যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) প্রথমবারের মতো এমআরএনএ প্রযুক্তিভিত্তিক ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নতুন ধরনের ফ্লু টিকা বাজারে আসার পথ খুলে গেল। টিকাটি তৈরি করেছে বায়োটেক প্রতিষ্ঠান মডার্না, যা জানিয়েছে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচিত খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে এটি পাওয়া যেতে পারে।
এফডিএ ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য পূর্ণ অনুমোদন দিয়েছে। আর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে দ্রুতগতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তবে শর্ত হিসেবে বাজারে আসার পর এই বয়সী জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত গবেষণা চালাতে হবে।
নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমআরএনএ প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো এটি প্রচলিত ফ্লু টিকার তুলনায় দ্রুত তৈরি করা যায়। ফলে প্রতি বছর পরিবর্তিত হওয়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী টিকা দ্রুত হালনাগাদ করা সম্ভব হতে পারে।
মডার্নার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফান বানসেল বলেন, ফ্লু এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। নতুন এই টিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে এটি জনস্বাস্থ্যে এমআরএনএ প্রযুক্তির সম্ভাবনাও আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।
কারা নিতে পারবেন এই টিকা?
প্রতি বছর ফ্লু টিকার উপাদান পরিবর্তন করা হয়, কারণ ভাইরাসের ধরনও নিয়মিত বদলায়। নতুন অনুমোদিত এমআরএনএ টিকাটি ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত।
মডার্নার তথ্য অনুযায়ী, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এই টিকাটি প্রচলিত সাধারণ ডোজের ফ্লু টিকার তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি কার্যকর ছিল।
তবে এফডিএ জানিয়েছে, এই টিকা নেওয়ার পর ইনজেকশনের স্থানে সাময়িক ব্যথা ও ক্লান্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার কিছুটা বেশি দেখা গেছে। এছাড়া ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বর্তমানে ব্যবহৃত উচ্চমাত্রার ফ্লু টিকার সঙ্গে এর সরাসরি কার্যকারিতা তুলনা করতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
এ কারণেই প্রবীণদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গবেষণার শর্ত দিয়ে দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অনুমোদন নিয়ে বিতর্ক
এই টিকার অনুমোদনের আগে এফডিএ ও মডার্নার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতবিরোধ দেখা দেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সে সময়কার এফডিএর টিকা বিভাগের প্রধান বিনয় প্রসাদ দাবি করেছিলেন, মডার্নার জমা দেওয়া গবেষণা যথেষ্ট নয় এবং আবেদনটি পর্যালোচনার জন্যও উপযুক্ত নয়।
পরে টিকা বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার মুখে এফডিএ অবস্থান পরিবর্তন করে। মডার্না সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনার পর ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য পূর্ণ অনুমোদন এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য অতিরিক্ত গবেষণার শর্তে দ্রুত অনুমোদনের প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত সেই পথেই অনুমোদন দেওয়া হয়।
বীমা ও প্রাপ্যতা
স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেয়ার কর্মসূচির আওতায় এই টিকার ব্যয় বহন করা হবে। তবে ৬৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে বীমা কভারেজ অঙ্গরাজ্য ও বীমা নীতির ওপর নির্ভর করতে পারে।
ফেডারেল টিকা পরামর্শক কমিটির (এএসিআইপি) সুপারিশ এখন আইনি জটিলতার মধ্যে থাকায় বিভিন্ন ফার্মেসিতে টিকাটি কতটা দ্রুত ও ব্যাপকভাবে পাওয়া যাবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে অনেক অঙ্গরাজ্যে ফার্মাসিস্টদের টিকা প্রয়োগের ক্ষমতা আর সরাসরি ওই কমিটির সুপারিশের ওপর নির্ভরশীল নয়।
এমআরএনএ প্রযুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক
করোনা মহামারির সময় এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা দ্রুত তৈরি হওয়ায় তা ব্যাপক প্রশংসা পায়। তবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রযুক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়। বিশেষ করে বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র অতীতে এমআরএনএভিত্তিক করোনা টিকা নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন এবং ফেডারেল সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত কিছু এমআরএনএ প্রকল্পও সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তবু জুন মাসে এফডিএর স্বাধীন টিকা উপদেষ্টারা সর্বসম্মতিক্রমে মত দেন যে ৫০ থেকে ৬৪ বছর এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে মডার্নার এমআরএনএ ফ্লু টিকার উপকারিতা সম্ভাব্য ঝুঁকির তুলনায় বেশি। সেই সুপারিশের পরই এফডিএ আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
মার্কিন এফডিএ প্রথম এমআরএনএভিত্তিক ফ্লু টিকার অনুমোদন দিয়েছে। ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মডার্নার এই টিকা শিগগিরই বাজারে আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















