যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিমানবন্দরে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) অভিযান জোরদার হওয়ায় দেশটির বড় বড় বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন সংস্থা আইসিইর সাম্প্রতিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে।
বিমানবন্দরে বাড়ছে গ্রেপ্তার অভিযান
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিমানবন্দরে আইসিই কর্মকর্তারা টিকিট কাউন্টার, বোর্ডিং গেট এবং জেটব্রিজের মতো এলাকায় অভিযান চালিয়ে অভিবাসন-সংক্রান্ত অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছেন। সরকারি তথ্যের সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত মাসে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে তিন ডজন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে বিমানবন্দরগুলোতে।
আগে যাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ ছিল, মূলত তাদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হতো। তবে এখন মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসাধারী এমন ব্যক্তিদেরও আটক করা হচ্ছে, যাদের স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা বা আশ্রয়ের আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। অতীতে এ ধরনের আবেদনকারীরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। আইসিইর দাবি, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াই গ্রেপ্তারের জন্য যথেষ্ট আইনি ভিত্তি।
বিমান সংস্থার আপত্তি
গত ২৫ জুলাই ডালাস বিমানবন্দরে একটি সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ওঠার চেষ্টা করেন আইসিইর কর্মকর্তারা। তাদের কাছে ছিল প্রশাসনিক পরোয়ানা, যা আইসিইর কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত। কিন্তু বিমান সংস্থার কর্মীরা বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত আদালতের পরোয়ানা ছাড়া বিমানে প্রবেশের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
একই সঙ্গে তারা যাত্রীদের তথ্যও প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং আইসিই কর্মকর্তাদের যাত্রী তালিকা দেখার সুযোগ দেননি। ঘটনাটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত বিমান সংস্থার কর্মীরা নিজেদের নীতিমালা অনুসরণ করেন।
সাউথওয়েস্ট জানিয়েছে, তারা যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি নথিপত্র নিশ্চিত করার নীতি অনুসরণ করে।
অন্যদিকে জেটব্লু জানিয়েছে, তারা যাত্রীদের অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে না এবং এ ধরনের তথ্য সরকারের কাছে সরবরাহের জন্য তাদের কোনো বিশেষ কর্মসূচি বা অংশীদারত্ব নেই।
নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিমানবন্দর পরিচালনা ও বিমান শিল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, বোর্ডিং গেট বা বিমানের প্রবেশপথে গ্রেপ্তার অভিযান যাত্রী, কর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, যদি গ্রেপ্তার করতেই হয়, তবে নিরাপত্তা তল্লাশির চেকপয়েন্টেই তা সম্পন্ন করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
সম্প্রতি বিমান শিল্পের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিমানবন্দরে অভিবাসন অভিযান পরিচালনার সুস্পষ্ট নীতিমালা ও প্রক্রিয়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের চাপ ও কৌশল পরিবর্তন
সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার অভিবাসন-সংক্রান্ত গ্রেপ্তারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আইসিইর ওপর হোয়াইট হাউসের চাপ বেড়েছে। সেই কারণে সংস্থাটি বিমানবন্দরসহ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে অভিযান বাড়িয়েছে।
এদিকে জানা গেছে, গত গ্রীষ্ম থেকে পরিবহন নিরাপত্তা প্রশাসন যাত্রী তালিকা আইসিইর সঙ্গে ভাগাভাগি করছে, যাতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা যায়। এই সমন্বয়ের ফলে ইতোমধ্যে শত শত গ্রেপ্তার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কেবল বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে।
কর্মীদেরও উদ্বেগ
বিমানবালাদের সংগঠনও বিমানবন্দরে আইসিইর বাড়তি উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, জেটব্রিজে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, বিমানে উঠে যাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অভিবাসন-সংক্রান্ত হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতা বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ যত বাড়ছে, ততই যাত্রীদের অধিকার, জননিরাপত্তা এবং বিমান সংস্থার দায়িত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে আসছে। এই পরিস্থিতিতে অভিবাসন আইন প্রয়োগ ও যাত্রী নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে, সেটিই এখন অন্যতম বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















