহন করেছে।

এখানেই মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চল নতুন গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

অভ্যুত্থানের পর বদলে যায় সমীকরণ

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় প্রশাসন দুর্বল হতে থাকে।

দেশের বহু সীমান্ত অঞ্চল কার্যত স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

কাচিনও তার ব্যতিক্রম নয়।

National strategy for rare earths expected for issuance in 2026 - VnEconomy

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর KIO বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ খনি এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০২৬ সালে নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো চালুর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাস্তবে পরিবেশগত তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

ফলে উত্তর মিয়ানমারে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্র দুর্বল।

যুদ্ধ চলছে।

কিন্তু খনিজ উত্তোলন থেমে নেই।

বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা আরও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কয়েক বছর আগেও বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ছিল ‘তেল’। এখন সেই জায়গা দ্রুত দখল করছে আরেকটি শব্দ—’ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’ বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ।

লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল এবং রেয়ার আর্থ—এই চারটি নাম এখন ওয়াশিংটন, বেইজিং, টোকিও, ব্রাসেলস এবং নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে। কারণ আগামী প্রজন্মের প্রযুক্তি শুধু সফটওয়্যার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপরও।

আর সেই বাস্তবতাই মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মানচিত্রগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

এআই-এর যুগে নতুন কাঁচামাল

অনেকের ধারণা, এআই বিপ্লব মানেই উন্নত অ্যালগরিদম, শক্তিশালী সফটওয়্যার এবং বিপুল পরিমাণ ডেটা।

কিন্তু এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

একটি বড় এআই ডেটা সেন্টার চালাতে হাজার হাজার সার্ভার লাগে। সেই সার্ভার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক মোটর, সেন্সর এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো। এসব প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রেই রেয়ার আর্থ-ভিত্তিক স্থায়ী চুম্বক অপরিহার্য।

The Future of AI: The Pivotal Role of Chip Manufacturing and the New Race for Raw

একইভাবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারও এই খনিজের চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একটি বড় অফশোর উইন্ড টারবাইনে কয়েক শ কেজি পর্যন্ত রেয়ার আর্থ-ভিত্তিক ম্যাগনেট ব্যবহার হতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটরেও একই ধরনের উপাদান ব্যবহৃত হয়।

অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার—দুটি বড় বৈশ্বিক প্রবণতার পেছনেই একই ধরনের খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

প্রযুক্তির যুদ্ধ মানেই এখন খনিজের যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাকে অনেকেই শুল্ক, চিপ বা বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবে দেখেন।

কিন্তু গত কয়েক বছরে এই প্রতিযোগিতা আরও গভীরে পৌঁছেছে।

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, এআই চিপ, সুপারকম্পিউটিং এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ—সবকিছু এখন একই কৌশলগত সমীকরণের অংশ।

চীনের শক্তি শুধু রেয়ার আর্থ উত্তোলনে নয়; বরং এগুলোকে রাসায়নিকভাবে পৃথক করা, বিশুদ্ধ করা এবং শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার সক্ষমতায়।

এই প্রক্রিয়াজাতকরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

ফলে বহু দেশ খনিজ উৎপাদন করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত চীনের কারখানার ওপর নির্ভর করতে হয়।

এ কারণেই ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস এবং টোকিও গত কয়েক বছরে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার উদ্যোগ বাড়িয়েছে।

Kachin - Burma Link

কেন কাচিনের খনিজ আলাদা

বিশ্বের সব রেয়ার আর্থ এক ধরনের নয়।

কিছু খনিজ তুলনামূলক সহজলভ্য।

কিন্তু ভারী রেয়ার আর্থ—যেমন ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের মতো উপাদান—অনেক বেশি মূল্যবান এবং প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানকার অনেক খনিতে এই ভারী রেয়ার আর্থের উপস্থিতি রয়েছে।

এই খনিজগুলো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

এই কারণেই কাচিনের পাহাড় শুধু একটি সীমান্ত অঞ্চল নয়; এটি বিশ্বের প্রযুক্তি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস।

