জাপান দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে এগিয়ে যাওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং অভিযোগ করেছেন, জাপান ধীরে ধীরে একটি ‘যুদ্ধরাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকলে উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব নতুন সামরিক বিকল্প গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।
জাপানের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষোভ
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী অবস্থান থেকে জাপান ক্রমেই সরে আসছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, সামরিক জোট সম্প্রসারণ, দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন এবং দীর্ঘপাল্লার হামলার সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগকে তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, জাপানের এই পরিবর্তন কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। তাই পিয়ংইয়ং বিষয়টি নীরবে পর্যবেক্ষণ করবে না।
‘আগাম হামলার সক্ষমতা’ অর্জনের চেষ্টা
কিম ইয়ো জং দাবি করেন, জাপান এখন এমন সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনে আগাম হামলা চালানো সম্ভব হবে। সম্প্রতি দীর্ঘপাল্লার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ এবং ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণকে তিনি এই পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই জাপান আরও আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি গ্রহণ করছে, যা পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
জাপানের ব্যাখ্যা
উত্তর কোরিয়ার অভিযোগের জবাবে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কেবল আত্মরক্ষার জন্য। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার উদ্দেশ্যে নয়।
মন্ত্রণালয় বলেছে, জাপানের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যেই তাদের প্রতিরক্ষা নীতি পরিচালিত হয়। নতুন যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
একই সঙ্গে তারা নিশ্চিত করেছে, সম্প্রতি পরিচালিত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা ছিল দেশের প্রথম এমন পরীক্ষা এবং ২০২৭ অর্থবছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৪০০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতিহাসের ছায়া এখনও বিদ্যমান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পুরো কোরীয় উপদ্বীপ দীর্ঘ সময় জাপানের উপনিবেশ ছিল। সেই দখলদারিত্বের স্মৃতি এখনও উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
কিম ইয়ো জং বিবৃতিতে বলেন, অতীতের সামরিক আগ্রাসনের উত্তরাধিকার বহনকারী শক্তির হাতে আরও প্রাণঘাতী অস্ত্র চলে গেলে তার পরিণতি সুখকর হবে না।
বাড়ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ
সম্প্রতি জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে দেশের সামরিক প্রস্তুতি আরও দ্রুত জোরদার করা প্রয়োজন।
এদিকে জাপান ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে, যা দেশটির সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনও সম্প্রতি জাপানের সামরিক সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এটিকে নতুন ধরনের সামরিকীকরণের লক্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া বহুবার ঘোষণা করেছে যে তারা নিজেদের স্থায়ী পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেই অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, উত্তর কোরিয়ার পাল্টা হুঁশিয়ারি এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















