ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির সরকার। এই বিপুল কর্মসূচির অর্থ জোগাতে রান্নার গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কয়েক কোটি গ্রাহকের গ্যাস বিল সামান্য বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর নতুন উদ্যোগ
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্ট অনিশ্চয়তার পর ভারত সরকার জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই কেবল অপরিশোধিত তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও রান্নার গ্যাসেরও কৌশলগত মজুত তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এমন মজুত রাখা হবে যা প্রায় দুই মাসের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা এবং প্রায় ছয় সপ্তাহের রান্নার গ্যাসের ব্যবহার মেটাতে সক্ষম হবে।
ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেই তহবিল সংগ্রহ

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রান্নার গ্যাসের প্রতি কেজিতে প্রায় ১ দশমিক ২৯ রুপি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রতি মানক ঘনমিটারে প্রায় ১ দশমিক ৪৩ রুপি হারে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
এতে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রান্নার গ্যাস থেকে প্রায় ৪৬০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আসতে পারে।
এই শুল্ক চালু হলে একটি সাধারণ গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১৮ রুপি পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে গৃহস্থালির গ্যাস বিল গড়ে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দশ বছরের দীর্ঘ কর্মসূচি
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে অতিরিক্ত ২ কোটি ৮০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, ৯০ লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৪০ লাখ টন রান্নার গ্যাস সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
মোট ৪২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হবে সংরক্ষণাগার নির্মাণে। বাকি অর্থ ব্যয় হবে জ্বালানি মজুত গড়ে তুলতে।
আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী দেশ। দেশটির ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, সমুদ্রপথে অস্থিরতা কিংবা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা দেখা দিলে তেল ও গ্যাস পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি মজুত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় নয়াদিল্লি।
বর্তমান সক্ষমতা এখনও সীমিত
বর্তমানে ভারতের সরকারি কৌশলগত অপরিশোধিত তেলের মজুতের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫৩ লাখ ৩০ হাজার টন। আরও ৬৫ লাখ টনের নতুন সংরক্ষণাগার নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে রান্নার গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য এখনও কোনো পৃথক কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা নেই।
ভারতের জরুরি জ্বালানি মজুত বর্তমানে দেশের চাহিদার ১০ দিনেরও কম সময় পূরণ করতে পারে। অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে ১০০ দিনেরও বেশি চাহিদা মেটানোর মতো কৌশলগত জ্বালানি মজুত রয়েছে।
প্রস্তাবটি এখনও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনাধীন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে।
জ্বালানির দাম এমনিতেই উচ্চ পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর নতুন ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হবে কি না, সেটিও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