একটি নদীর গল্প

কাচিনের পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট ছোট ঝরনা ও নদীগুলো বহু গ্রামের জীবনের ভিত্তি।

সেই নদীর পানি দিয়ে সেচ হয়।

মানুষ পানীয় জল সংগ্রহ করে।

মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।

কিন্তু খনিজ উত্তোলনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেই নদীগুলোর রঙ বদলাতে শুরু করেছে।

আপনার দেওয়া গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত খনি এবং ইন-সিটু লিচিং পদ্ধতির কারণে বন উজাড়, মাটির ক্ষয়, ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ এবং নদীর পানিতে রাসায়নিক বর্জ্য মিশে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী পানির মানের অবনতি, কৃষিজমির ক্ষতি এবং মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার অভিযোগ করছে।

গবেষণাটি আরও সতর্ক করে বলছে, এই নদীগুলো কেবল স্থানীয় জলধারা নয়; এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থার অংশ। ফলে দূষণের প্রভাব খনি এলাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

10 Benefits of Electric Cars (Why You Should Own an EV?) - GuangcaiAuto

‘সবুজ’ প্রযুক্তির অন্ধকার দিক

বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে, তখন একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসছে।

এই সবুজ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ কোথা থেকে আসছে?

কোন পরিবেশগত মূল্য দিয়ে তা উত্তোলন করা হচ্ছে?

কাচিন সেই প্রশ্নের একটি অস্বস্তিকর উত্তর।

একদিকে বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ কমাতে চায়।

অন্যদিকে সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল উত্তোলনের ফলে বিশ্বের অন্য প্রান্তে বন ধ্বংস হচ্ছে, নদী দূষিত হচ্ছে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী জীবিকার সংকটে পড়ছে।

ফলে জলবায়ু নীতির সঙ্গে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের একটি নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

লাভ কার, ক্ষতি কার?

খনিজ অর্থনীতি সব সময় স্থানীয় মানুষের সমৃদ্ধি বয়ে আনে না।

অনেক ক্ষেত্রেই খনিজ উত্তোলন থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পায় সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, যাদের খনি পরিচালনাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষতি, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির বোঝা বহন করে স্থানীয় জনগণ।

গবেষণায় শ্রমিকদের অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, মজুরি বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এটি সেই পরিচিত “রিসোর্স কার্স” বা “সম্পদের অভিশাপ”-এর আরেকটি উদাহরণ—যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলও সংঘাত, দুর্নীতি এবং দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারে না।

সম্পদের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক

রেয়ার আর্থ এখন শুধু একটি রপ্তানি পণ্য নয়।

এটি অর্থায়নের উৎস।

এটি রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যম।

এটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর আয়ের উৎস।

এটি আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার।

এই বাস্তবতাই উত্তর মিয়ানমারের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।

খনির নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়; সামরিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্বও।

Mining for rare earth metals takes an ugly toll on Myanmar's environment | Canada's National Observer: Climate News

তাই “গভর্ন্যান্স” বা শাসনব্যবস্থার সংকটকে মূল সমস্যা । পরিবেশ রক্ষার আইন থাকলেও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না, ফলে খনিজ উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের বদলে সংঘাত-অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে।

কাচিনের পাহাড়ে খননযন্ত্রের শব্দ শোনা যায়। কিন্তু সেই শব্দের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় বেইজিং, ওয়াশিংটন, টোকিও, নয়াদিল্লি, ব্রাসেলস—এমনকি ঢাকাতেও।

কারণ, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে যা ঘটছে, তা আর শুধু একটি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে খনিজ সম্পদ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু, বাণিজ্য ও কূটনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির ভাষায় একে অনেকে বলছেন—“The New Great Game of Critical Minerals”

নতুন মানচিত্র আঁকছে খনিজ

বিশ্বের শিল্প বিপ্লবগুলোকে যদি খনিজ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে প্রথম শিল্পবিপ্লব ছিল কয়লা, দ্বিতীয়টি ছিল তেল, আর বর্তমান প্রযুক্তি বিপ্লব দাঁড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর।

আজ আর কেবল উৎপাদন ক্ষমতা কোনো দেশের শক্তির একমাত্র মাপকাঠি নয়।

বরং প্রশ্ন হলো—

কে কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ করছে?

