দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরেছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন লেখকের নিজ শহরে ফিরে আসার ঘটনা হয়ে থাকেনি, বরং পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি পরিণত হয়েছে বড় এক প্রতীকী ঘটনায়। সারাক্ষণ রিপোর্ট
কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সম্মান জানানোর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে এই শহরই কখনো কখনো লেখকদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০০৭ সালের শরতে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার ঘটনাও ছিল সেই রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
প্রত্যাবর্তনকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে নতুন সরকার
তসলিমার ছয় দিনের কলকাতা সফরকে ঘিরে ব্যাপক আয়োজন করে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য নির্বাচিত বিজেপি সরকার। শহরের বিভিন্ন স্থানে তাকে স্বাগত জানিয়ে পোস্টারও দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী নিজে তার সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত হন।
নতুন সরকার তসলিমার প্রত্যাবর্তনকে আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, শুধু সরকারের মুখ বদলায়নি, প্রশাসনিক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, তার সরকার কোনো ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর চাপের কাছে নত হবে না।
তিনি তসলিমাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে জানান, লেখক যখন ইচ্ছা কলকাতায় আসতে পারবেন।
জবাবে তসলিমা বলেন, কলকাতা তাকে ডাকলে তিনি আবারও আসবেন।
পুরোনো সরকারের সমালোচনা, নতুন সরকারের প্রশংসা
কলকাতায় পৌঁছানোর পর তসলিমা বিজেপি নেতৃত্বকে তার ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নিজের জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কলকাতাই ছিল তার সবচেয়ে কাছের জায়গা।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, একটি সরকার তাকে বের করে দিয়েছিল, আরেকটি সরকার তাকে ফিরতে দেয়নি, আর একটি সরকার তাকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছে।
তসলিমা শুধু নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেননি, তিনি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর পক্ষেও মত দেন এবং মাদ্রাসা ব্যবস্থার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। এসব বিষয় বর্তমানে বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাধীন মতপ্রকাশ নিয়ে তসলিমার বার্তা
কলকাতার এক অনুষ্ঠানে তসলিমা বলেন, কোনো রাষ্ট্র যখন ধর্মীয় উগ্র শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন সাময়িকভাবে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যে সমাজ একজন সমালোচককে হত্যা করে, বন্দি করে বা নির্বাসনে পাঠায়, সে শুধু একজন মানুষকে হারায় না; সে নিজের ভবিষ্যৎকেও বন্দি করে ফেলে।
তার এই বক্তব্য আবারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তসলিমার প্রত্যাবর্তনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও প্রভাব
তসলিমার কলকাতা সফর শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর প্রভাব পড়তে পারে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, তসলিমাকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি সরকার নিজেদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার অবস্থান তুলে ধরতে চেয়েছে।
তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, যেই সরকার আগে রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে বহু মানুষের পরিচয় নিয়ে অভিযান চালানোর কথা বলেছে, সেই সরকারের অধীনেই একজন বাংলাদেশি নির্বাসিত লেখকের প্রত্যাবর্তন নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
তসলিমাকে ঘিরে বদলে যাওয়া রাজনীতির প্রতিচ্ছবি
তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরা তাই শুধু আবেগের ঘটনা নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় রাজনীতি, ভোটের সমীকরণ এবং প্রশাসনিক অবস্থানের পরিবর্তন নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
একজন লেখকের প্রত্যাবর্তন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বার্তার বাহক, যেখানে পুরোনো সিদ্ধান্ত, নতুন ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের রাজনীতির হিসাব একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তন নিয়ে মেটা বর্ণনা:
১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরলেন তসলিমা নাসরিন। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















