ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। দুই দেশ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলের রুটের ভৌগোলিক সমন্বয় চূড়ান্ত করেছে এবং যৌথ ঘোষণাপত্রের খসড়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে সমঝোতা কার্যকর হওয়ার আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আলোচকরা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, পুরো প্রক্রিয়া যেন কোনো “তৃতীয় পক্ষের” হস্তক্ষেপ ছাড়াই এগোতে পারে, সে বিষয়েও তেহরান গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির ঘোষণা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আসতে পারে। যদিও অতীতেও তাঁর এমন কয়েকটি কূটনৈতিক অগ্রগতির দাবি বাস্তবে রূপ নেয়নি।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্বে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়েই পরিবাহিত হতো। কয়েক মাস ধরে কার্যত এই পথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই জলপথের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং অনুমতি ছাড়া চলাচলের অভিযোগে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলাও চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে।
নতুন রুট নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব
সমঝোতার খসড়া নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরানের উপকূলঘেঁষা চ্যানেল ব্যবহার করবে এবং বের হওয়া জাহাজ চলবে ওমানের পাশের চ্যানেল দিয়ে।
অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, উভয় দিকের জাহাজই ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করবে। আবার ইসমাইল বাঘাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় এমন একটি দ্বিমুখী করিডর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব ইরান ও ওমানের পৃথক রুটের পরিবর্তে একটি একীভূত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
ফি আদায়ে মতপার্থক্য
হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য জাহাজের ওপর কী ধরনের অর্থ আদায় হবে, তা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে।
একটি সূত্রের দাবি, ইরান পণ্যবাহী জাহাজের কার্গোর মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায় করতে চায়। ওমানের প্রস্তাব তুলনামূলক কম, প্রায় ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে আরেকটি প্রস্তাবে এই অর্থকে “টোল” নয়, বরং পরিবেশগত প্রভাব, নিরাপত্তা ও নৌপথ পরিচালনার জন্য “সেবা ফি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আদায় করা অর্থ দুই দেশের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করার ধারণাও আলোচনায় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনো ধরনের টোল বা বাধ্যতামূলক ফি আরোপ গ্রহণযোগ্য নয়।
অস্থায়ী ব্যবস্থার আলোচনা
ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনাধীন রুটটি স্থায়ী নয়। এটি এক থেকে চার মাস পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে কার্যকর থাকতে পারে। তাদের ভাষ্য, এটি হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সমতুল্য নয়; বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও অনিশ্চয়তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলপথের একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে টোল আরোপ করতে পারে না। তাঁর মতে, এমন নজির ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য বিপজ্জনক হবে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং সামরিক তৎপরতাই হরমুজ প্রণালিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। তাই ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হলেও কেবল সেই চুক্তি দিয়ে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
এদিকে আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত নয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের অবস্থানও সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ববাজারের নজর এখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সমঝোতার দিকে। কারণ এই জলপথ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামের ওপর এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