কে সেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করছে?

আর সংকটের সময় কে সরবরাহ বন্ধ করতে পারে?

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই আজ বিশ্ব কৌশলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

The End of China's Economic Miracle | Foreign Affairs

কেন যুক্তরাষ্ট্র এত উদ্বিগ্ন?

ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কারণ শুধু চীনের অর্থনৈতিক উত্থান নয়।

উদ্বেগের মূল কারণ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রীভবন।

যদি একটি দেশ বিশ্ববাজারে রেয়ার আর্থের প্রক্রিয়াজাতকরণে আধিপত্য ধরে রাখে, তাহলে সেই দেশ ভবিষ্যতের শিল্প, প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি বাজারেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত উন্নত রাডার, গাইডেড মিসাইল, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান, স্যাটেলাইট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রেয়ার আর্থের ওপর নির্ভরশীল।

ফলে এটি আর কেবল শিল্পনীতি নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই কারণেই গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় নতুন খনিজ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে শুরু করেছে।

চীনের সুবিধা শুধু খনিতে নয়

প্রায়ই বলা হয়, চীন বিশ্বের রেয়ার আর্থ উৎপাদনের শীর্ষে।

কিন্তু বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের প্রকৃত শক্তি হলো সম্পূর্ণ মূল্য শৃঙ্খল

একটি রেয়ার আর্থ খনিজ মাটি থেকে বের হওয়ার পর সেটিকে রাসায়নিকভাবে পৃথক করা, বিশুদ্ধ করা, শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করা এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যে রূপ দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অংশ এখনও চীনের হাতে।

এই কারণেই কাচিনের পাহাড় থেকে উত্তোলিত অনেক খনিজ শেষ পর্যন্ত ইউনানের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে যায়।

সেখানে কাঁচামাল আর শুধু খনিজ থাকে না; সেটি পরিণত হয় বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, চুম্বক, সামরিক সরঞ্জাম কিংবা শিল্প যন্ত্রাংশে।

Myanmar border to get barbed-wire fence: minister

ভারতের দৃষ্টিতে মিয়ানমার

বাংলাদেশের মতো ভারতেরও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে।

কিন্তু দিল্লির উদ্বেগের কারণ শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়।

ভারত বহু বছর ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।

কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্প, ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করছে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার ওপর।

যদি কাচিন, সাগাইং বা রাখাইন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অব্যাহত থাকে, তবে শুধু নিরাপত্তাই নয়, বাণিজ্যিক সংযোগও বাধাগ্রস্ত হবে।

এ কারণেই দিল্লি একদিকে জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, অন্যদিকে সীমান্ত অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

জাপান ও ইউরোপের নতুন হিসাব

জাপান অনেক আগেই বুঝেছিল, একটি মাত্র দেশের ওপর রেয়ার আর্থ নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।

২০১০ সালে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনার সময় রেয়ার আর্থ সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার পর টোকিও বিকল্প উৎস খোঁজা শুরু করে।

আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই পথ অনুসরণ করছে।

সবুজ জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং শিল্প রূপান্তরের জন্য তারা নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে চায়।

ফলে মিয়ানমারের মতো অঞ্চলগুলো এখন শুধু ভূগোলের অংশ নয়; বৈশ্বিক শিল্পনীতির অংশ।

পরিবেশ বনাম উন্নয়ন—একটি অসম লড়াই

কাচিনের পাহাড়ে যে খনিজ উত্তোলন চলছে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে স্থানীয় মানুষ।

তাই  বর্তমান সংকট শুধু খনি নয়; এটি শাসনব্যবস্থার সংকট।

আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই।

Satellite images show surge in rare earth mining in rebel-held Myanmar | Environment News | Al Jazeera

নীতিমালা রয়েছে, কিন্তু কার্যকর নজরদারি নেই।

স্থানীয় মানুষের মতামত প্রায়ই সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে থেকে যায়।

ফলে বন ধ্বংস, নদী দূষণ, কৃষিজমি নষ্ট হওয়া এবং জীবিকার সংকট দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পরিবেশ আইন যথেষ্ট নয়; দরকার স্বচ্ছ প্রশাসন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, কার্যকর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের সঙ্গে রেয়ার আর্থের সম্পর্ক খুব সীমিত।

বাস্তবে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত।

বাংলাদেশের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে।

রাখাইন রাজ্যের অস্থিরতা যেমন বহু বছর ধরে শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করেছে, তেমনি উত্তর মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও পুরো দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।

একটি দুর্বল বা বিভক্ত মিয়ানমার মানে সীমান্তে অনিশ্চয়তা, অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জটিল হওয়ার সম্ভাবনা।

অন্যদিকে, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিকেও নতুন রূপ দিচ্ছে।

বাংলাদেশকে তাই কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের দৃষ্টিতেও এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

সবুজ জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বছরে লাগবে ১ বিলিয়ন ডলার | The Daily Star

বাংলাদেশের শিল্পনীতির নতুন প্রশ্ন

বাংলাদেশ আগামী এক দশকে যদি বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস সংযোজন বা উন্নত উৎপাদনশিল্পে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বৈশ্বিক বাজার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন হবে।

কারণ ভবিষ্যতের শিল্প প্রতিযোগিতা শুধু শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে না।

নির্ভর করবে—

  • কাঁচামালের নিরাপদ সরবরাহ,
  • আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব,
  • পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি,
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কূটনীতির ওপর।

আজ যে দেশগুলো এ বিষয়ে পরিকল্পনা করছে, তারাই আগামী দশকের শিল্প নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কাচিনের গল্প আসলে বিশ্বের গল্প

এই শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের মনোযোগ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দিকে।

আজ সেই মনোযোগ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পাহাড়ি খনি, লিথিয়াম মরুভূমি এবং রেয়ার আর্থ সমৃদ্ধ সীমান্ত অঞ্চলের দিকে।

মিয়ানমারের কাচিন তার একটি প্রতীক।

সেখানে যে খনিজ উত্তোলন হচ্ছে, তা হয়তো হাজার কিলোমিটার দূরের একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত হবে।

Myanmar's rare earth boom | Global Witness

হয়তো কোনো এআই ডেটা সেন্টারের যন্ত্রাংশে।

হয়তো কোনো যুদ্ধবিমানের নেভিগেশন ব্যবস্থায়।

আবার হয়তো সেই খনিজ উত্তোলনের কারণে একটি গ্রামের নদী চিরতরে দূষিত হবে, একটি বন হারিয়ে যাবে, কিংবা একটি পরিবার তাদের জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে।

এই দ্বৈত বাস্তবতাই রেয়ার আর্থকে শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, ন্যায়বিচার, পরিবেশ এবং ভূরাজনীতির প্রশ্নেও পরিণত করেছে।

একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার মানচিত্র আর শুধু সমুদ্রপথ, তেলক্ষেত্র বা সামরিক ঘাঁটি দিয়ে আঁকা হচ্ছে না। সেটি আঁকা হচ্ছে এমন সব পাহাড়, বন ও সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে, যেখানে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির কাঁচামাল।

উত্তর মিয়ানমারের কাচিন সেই নতুন মানচিত্রের একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট। প্রতিবেশী দেশের সংঘাতকে কেবল মানবিক বা নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একই সঙ্গে শিল্পনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল, কূটনীতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন। আগামী দশকে যে দেশ এই পরিবর্তনকে দ্রুত বুঝতে পারবে, তারাই নতুন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।